গত ২৮ ফেব্রুয়ারি থেকে হামলা-পাল্টা হামলায় জ্বলছে গোটা মধ্যপ্রাচ্য। ওই দিন প্রথমে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল যৌথভাবে ইরানের ওপর হামলা শুরু করে। ইরানও তাৎক্ষণিক পাল্টা জবাব দিতে শুরু করে। সেই থেকে এই যুদ্ধ অব্যাহত রয়েছে।
তবে চলমান এই যুদ্ধ এখন আর কেবল সামরিক ঘাঁটিতে সীমাবদ্ধ নেই; এটি সরাসরি বৈশ্বিক জ্বালানি উৎপাদনের হৃৎপিণ্ডে আঘাত হেনেছে। সম্প্রতি ইরানে বিশ্বের বৃহত্তম গ্যাসক্ষেত্র সাউথ পারসে ইসরায়েলি হামলা এবং পরবর্তীতে সৌদি আরব, কুয়েত, কাতার ও সংযুক্ত আরব আমিরাতের বিভিন্ন তেল ও গ্যাসক্ষেত্রে তেহরানের পাল্টা হামলা এই যুদ্ধকে এক নতুন ও বিপজ্জনক মাত্রায় নিয়ে গেছে।
বিশ্লেষকরা একে ‘চরম উত্তেজনা’ হিসেবে অভিহিত করছেন। তাদের মতে, এ ধরনের হামলা দীর্ঘমেয়াদে বৈশ্বিক অর্থনীতি ও জ্বালানি নিরাপত্তার ওপর বড় প্রভাব ফেলতে পারে।
গ্যাসক্ষেত্রে প্রথম সরাসরি হামলা
এই সংঘাতে এবারই প্রথম সরাসরি জ্বালানি উৎপাদন কেন্দ্র, বিশেষ করে গ্যাসক্ষেত্রগুলোকে লক্ষ্যবস্তু করা হয়েছে। আগে হামলা সীমাবদ্ধ ছিল তেল-গ্যাস শিল্পের সাধারণ স্থাপনাগুলোর মধ্যে।
গত মঙ্গলবার ইরানের ড্রোন হামলায় সংযুক্ত আরব আমিরাতের আবুধাবিতে অবস্থিত শাহ গ্যাসক্ষেত্রের কার্যক্রম বন্ধ হয়ে যায়। এই ক্ষেত্রটি প্রতিদিন প্রায় ১২৮ কোটি ঘনফুট গ্যাস উৎপাদন করতে সক্ষম এবং দেশটির মোট গ্যাস সরবরাহের প্রায় ২০ শতাংশ জোগান দেয়।
এর পরদিন বুধবার ইরানের সাউথ পারস গ্যাসক্ষেত্রের একটি উৎপাদন স্থাপনাতেও হামলা হয়। এটি বিশ্বের সবচেয়ে বড় গ্যাসক্ষেত্র এবং ইরানের প্রধান জ্বালানি উৎস। ইসরায়েলি গণমাধ্যমে বলা হয়, যুক্তরাষ্ট্রের সম্মতিতে ইসরায়েল এই হামলা চালিয়েছে, যদিও আনুষ্ঠানিকভাবে কেউই দায় স্বীকার করেনি। এ হামলার পর তেহরান উপসাগরীয় দেশগুলোর জ্বালানি অবকাঠামোয় আরও প্রতিশোধমূলক হামলা চালাচ্ছে।
এই হামলা কেন বিপজ্জনক?
বিশেষজ্ঞদের মতে, এই হামলাগুলো যুদ্ধকে আরও গভীর ও দীর্ঘমেয়াদি করে তুলতে পারে। গ্যাস ও তেল সরবরাহ সাময়িকভাবে বন্ধ হলেও তা কয়েক মাসে ফের চালু করা সম্ভব, কিন্তু উৎপাদন অবকাঠামো ক্ষতিগ্রস্ত হলে তা ঠিক করতে কয়েক বছরও লেগে যেতে পারে।
বিশ্লেষকদের মতে, যদি উৎপাদন ব্যাপকভাবে কমে যায়, তাহলে যুদ্ধ শেষ হলেও সরবরাহ ঘাটতি পূরণ করা কঠিন হয়ে পড়বে। বিশেষ করে তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস (এলএনজি) স্থাপনায় হামলা হলে ক্ষতি আরও দীর্ঘস্থায়ী হতে পারে।
এই পরিস্থিতির প্রভাব এরই মধ্যেই বাজারে পড়েছে। সাউথ পারস গ্যাসক্ষেত্রে হামলার পর তেলের দাম দ্রুত বেড়ে গেছে, কারণ বৈশ্বিক জ্বালানি সরবরাহ ব্যাহত হওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।
আঞ্চলিক প্রতিক্রিয়া
এই হামলার পর সৌদি আরব, সংযুক্ত আরব আমিরাত ও কাতারের বিভিন্ন তেল-গ্যাস স্থাপনাকে ‘বৈধ লক্ষ্যবস্তু’ হিসেবে ঘোষণা করে ইরান। এর কিছুক্ষণের মধ্যেই রিয়াদে বিস্ফোরণের শব্দ শোনা যায়। শুধু তাই নয়, সৌদি আরব ছাড়াও কাতার, কুয়েত ও আমিরাতের তেল-গ্যাসক্ষেত্রে হামলা হয়েছে।
কাতার এই হামলার জন্য ইসরায়েলকে দায়ী করে এবং এটিকে ‘বিপজ্জনক ও দায়িত্বজ্ঞানহীন’ পদক্ষেপ বলে উল্লেখ করে। দেশটি সতর্ক করে যে, এতে বৈশ্বিক জ্বালানি নিরাপত্তা হুমকির মুখে পড়েছে।
সংযুক্ত আরব আমিরাতও বলেছে, এই হামলা আঞ্চলিক স্থিতিশীলতা ও বৈশ্বিক জ্বালানি নিরাপত্তার জন্য বড় ঝুঁকি তৈরি করেছে।
মেরামতে কত সময় লাগবে?
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, জ্বালানি অবকাঠামো ক্ষতিগ্রস্ত হলে তা দ্রুত মেরামত করা সম্ভব নয়। ২০০৩ সালে ইরাকে যুদ্ধের পর দেখা গেছে, ক্ষতিগ্রস্ত তেল উৎপাদন পুনরুদ্ধারে দুই বছরেরও বেশি সময় লেগেছিল।
বর্তমান পরিস্থিতিতেও সরঞ্জাম সরবরাহ ও প্রযুক্তিগত সমস্যার কারণে মেরামত প্রক্রিয়া দীর্ঘায়িত হতে পারে।
শুধু অর্থনীতির বিষয় নয়
উপসাগরীয় অঞ্চলে জ্বালানি উৎপাদন শুধু অর্থনৈতিক বিষয় নয়, এটি সামাজিক ও রাজনৈতিক স্থিতিশীলতার সঙ্গেও জড়িত। নাগরিকদের জীবনযাত্রার মান এবং বিদেশি শ্রমিক আকর্ষণের ক্ষেত্রেও জ্বালানি সম্পদ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।
একই সঙ্গে আঞ্চলিক সম্পর্কেও এর প্রভাব রয়েছে। যেমন, ইরান ও সৌদি আরবের সাম্প্রতিক সম্পর্ক উন্নয়ন এবং অর্থনৈতিক কৌশলেও জ্বালানি বড় ভূমিকা রেখেছে।
বিশেষ করে সাউথ পারস গ্যাসক্ষেত্র কাতার ও ইরানের মধ্যে কূটনৈতিক সম্পর্কের একটি গুরুত্বপূর্ণ সেতু হিসেবে কাজ করে এসেছে।
বিশ্লেষকদের মতে, গ্যাসক্ষেত্রে হামলা চলতে থাকলে তা শুধু যুদ্ধের তীব্রতা বাড়াবে না, বরং বিশ্বজুড়ে জ্বালানি ও অর্থনৈতিক সংকটকে আরও গভীর করে তুলতে পারে। সূত্র: দ্য গার্ডিয়ান

