যুক্তরাষ্ট্রের বিরুদ্ধে সবচেয়ে শক্তিশালী কার্ড নিয়ে নেমেছে ইরান

0
যুক্তরাষ্ট্রের বিরুদ্ধে সবচেয়ে শক্তিশালী কার্ড নিয়ে নেমেছে ইরান

হরমুজ প্রণালী ঘিরে ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে চলমান উত্তেজনা এখন এক চরম সংকটে রূপ নিচ্ছে। তেহরানের পক্ষ থেকে বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ এই জ্বালানি সরবরাহ পথটি সাময়িকভাবে বন্ধ করে দেওয়ার ঘোষণা বিশ্ব অর্থনীতিতে নতুন করে উদ্বেগের ছায়া ফেলেছে। পারস্য উপসাগরে ইরান তার সামরিক শক্তি প্রদর্শনের অংশ হিসেবে যখন এই পদক্ষেপ নিল, ঠিক তখনই জেনেভায় ওমানের মধ্যস্থতায় দুই দেশের মধ্যে এক রুদ্ধদ্বার পরোক্ষ আলোচনা চলছে। ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলি খামেনি সতর্ক করে দিয়েছেন, মার্কিন রণতরীগুলোকে ধ্বংস করার সক্ষমতা তেহরান রাখে, যা পরিস্থিতিকে আরও অগ্নিগর্ভ করে তুলেছে।

যুক্তরাষ্ট্রের পক্ষ থেকে পারস্য উপসাগরে ইতোমধ্যে দুটি বিমানবাহী রণতরী বা ক্যারিয়ার স্ট্রাইক গ্রুপ মোতায়েন করা হয়েছে। ইউএসএস আব্রাহাম লিংকন এবং বিশ্বের বৃহত্তম যুদ্ধজাহাজ ইউএসএস জেরাল্ড আর ফোর্ডকে ইরানি উপকূলের কাছাকাছি অবস্থানে পাঠানো হয়েছে। পেন্টাগনের এই যুদ্ধংদেহী অবস্থানকে ডোনাল্ড ট্রাম্প প্রশাসনের শক্তির মাধ্যমে শান্তি প্রতিষ্ঠার কৌশলের অংশ হিসেবে দেখা হচ্ছে। মার্কিন কর্মকর্তারা হুঁশিয়ারি দিয়েছেন, পরমাণু কর্মসূচি নিয়ে ইরান যদি দ্রুত কোনো চুক্তিতে না আসে, তবে তার ফলাফল হবে অত্যন্ত ‘বেদনাদায়ক’।

অন্যদিকে, ইরানের অভ্যন্তরীণ পরিস্থিতিও এখন বেশ টালমাটাল। গত জানুয়ারি মাস জুড়ে চলা ব্যাপক সরকারবিরোধী আন্দোলন এবং তার পরবর্তী কঠোর দমন-পীড়নের ফলে দেশটির শাসনব্যবস্থা এক কঠিন চাপের মুখে রয়েছে। দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতি ও আকাশছোঁয়া মুদ্রাস্ফীতিতে বিপর্যস্ত ইরানি জনগণ যখন রাস্তায় নেমেছে, তখন তেহরান সরকার একে ‘আমেরিকান-জায়নবাদী ষড়যন্ত্র’ হিসেবে আখ্যা দিয়েছে। এই অভ্যন্তরীণ অস্থিরতা জেনেভার আলোচনার টেবিলে ইরানের দর কষাকষির ক্ষমতাকে অনেকটাই কমিয়ে দিয়েছে বলে মনে করছেন আন্তর্জাতিক বিশ্লেষকরা।

জেনেভায় ওমানি প্রতিনিধিদের মাধ্যমে চলা এই আলোচনা মূলত ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি এবং দেশটির ওপর আরোপিত অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহারকে কেন্দ্র করে আবর্তিত হচ্ছে। ইরান শর্ত দিচ্ছে, তাদের ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণের অধিকার অক্ষুণ্ণ রেখে কেবল নিষেধাজ্ঞা তুলে নিলেই তারা সমঝোতায় আসবে। তবে ওয়াশিংটন এই আলোচনার পরিধি বাড়িয়ে ইরানের ব্যালিস্টিক মিসাইল কর্মসূচি এবং আঞ্চলিক মিলিশিয়া গোষ্ঠীদের প্রতি তাদের সমর্থন বন্ধের বিষয়টিও অন্তর্ভুক্ত করতে চাইছে। ট্রাম্প প্রশাসনের এই অনড় অবস্থান আলোচনার ভবিষ্যতকে অনিশ্চিত করে তুলেছে।

মধ্যপ্রাচ্যের ভূ-রাজনীতিতে ইরানের প্রধান মিত্র হিসেবে পরিচিত হিজবুল্লাহ এবং হামাসের শক্তি সাম্প্রতিক যুদ্ধে অনেকটাই কমেছে। লেবাননে ইসরায়েলি অভিযানের পর হিজবুল্লাহ এখন আগের চেয়ে দুর্বল, যা ইরানের আঞ্চলিক প্রতিরোধের বলয়কে কিছুটা নড়বড়ে করে দিয়েছে। তা সত্ত্বেও ইয়েমেনের হুথি বিদ্রোহী এবং ইরাকি মিলিশিয়াদের মাধ্যমে ইরান এখনো তার প্রভাব বজায় রাখার চেষ্টা করছে। তবে আঞ্চলিক এই ছায়াযুদ্ধ এখন সরাসরি ইরান ও ইসরায়েলের মধ্যে সংঘাতের রূপ নেওয়ায় তেহরানকে তার কৌশল নতুন করে সাজাতে হচ্ছে।

গত বছর জুনে ইসরায়েল ও ইরানের মধ্যে ঘটে যাওয়া ১২ দিনের সংক্ষিপ্ত কিন্তু বিধ্বংসী যুদ্ধের স্মৃতি এখনো অমলিন। সেই যুদ্ধে প্রথমবারের মতো যুক্তরাষ্ট্র সরাসরি ইসরায়েলের সাথে যোগ দিয়ে ইরানের পারমাণবিক স্থাপনায় হামলা চালিয়েছিল। সেই ঘটনার পর থেকে দুই দেশের মধ্যে আস্থার সংকট চরমে পৌঁছেছে। বর্তমান প্রেক্ষাপটে হরমুজ প্রণালী বন্ধের হুমকিকে ইরান তার টিকে থাকার শেষ লড়াই বা ‘সর্বশেষ অস্ত্র’ হিসেবে ব্যবহার করতে চাইছে। কারণ এই প্রণালী দিয়ে বিশ্বের ২০ শতাংশ জ্বালানি তেল পরিবাহিত হয়, যা বন্ধ হলে বিশ্ববাজারে তেলের দাম অভাবনীয়ভাবে বেড়ে যাবে।

সংকটের এই মুহূর্তে সৌদি আরব, কাতার এবং কুয়েতের মতো উপসাগরীয় দেশগুলো গভীর উদ্বেগের সাথে পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করছে। এই দেশগুলো কোনোভাবেই অঞ্চলে একটি সর্বাত্মক যুদ্ধ চায় না, কারণ এতে তাদের অর্থনীতি ও অবকাঠামো মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে। ওমান তার ঐতিহ্যগত মধ্যস্থতাকারীর ভূমিকা পালন করে দুই পক্ষকে শান্ত করার আপ্রাণ চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে। ওমানি পররাষ্ট্রমন্ত্রী সাইয়্যেদ বদর আলবুসাইদি দুই পক্ষের সাথে দফায় দফায় বৈঠক করে একটি সাধারণ রূপরেখা তৈরির চেষ্টা করছেন।

শেষ পর্যন্ত জেনেভা সংলাপ কোনো আলোর মুখ দেখবে নাকি মধ্যপ্রাচ্য আবার এক বড় ধরনের যুদ্ধের দাবানলে জ্বলবে, তা নির্ভর করছে আগামী কয়েক সপ্তাহের ঘটনাবলির ওপর। একদিকে ট্রাম্পের কঠোর সামরিক হুঁশিয়ারি এবং অন্যদিকে খামেনির আপোষহীন অবস্থান; এই দুই মেরুর টানাপোড়েনে এখন থমথমে অবস্থা বিরাজ করছে পুরো পারস্য উপসাগরে। ইরান চাইছে সম্মানের সাথে টিকে থাকতে, আর যুক্তরাষ্ট্র চাইছে তেহরানের পারমাণবিক উচ্চাকাঙ্ক্ষাকে চিরতরে নির্মূল করতে। এই ক্ষমতার লড়াইয়ে হরমুজ প্রণালী শেষ পর্যন্ত কার তুরুপের তাস হবে, সেটিই এখন বড় প্রশ্ন।

সূত্র: এনডিটিভি

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here