রূপকথা-উপকথায় আছে পঙ্খিরাজ ঘোড়া আর রাজপুত্রের টগবগিয়ে চলা তেজি অশ্বের গল্প। টমটম গাড়ি একসময় ছিল রাজকীয় ঐতিহ্যের অংশ। তবে মানিকগঞ্জের চরাঞ্চলের মানুষের জীবন-জীবিকা আজও অনেকাংশে নির্ভর করে ঘোড়ার গাড়ির ওপর।
জানা যায়, ভারতবর্ষে ইংরেজ শাসনামলে ঘোড়ার গাড়ির প্রচলন শুরু হয়। সে সময় ঢাকায় ঘোড়ার গাড়ি চলাচল শুরু হলে রাস্তাঘাটও সংস্কার করা হয়। প্রথমে ইংরেজরা ঘোড়ার গাড়ি ব্যবহার করলেও পরে স্থানীয় অভিজাত শ্রেণির মানুষও এ সুবিধা ভোগ করেন। ধীরে ধীরে সাধারণ মানুষের দোরগোড়ায় পৌঁছে যায় ঘোড়ার গাড়ি।
যেসব অঞ্চলে রাস্তাঘাট ভালো, সেখানে ট্রাক, ভ্যান, রিকশা, ব্যাটারিচালিত অটোরিকশাসহ নানা যানবাহন চলাচল করে। তবে দুর্গম চরাঞ্চলের মানুষের ভরসা এখনো ঘোড়ার গাড়ি। একসময় মানিকগঞ্জের প্রতিটি উপজেলা থেকেই ঘোড়ার গাড়ি চলাচল করত। বর্তমানে শিবালয়, ঘিওর ও দৌলতপুর উপজেলার চরাঞ্চলে ঘোড়ার গাড়ির প্রচলন রয়েছে।
একসময় ঘোড়ার সঙ্গে জমিদারদের ঐতিহ্য জড়িয়ে ছিল, এখন ঘোড়ার সঙ্গে জড়িয়ে গেছে দারিদ্র্য। আগে যার যত বেশি ঘোড়া ছিল, তিনি তত বেশি প্রভাবশালী বলে বিবেচিত হতেন। বর্তমানে ঘোড়ার ব্যবহার বিলুপ্তির পথে।
জানা যায়, ঢাকা-আরিচা মহাসড়কে একসময় ঘোড়ার গাড়িই ছিল চলাচলের প্রধান মাধ্যম। অনেকেই ঘোড়ার গাড়ি চালিয়ে জীবিকা নির্বাহ করতেন। শিবালয়ের মহাদেবপুর এলাকার মুখার্জি বাবুর অর্ধশতাধিক ঘোড়ার গাড়ি ছিল। তাঁর ঘোড়ার গাড়িতে গুরুত্বপূর্ণ সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীরা যাতায়াত করতেন এবং মালামাল ও ডাক পরিবহন করা হতো।
মানিকগঞ্জের বিভিন্ন স্থানে ঘোড়ার গাড়ির পরিবহন ব্যবসা ছিল। বিয়েসহ নানা সামাজিক অনুষ্ঠানে ঘোড়ার গাড়ি ব্যবহার করা হতো। ঘোড়ার গাড়িতে বধূকে বাপের বাড়ি নেওয়া কিংবা জামাই-বৌ আনা-নেওয়ার প্রচলন ছিল গ্রামাঞ্চলে।
যান্ত্রিক যানবাহনের প্রভাবে গ্রামগঞ্জে টমটম বা ঘোড়ার গাড়ি এখন আর তেমন দেখা যায় না। তবে দুর্গম চরাঞ্চল ও প্রত্যন্ত গ্রামে এখনো ঘোড়ার গাড়ির ব্যবহার রয়েছে।
মানিকগঞ্জের পদ্মা-যমুনাবেষ্টিত দৌলতপুর, ঘিওর, শিবালয় ও হরিরামপুর উপজেলার গ্রাম ও চরাঞ্চলে এখনো ঘোড়ার গাড়িতে যাত্রী ও মালামাল পরিবহন করা হয়। তবে বর্তমানে বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই যাত্রীর চেয়ে মালামাল পরিবহন বেশি হয়।
দৌলতপুরের হাসেম বেপারী বলেন, ‘একসময় আমার তিনটি ঘোড়া ও গাড়ি ছিল। তখন পরিবার সচ্ছল ছিল। এখন একটি ঘোড়া ও গাড়ি আছে। কিন্তু এ পেশা ছেড়ে দিতে চাই। ঘোড়ার গাড়িতে এখন তেমন আয় হয় না। ঘোড়া পালন ব্যয়বহুল হয়ে গেছে। খাদ্যসহ সবকিছুর দাম বেড়েছে। ফলে ঘোড়া পালন কমে গেছে।’
ঘিওরের ব্যবসায়ী রবি সাহা বলেন, ‘কিছুদিন আগেও মানুষ ঘোড়ার গাড়িতে টিন, কাঠ, সিমেন্টসহ বিভিন্ন মালামাল বহন করত। পরিবেশবান্ধব, ধোঁয়া ও শব্দবিহীন এ বাহনটি ছিল খুবই জনপ্রিয়। যেসব রাস্তায় অন্য যানবাহন চলাচল করতে পারত না, সেখানে ঘোড়ার গাড়ি অনায়াসে মালামাল পৌঁছে দিত।’
গ্রামীণ ঐতিহ্যের বাহক ঘোড়া ও ঘোড়ার গাড়ির প্রচলন টিকিয়ে রাখতে সরকারি উদ্যোগ ও সহায়তা প্রয়োজন বলে অভিজ্ঞ মহল মনে করেন।

