ভেনেজুয়েলার পর পশ্চিমা সাম্রাজ্যবাদী আগ্রাসনের মুখে আছে ইরান। নিকোলাস মাদুরোকে নিজের বাসভবন থেকে অপহরণ করে নিয়ে আসা কিংবা আয়াতুল্লাহ আলি খামেনিকে উৎখাতের হুমকি; সবকিছুই লিবিয়ায় প্রয়াত নেতা মুয়াম্মার গাদ্দাফির শেষ বার্তাকে মনে করাচ্ছে।
যেখানে গাদ্দাফি বলেছিলেন, ‘পরম করুণাময় ও অসীম দয়ালু আল্লাহর নামে শুরু করছি। দীর্ঘ ৪০ বছর, কিংবা তারও বেশি সময় ধরে, ঠিক মনে নেই; আমি মানুষের জন্য যা কিছু সম্ভব সব করেছি। আমি তাদের ঘর দিয়েছি, হাসপাতাল দিয়েছি, স্কুল দিয়েছি; আর যখন তারা ক্ষুধার্ত ছিল, আমি তাদের খাবারের ব্যবস্থা করেছি। এমনকি বেনগাজির মরুভূমিকেও আমি ফসলি জমিতে রূপান্তরিত করেছি।
আমি সেই কাউবয় রোনাল্ড রিগ্যানের আক্রমণের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়িয়েছিলাম। যখন তিনি আমার পালিত অনাথ কন্যাকে হত্যা করেছিলেন, তখন তার লক্ষ্য ছিল আমাকে হত্যা করা; কিন্তু পরিবর্তে তিনি ওই নিষ্পাপ শিশুটিকে হত্যা করেন। এরপর আমি আমার আফ্রিকান ভাই-বোনদের সাহায্য করেছি, আফ্রিকান ইউনিয়ন গঠনের জন্য অর্থ দিয়েছি।
প্রকৃত গণতন্ত্রের ধারণা বোঝার জন্য আমি মানুষকে সাধ্যমতো সাহায্য করেছি, যেখানে জনগণের কমিটিগুলোই দেশ পরিচালনা করত। কিন্তু কিছু মানুষের কাছে তা কখনোই যথেষ্ট ছিল না। এমনকি যাদের ১০ কক্ষের বাড়ি ছিল, গায়ে ছিল নতুন স্যুট আর ঘরে ছিল দামী আসবাবপত্র; তারাও সন্তুষ্ট ছিল না। তাদের চরম স্বার্থপরতা আর আকাঙ্ক্ষা কেবল বেড়েই চলেছিল।
তারা আমেরিকান এবং অন্যান্য বিদেশি পর্যটকদের বলত যে, তাদের গণতন্ত্র এবং স্বাধীনতা প্রয়োজন। তারা কখনো উপলব্ধি করেনি যে, এটি একটি গলাকাটা প্রতিযোগিতার ব্যবস্থা যেখানে বড় কুকুর ছোটদের খেয়ে ফেলে। তারা কেবল ওই চটকদার শব্দগুলোর মোহে অন্ধ ছিল। তারা বোঝেনি যে আমেরিকায় কোনো বিনামূল্যে চিকিৎসা নেই, বিনামূল্যে হাসপাতাল নেই, থাকার ঘর নেই, শিক্ষা নেই এবং বিনামূল্যে খাবারের কোনো ব্যবস্থা নেই। যতক্ষণ না মানুষ ভিক্ষা করে কিংবা স্যুপের জন্য দীর্ঘ লাইনে গিয়ে দাঁড়ায়।
আমি যাই করি না কেন, কিছু মানুষের কাছে তা কখনোই যথেষ্ট ছিল না। তবে অনেকে জানতেন যে, আমি জামাল আবদেল নাসেরের সন্তান, যিনি সালাহউদ্দীনের (সালাহউদ্দিন আইয়ুবি) পর আমাদের দেখা একমাত্র প্রকৃত আরব ও মুসলিম নেতা ছিলেন। তিনি যেমন সুয়েজ খালকে তার জনগণের জন্য পুনরুদ্ধার করেছিলেন, তেমনি আমিও লিবিয়াকে আমার জনগণের জন্য দাবি করেছি। আমি তাঁর পদচিহ্ন অনুসরণ করার চেষ্টা করেছি, যাতে আমার জনগণকে ঔপনিবেশিক আধিপত্য এবং আমাদের সম্পদ চুরি করতে আসা চোরদের হাত থেকে মুক্ত রাখতে পারি।
আজ আমি সামরিক ইতিহাসের সবচেয়ে বড় শক্তির আক্রমণের শিকার। ওবামা আমাকে হত্যা করতে চায়, আমাদের দেশের স্বাধীনতা কেড়ে নিতে চায়; কেড়ে নিতে চায় আমাদের বিনামূল্যে শিক্ষা, চিকিৎসা, খাদ্য ও বাসস্থানের অধিকার। সে এগুলোকে প্রতিস্থাপন করতে চায় পুঁজিবাদ নামক আমেরিকান স্টাইলের এক চৌর্যবৃত্তি দিয়ে। কিন্তু তৃতীয় বিশ্বের আমরা সবাই জানি এর অর্থ কী? এর অর্থ হলো করপোরেশনগুলো দেশ চালাবে, বিশ্ব শাসন করবে আর সাধারণ মানুষ কষ্টে ধুঁকবে।
তাই আমার সামনে আর কোনো বিকল্প নেই। আমাকে রুখে দাঁড়াতেই হবে। আর আল্লাহর ইচ্ছা হলে আমি তাঁর পথ অনুসরণ করেই মৃত্যুবরণ করব; যে পথ আমাদের দেশকে ফসলি জমি, খাদ্য এবং সুস্বাস্থ্যের সম্পদে সমৃদ্ধ করেছে, এমনকি আমাদের আফ্রিকান ও আরব ভাই-বোনদের সাহায্য করার সামর্থ্য দিয়েছে।
আমি মরতে চাই না; কিন্তু যদি এই দেশ, এই জনগণ এবং আমার সন্তানসম হাজার হাজার মানুষকে রক্ষা করার জন্য আমাকে মরতে হয়, তবে তাই হোক।
এই উইল বা শেষ বার্তাটি বিশ্বের কাছে আমার কণ্ঠস্বর হয়ে থাকুক যে, আমি ন্যাটোর ক্রুসেডার আক্রমণের বিরুদ্ধে দাঁড়িয়েছিলাম, নিষ্ঠুরতার বিরুদ্ধে দাঁড়িয়েছিলাম, বিশ্বাসঘাতকতার বিরুদ্ধে দাঁড়িয়েছিলাম; আমি রুখে দাঁড়িয়েছিলাম পশ্চিমের ঔপনিবেশিক উচ্চাকাঙ্ক্ষার বিরুদ্ধে। আমি আমার আফ্রিকান, আরব ও মুসলিম ভাইদের সাথে এক আলোর দিশারি হয়ে অটল ছিলাম।
অন্যরা যখন প্রাসাদ গড়ছিল, আমি তখন এক সাধারণ বাড়ি এবং তাঁবুতে বসবাস করেছি। আমি সির্তের সেই সাধারণ শৈশবকে কখনো ভুলে যাইনি। আমি আমাদের জাতীয় কোষাগারের অর্থ নির্বিচারে ব্যয় করিনি। ইসলামের মহান নেতা সালাহউদ্দীন যেমন জেরুজালেমকে উদ্ধার করেছিলেন, তাঁর মতোই আমি নিজের জন্য সামান্যই গ্রহণ করেছি।
পশ্চিমে কেউ কেউ আমাকে উন্মাদ বা পাগল বলেছে। তারা সত্যটা জানে, তবুও মিথ্যে ছড়ায়। তারা জানে যে আমাদের দেশ স্বাধীন ও মুক্ত, এটি কোনো ঔপনিবেশিক কবজায় নেই। তারা জানে যে আমার লক্ষ্য এবং পথ অত্যন্ত স্বচ্ছ এবং তা ছিল কেবল আমার জনগণের কল্যাণে। আমি আমার শেষ নিঃশ্বাস পর্যন্ত আমাদের স্বাধীনতা রক্ষার জন্য লড়াই করে যাব। মহান আল্লাহ আমাদের বিশ্বাসী এবং স্বাধীন থাকতে সাহায্য করুন।

