ভেনেজুয়েলার ক্ষমতার অলিন্দে দীর্ঘ দুই দশক ধরে যে নামটি সমার্থক হয়ে ছিল দাপট আর রহস্যের সঙ্গে, তিনি সিলিয়া ফ্লোরেস। গত কয়েক দশকে কারাকাসের প্রেসিডেন্ট প্রাসাদের ভেতরে বসে দেশটির ভাগ্য নির্ধারণে তিনি অন্যতম কারিগর হিসেবে কাজ করেছেন। আজ তার গন্তব্য বদলে গেছে। মার্কিন বাহিনীর নাটকীয় নৈশ অভিযানে স্বামী ও প্রেসিডেন্ট নিকোলাস মাদুরোর সঙ্গে বন্দী হওয়ার পর ৬৯ বছর বয়সী এই নারী এখন নিউইয়র্কের আদালতের মুখোমুখি।
মাদুরো তাকে ভালোবেসে ডাকতেন ‘ফার্স্ট ওয়ারিয়র’ নামে। কিন্তু সমালোচক ও আন্তর্জাতিক বিশ্লেষকদের কাছে তিনি পরিচিত এমন এক ‘পাওয়ার বিহাইন্ড দ্য থ্রোন’ বা নেপথ্য ক্ষমতা হিসেবে, যার নির্দেশ ছাড়া মাদুরোর শাসনামলে অনেক বড় সিদ্ধান্তই বাস্তবায়িত হতো না।
সিলিয়া ফ্লোরেসের উত্থান ও মাদুরোর সঙ্গে তার সম্পর্কের শুরুটা ছিল বেশ নাটকীয়। নব্বইয়ের দশকের শুরুতে যখন তরুণ আইনজীবী হিসেবে ফ্লোরেস তার ক্যারিয়ার শুরু করেন, তখন তিনি হাতে নিয়েছিলেন ভেনিজুয়েলার ইতিহাসের অন্যতম সংবেদনশীল কিছু মামলা। ১৯৯২ সালের ব্যর্থ অভ্যুত্থানের পেছনের কারিগরদের আইনি সুরক্ষা দিতে গিয়েই তার পরিচয় হয় কারাবন্দী হুগো শ্যাভেজের সঙ্গে। শ্যাভেজের আইনজীবী হিসেবে কাজ করার সময় সেই কারাগারেই তার দেখা হয় মাদুরোর সঙ্গে, যিনি তখন শ্যাভেজের দেহরক্ষী হিসেবে কাজ করতেন।
মাদুরো পরবর্তী সময়ে স্মৃতিচারণ করে বলেছিলেন, ফ্লোরেসের সাহস ও দেশপ্রেম তাকে মুগ্ধ করেছিল। সেই সংগ্রামের দিনগুলো থেকেই তাদের জীবন ও রাজনৈতিক ভাগ্য আষ্টেপৃষ্ঠে জড়িয়ে যায় শ্যাভেজের রাজনৈতিক আদর্শের সঙ্গে।
১৯৯৮ সালে শ্যাভেজ ক্ষমতায় আসার পর ফ্লোরেসের রাজনৈতিক উত্থান ছিল উল্কার মতো। ২০০০ সালে তিনি ন্যাশনাল অ্যাসেম্বলির সদস্য হন এবং ২০০৬ সালে স্পিকার নির্বাচিত হন। টানা ছয় বছর তিনি কার্যত বিরোধীশূন্য একটি পার্লামেন্ট পরিচালনা করেছেন, যেখানে তার একক কর্তৃত্ব নিয়ে প্রশ্ন তোলার সাহস ছিল খুব কম মানুষেরই।
২০১৩ সালে শ্যাভেজের মৃত্যুর পর মাদুরোর ক্ষমতায় আরোহণের পেছনে ফ্লোরেস সবচেয়ে বড় স্তম্ভ হিসেবে কাজ করেছেন। সেই বছরের প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে জয়ের কয়েক মাস পরেই তারা আনুষ্ঠানিকভাবে বিয়ে করেন। যদিও তারা দীর্ঘদিন ধরেই এক ছাদের নিচে থাকছিলেন এবং তাদের আগের সংসারের সন্তানদের একত্রে বড় করছিলেন। তবে এই বিয়ে ছিল তাদের রাজনৈতিক জোটবদ্ধতার এক আনুষ্ঠানিক স্বীকৃতি।
ভেনিজুয়েলার রাজনীতিতে ফ্লোরেস নিজেকে একজন মমতাময়ী পারিবারিক নারী হিসেবে উপস্থাপন করতে পছন্দ করতেন। ‘কন সিলিয়া এন ফ্যামিলিয়া’ নামক একটি টেলিভিশন অনুষ্ঠানের মাধ্যমে তিনি সাধারণ মানুষের কাছে পৌঁছানোর চেষ্টা করতেন। যেখানে প্রায়ই তাকে তার স্বামীর সঙ্গে নাচে অংশ নিতে দেখা যেত। কিন্তু এই পর্দার আড়ালের চিত্র ছিল সম্পূর্ণ ভিন্ন। সাংবাদিক হোসে এনরিকে আরিওজার মতে, ফ্লোরেস ছিলেন মাদুরোর সবচেয়ে বিশ্বস্ত পেশাদার উপদেষ্টা এবং ক্ষমতার প্রতি অত্যন্ত উচ্চাকাঙ্ক্ষী। বিরোধীদের দমনে মাদুরো যে কঠোর অবস্থান নিতেন, তার নেপথ্যে ফ্লোরেসের মস্তিষ্কের ভূমিকা ছিল অপরিসীম।
ক্ষমতার অপব্যবহার ও স্বজনপ্রীতির অভিযোগ ফ্লোরেসের পিছু ছাড়েনি কখনো। ২০১২ সালে তার বিরুদ্ধে অভিযোগ ওঠে, তিনি ন্যাশনাল অ্যাসেম্বলিতে তার পরিবারের প্রায় ৪০ জন সদস্যকে উচ্চপদে নিয়োগ দিয়েছেন। তবে এই অভিযোগ তিনি দম্ভের সঙ্গেই স্বীকার করে নিয়েছিলেন। তার ব্যক্তিগত জীবনের সবচেয়ে বড় কলঙ্ক হিসেবে দেখা হয় ২০১৫ সালের ‘নারকো নেফিউজ’-এর ঘটনা। হাইতিতে মার্কিন ড্রাগ এনফোর্সমেন্ট অ্যাডমিনিস্ট্রেশনের এক অভিযানে তার দুই ভাগ্নে ৮০০ কেজি কোকেনসহ ধরা পড়ে। ফ্লোরেস সে সময় একে মার্কিন ষড়যন্ত্র বলে অভিহিত করলেও মার্কিন আদালত তাদের ১৮ বছরের কারাদণ্ড দেয়। যদিও পরবর্তীতে বাইডেন প্রশাসনের আমলে এক বন্দি বিনিময়ের মাধ্যমে তারা মুক্তি পায়। কিন্তু ট্রাম্প প্রশাসন পুনরায় তাদের ওপর নিষেধাজ্ঞা জারি করে এবং ফ্লোরেসকে সরাসরি মাদক পাচার ও দুর্নীতির সঙ্গে জড়িত থাকার দায়ে অভিযুক্ত করে।
বর্তমানে সিলিয়া ফ্লোরেসের বিরুদ্ধে অভিযোগের তালিকা দীর্ঘ। ২০০৭ সালে ন্যাশনাল অ্যান্টি-ড্রাগ অফিসের পরিচালকের সঙ্গে বড় মাপের মাদক ব্যবসায়ীর বৈঠকের ব্যবস্থা করে দেওয়ার জন্য কয়েক লক্ষ ডলার ঘুষ নেওয়ার অভিযোগ উঠেছে তার বিরুদ্ধে। আন্তর্জাতিক বিশ্লেষক ক্রিস্টোফার সাবাতিনির মতে, ফ্লোরেস এমন এক ক্ষমতাধর ব্যক্তিত্ব যিনি জনসম্মুখে নিজের হাত রক্তে রঞ্জিত না করেও পর্দার আড়াল থেকে একটি পুরো ব্যবস্থাকে নিয়ন্ত্রণ করতেন।
তবে ভেনেজুয়েলায় চালানো এই হামলা ও স্ত্রীসহ মাদুরোকে গ্রেফতারের ঘটনাকে অনেকেই ন্যাক্কারজনক বলছে। অনেকের মতে পশ্চিমা গণমাধ্যম ফুলিয়ে ফাঁপিয়ে খবর প্রকাশ করে এই অন্যায়কে বৈধতা দেয়ার চেষ্টা করছে।
সূত্র: বিবিসি

