দীর্ঘ আড়াই দশকেরও বেশি সময় ধরে মহাকাশে মানুষের নিরবচ্ছিন্ন উপস্থিতির প্রতীক হয়ে থাকা আন্তর্জাতিক মহাকাশ স্টেশন (আইএসএস) এখন অবসরের দ্বারপ্রান্তে। ২০৩০ সালের মধ্যে এই বিশাল গবেষণাগারটি অকেজো হয়ে যাওয়ার সম্ভাবনা থাকলেও মার্কিন মহাকাশ গবেষণা সংস্থা নাসা এখন পর্যন্ত এর কোনো যোগ্য উত্তরসূরি নিশ্চিত করতে পারেনি। পৃথিবীর নিম্ন কক্ষপথে যুক্তরাষ্ট্রের এই আধিপত্য হারানোর ঝুঁকি এখন কেবল বৈজ্ঞানিক উদ্বেগের বিষয় নয় বরং এটি একটি বড় ধরনের জাতীয় নিরাপত্তা সংকটের পূর্বাভাস দিচ্ছে বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা।
দীর্ঘ সময় ধরে মহাকাশ গবেষণায় একক আধিপত্য বজায় রাখলেও বর্তমানে চীনের তিয়াংগং মহাকাশ স্টেশন আমেরিকার জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে। ২০২২ সালে কার্যক্রম শুরু করা এই চীনা স্টেশনটি বর্তমানে পূর্ণোদ্যমে কাজ করছে। বিশ্বের বিভিন্ন দেশের বিজ্ঞানীদের আকৃষ্ট করছে চীন। যদি নির্ধারিত সময়ে যুক্তরাষ্ট্রের কোনো বিকল্প স্টেশন প্রস্তুত না হয়, তবে মহাকাশ প্রযুক্তির বৈশ্বিক মানদণ্ড চীনের অনুকূলে চলে যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। এটি অনেকটা স্মার্টফোন বাজারের অ্যাপল ও অ্যান্ড্রয়েডের লড়াইয়ের মতো, যেখানে একবার পিছিয়ে পড়লে বাজার ফিরে পাওয়া প্রায় অসম্ভব।
আইএসএস-এর স্থায়িত্ব নিয়ে অনিশ্চয়তা কাটাতে সম্প্রতি মার্কিন সিনেটে একটি বিল উত্থাপন করা হয়েছে যেখানে ২০৩২ সাল পর্যন্ত স্টেশনের মেয়াদ বাড়ানোর প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে। নীতি নির্ধারকদের মতে, বেসরকারি সংস্থাগুলো এখনো নতুন স্টেশন তৈরির জন্য নাসার কাছ থেকে প্রয়োজনীয় নির্দেশনা ও পর্যাপ্ত অর্থায়ন পায়নি। বিশেষ করে ২০২৫ সালের দীর্ঘ সরকারি শাটডাউন এবং নাসা প্রশাসকের নিয়োগ সংক্রান্ত জটিলতায় এই প্রক্রিয়াটি অনেকখানি পিছিয়ে পড়েছে। ফলে ২০৩০ সালের মধ্যে বাণিজ্যিক স্টেশনগুলো পুরোপুরি কার্যকর হবে কি না, তা নিয়ে গভীর সংশয় তৈরি হয়েছে।
এই পরিস্থিতির মাঝেও ভাস্ট এবং অ্যাক্সিওম স্পেসের মতো বেসরকারি প্রতিষ্ঠানগুলো নিজস্ব উদ্যোগে অর্থ সংগ্রহ করে মহাকাশ স্টেশন তৈরির কাজ চালিয়ে যাচ্ছে। ভাস্ট ২০২৭ সালের মধ্যেই তাদের ‘হ্যাভেন-ওয়ান’ মডিউল উৎক্ষেপণের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করেছে এবং তারা নাসার সরাসরি সহায়তার অপেক্ষায় না থেকে নিজস্ব বিনিয়োগে এগোচ্ছে। একইভাবে অ্যাক্সিওম স্পেস ২০২৮ সালের মধ্যে তাদের নিজস্ব মডিউল পাঠানোর পরিকল্পনা করেছে, যা শুরুতে আন্তর্জাতিক মহাকাশ স্টেশনের সাথে যুক্ত থাকবে এবং পরবর্তীতে স্বাধীনভাবে কক্ষপথে বিচরণ করবে।
তবে এই বাণিজ্যিকীকরণের পথে বড় বাধা হলো বাজারের সীমাবদ্ধতা। বর্তমানে মহাকাশে গবেষণা বা পর্যটনের জন্য বেসরকারি খাতের চাহিদা এখনো ততটা শক্তিশালী হয়ে ওঠেনি, যার ফলে নাসা নিজেই এসব স্টেশনের প্রধান গ্রাহক হিসেবে থাকবে বলে ধারণা করা হচ্ছে। এই নির্ভরতা বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠানগুলোর জন্য এক ধরনের আর্থিক ঝুঁকি তৈরি করছে, কারণ নাসার বিশাল অঙ্কের চুক্তি ছাড়া মহাকাশে বিশাল কাঠামো পরিচালনা করা অত্যন্ত ব্যয়বহুল। বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, মহাকাশ অর্থনীতি এখন এক রূপান্তরকালীন সময়ের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে যেখানে সরকারি পৃষ্ঠপোষকতা অপরিহার্য।
আন্তর্জাতিক মহাকাশ স্টেশনের বর্তমান অবস্থা বেশ নাজুক হয়ে পড়েছে কারণ প্রায়শই সেখানে ফাটল এবং যান্ত্রিক ত্রুটি দেখা দিচ্ছে। নাসার সেফটি প্যানেল সতর্ক করে জানিয়েছে, বর্তমান স্টেশনের আয়ু ফুরিয়ে আসার আগেই যদি বিকল্প কোনো ব্যবস্থা না করা হয়, তবে আর্টেমিস মিশনের মতো গুরুত্বপূর্ণ চন্দ্র অভিযানের প্রস্তুতি বিঘ্নিত হবে। গভীর মহাকাশে দীর্ঘযাত্রার আগে নভোচারীদের স্বাস্থ্য ও প্রযুক্তির পরীক্ষা চালানোর জন্য পৃথিবীর কক্ষপথে একটি স্থায়ী আস্তানা থাকা নাসার জন্য কৌশলগতভাবে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
মহাকাশে যুক্তরাষ্ট্রের এই উপস্থিতিকে কেবল বিজ্ঞানের মাপকাঠিতে দেখলে ভুল হবে, কারণ এটি দেশটির কূটনৈতিক শক্তির একটি বড় উৎস। সাবেক সামরিক কর্মকর্তা এবং মহাকাশ বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, পানামা খাল যেমন একসময় বিশ্ব বাণিজ্যের ধমনী ছিল, পৃথিবীর নিম্ন কক্ষপথ ভবিষ্যতে তেমনি বিশ্ব অর্থনীতি ও জাতীয় নিরাপত্তার কেন্দ্রবিন্দু হয়ে উঠবে। এই অঞ্চলে নেতৃত্ব ধরে রাখতে না পারলে যুক্তরাষ্ট্র কেবল বৈজ্ঞানিক গবেষণায় পিছিয়ে পড়বে না বরং মহাকাশ কূটনীতিতেও বন্ধু দেশগুলোর আস্থা হারাবে।
সবচেয়ে বড় শঙ্কা হলো আন্তর্জাতিক অংশীদারিত্বের ফাটল নিয়ে, বিশেষ করে রাশিয়ার পক্ষ থেকে ২০২৮ সালের পর স্টেশনে না থাকার ইঙ্গিত পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলেছে। রাশিয়ার সহযোগিতা ছাড়া বর্তমান স্টেশনটি টিকিয়ে রাখা যুক্তরাষ্ট্রের জন্য যেমন ব্যয়বহুল, তেমনি প্রযুক্তিগতভাবেও চ্যালেঞ্জিং।

