জুলাই আন্দোলনের সময় এবং তার পরবর্তীতে তৈরি পোশাকসহ অন্যান্য খাতের যেসব কারখানা ও ব্যবসা-প্রতিষ্ঠান বন্ধ হয়ে যায়, দেড় বছর পরও সেগুলো চালু করা সম্ভব হয়নি। নতুন ব্যবসার ক্ষেত্রও তৈরি হয়নি। চলমান পরিস্থিতি আরও জটিল হয়েছে।
অনেক ব্যবসায়ী এখনো পলাতক। তাদের কারখানাগুলোও অচল। দেশে থাকা অনেক ব্যবসায়ীই মামলাসহ নানান হয়রানির মধ্যে রয়েছেন। এর সঙ্গে রয়েছে গ্যাস ও বিদ্যুতের সংকট। ডলারের অতি মূল্যায়ন তো রয়েছেই। যা ব্যবসাবাণিজ্যের ব্যয় বাড়িয়েছে অনেক গুণ। ফলে দেশের ব্যবসাবাণিজ্যে এখনো দুর্দিন কাটেনি।
জাতীয় সংসদ নির্বাচন ঘনিয়ে এলেও অনিশ্চয়তা কাটেনি। আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ে সবার মধ্যে উদ্বেগ, উৎকণ্ঠা। রাজনৈতিক দৃশ্যপট বদলাচ্ছে প্রতিদিন। এ নিয়ে ব্যবসায়ী মহলে রয়েছে অস্থিরতা। শেখ হাসিনার বিদায়ের দেড় বছর পরও ব্যবসাবাণিজ্যে দুর্দিন বিরাজ করছে।
সামগ্রিক অর্থনীতি এগোচ্ছে ধীরগতিতে। নেই নতুন বিনিয়োগ। মূল্যস্ফীতির উচ্চচাপ, রাজস্ব আদায়ে ধীরগতি, ব্যাংক খাতের অনিশ্চয়তা, ঋণের চড়া সুদ, বৈশ্বিক মন্দা পরিস্থিতি এ সংকটকে করেছে আরও ঘনীভূত। বিশ্লেষকরা বলছেন, নির্বাচন না হওয়া পর্যন্ত এই অনিশ্চয়তা কাটানোর সুযোগ নেই। সামষ্টিক অর্থনীতির গতি বাড়ারও সম্ভাবনা নেই।
তবে জাতিসংঘের শিল্প বাণিজ্য সংস্থা আঙ্কটাড বলছে, আগামী নভেম্বরে উন্নয়নশীল দেশের চূড়ান্ত স্বীকৃতি পেতে যাওয়া বাংলাদেশের জিডিপি প্রবৃদ্ধি চলতি বছর হবে ৪ দশমিক ৬ শতাংশ। যা গেল বছরের তুলনায় কিছুটা বেশি। আগামী বছর এই প্রবৃদ্ধি বেড়ে দাঁড়াবে ৫ দশমিক ৪ শতাংশে।
এদিকে চলতি অর্থবছরের প্রথম ছয় মাসে (জুলাই থেকে ডিসেম্বর) ২৬টি দেশে বাংলাদেশের পোশাক রপ্তানি কমেছে। ইউরোপ ও মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের বড় বাজারগুলোতে নেতিবাচক প্রবণতা নতুন মাত্রা যোগ করেছে। জানা গেছে, চলতি ২০২৫-২৬ অর্থবছরের প্রথম ছয় মাসে বিভিন্ন দেশে বাংলাদেশের তৈরি পোশাক রপ্তানি কমেছে ২ দশমিক ৬৩ শতাংশ।
এসময়ে রপ্তানি হয়েছে ১ হাজার ৯৩৬ কোটি ৫৪ লাখ ডলারের, যা আগের অর্থবছরের একই সময়ে হয়েছিল ১ হাজার ৯৮৮ কোটি ৭৭ লাখ ডলারের। এর সঙ্গে শাকসবজি, মাছ, হিমায়িত খাদ্য, অপ্রচলিত পণ্য রপ্তানিও কমেছে। দেশের ভিতরেও ব্যবসার গতি কমেছে। শীর্ষস্থানীয় ব্যবসায়ীরা বলছেন, ২০২৫ বছরটি ছিল টিকে থাকার লড়াই। ২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারিতে জাতীয় নির্বাচনের পর নির্বাচিত সরকার দায়িত্ব নিলে অর্থনীতির এই অচলাবস্থা কাটানোর প্রত্যাশা রয়েছে। সেই প্রত্যাশায় অনেকেই লোকসান দিয়ে হলেও ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান টিকিয়ে রাখছেন।
তারা বলছেন, রাজনৈতিক অনিশ্চয়তা, আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি ও জ্বালানি সংকট, উচ্চ মূল্যস্ফীতির বাইরেও বেসরকারি খাতে নানা কাঠামোগত সমস্যায় তারা জর্জরিত। উচ্চ সুদহার ও কঠোর ঋণনীতির কারণে বিনিয়োগ ব্যয় বেড়েছে। এক বছরে ব্যবসা পরিচালনার খরচ বেড়েছে প্রায় ৩৫ শতাংশ। সেই অনুপাতে সাধারণ মানুষের ক্রয়ক্ষমতা না বাড়ায় পণ্যের বিক্রি কমেছে ২০ থেকে ৩০ শতাংশ।
দেশের ব্যবসাবাণিজ্য ও অর্থনীতি যে কঠিন সময় পার করছে তা সরকারের পক্ষ থেকেও স্বীকার করা হয়েছে। পরিকল্পনা কমিশনের সাধারণ অর্থনীতি বিভাগের (জিইডি) প্রকাশিত ‘বাংলাদেশ স্টেট অব দি ইকোনমি ২০২৫’ শীর্ষক প্রতিবেদন বলছে, দেশের অর্থনীতি সংকটময় পরিস্থিতি পার করছে। বেসরকারি খাতে ঋণ প্রবৃদ্ধি কমে গেছে। ব্যাংকগুলোর ঋণ বিতরণে ধীরগতি দেখা দিয়েছে। সুদের হার বেড়ে যাওয়ায় উদ্যোক্তারা নতুন উদ্যোগ নিতে উৎসাহী হচ্ছেন না। কর্মসংস্থান ও উৎপাদনে স্থবিরতা তৈরি হয়েছে। প্রতিবেদনে দুর্বল বেসরকারি বিনিয়োগ ও শিল্প কার্যক্রমকে প্রবৃদ্ধির বড় বাধা হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে।
বিশ্বব্যাংকের ঢাকা কার্যালয়ের সাবেক মুখ্য অর্থনীতিবিদ ড. জাহিদ হোসেন বলেন, ‘আমাদের অর্থনীতিতে অনিশ্চয়তা রয়েই গেছে। তবে অস্থিরতা অনেক কমেছে। কিন্তু এখনো স্থিতিশীল বলা যাবে না।
বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, অক্টোবর শেষে বেসরকারি ঋণের প্রবৃদ্ধি দাঁড়িয়েছে ৬.২৩ শতাংশ, যা ২০০৩ সালের পর সর্বনিম্ন। কারণ সাম্প্রতিক সময়ে দেশে ব্যবসাবাণিজ্য বৃদ্ধির কোনো সুযোগ তৈরি হয়নি। যে কারণে মূলধনি যন্ত্রপাতি (ক্যাপিটাল মেশিনারি) আমদানির ঋণপত্র (এলসি) খোলার হার ২০২৫ সালে পূর্ববর্তী বছরের তুলনায় প্রায় ২০ শতাংশের বেশি হ্রাস পেয়েছে, যা শিল্প খাতের দীর্ঘমেয়াদি স্থবিরতারই ইঙ্গিত দেয়।

