বৈদেশিক ঋণ থেকে পিছু হটছে বেসরকারি খাত

0
বৈদেশিক ঋণ থেকে পিছু হটছে বেসরকারি খাত

দেশে বিনিয়োগের আকাশ এখন মেঘাচ্ছন্ন। রাজনৈতিক অনিশ্চয়তা, দুর্বল আইন-শৃঙ্খলা আর জ্বালানিসংকটে ব্যবসার পরিবেশ এমন পর্যায়ে পৌঁছেছে যে নতুন বিনিয়োগ দূরের কথা, পুরনো ব্যবসা টিকিয়ে রাখাই হয়ে উঠছে বড় চ্যালেঞ্জ। এর সরাসরি প্রতিফলন দেখা যাচ্ছে বেসরকারি খাতের বৈদেশিক ঋণে।

বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য মতে, ২০২৫ সালের নভেম্বর শেষে বেসরকারি খাতের বৈদেশিক ঋণ দাঁড়িয়েছে ৯.৭৯ বিলিয়ন ডলারে। অথচ এর এক বছর আগে, ২০২৪ সালের ডিসেম্বর শেষে এই ঋণের পরিমাণ ছিল ১০.১৩১ বিলিয়ন ডলার। অর্থাৎ ১১ মাসের ব্যবধানে বেসরকারি খাতের বৈদেশিক ঋণ কমেছে প্রায় ৩.৩৫ শতাংশ।

কেন্দ্রীয় ব্যাংকের হিসাব অনুযায়ী, ২০২৫ সালের আগস্ট শেষে বেসরকারি খাতের স্বল্পমেয়াদি বৈদেশিক ঋণ ছিল ৯.৫৪৯ বিলিয়ন ডলার। সেপ্টেম্বর শেষে তা বেড়ে দাঁড়ায় ৯.৬১৭ বিলিয়ন ডলারে।

অক্টোবর শেষে ঋণের পরিমাণ হয় ৯.৭১৭ বিলিয়ন ডলার এবং নভেম্বর শেষে তা পৌঁছায় ৯.৭৯২ বিলিয়ন ডলারে। সংখ্যায় সামান্য ঊর্ধ্বগতি থাকলেও বছরওয়ারি তুলনায় চিত্রটি স্পষ্টতই নিম্নমুখী। সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা বলছেন, দেশে এখন কার্যত বিনিয়োগের মতো কোনো পরিবেশ নেই। একদিকে উচ্চ সুদের হার ও জ্বালানিসংকট, অন্যদিকে দুর্বল আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতি—সব মিলিয়ে উদ্যোক্তারা চরম অনিশ্চয়তায় দিন কাটাচ্ছেন। এমন বাস্তবতায় ঋণ নিয়ে নতুন বিনিয়োগের কথা ভাবা কঠিন।

বিশ্লেষকদের মতে, বর্তমানে যে বৈদেশিক ঋণ নেওয়া হচ্ছে, তার বড় অংশই নতুন শিল্প স্থাপন বা উৎপাদন সম্প্রসারণে নয়; বরং আমদানির বিল পরিশোধ, কাঁচামাল সংগ্রহ এবং পুরনো দায় মেটাতেই ব্যয় হচ্ছে। ফলে অর্থনীতিতে নতুন বিনিয়োগের গতি তৈরি হচ্ছে না। 

সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের সম্মানিত ফেলো অধ্যাপক মোস্তাফিজুর রহমান বলেন, ‘নতুন বিনিয়োগ না হলে বেসরকারি খাতে ব্যাংকঋণের চাহিদাও বাড়ে না। বর্তমান ঋণ প্রবৃদ্ধি স্পষ্ট করে দিচ্ছে, দেশে নতুন শিল্প স্থাপন ও সম্প্রসারণমূলক বিনিয়োগ অত্যন্ত সীমিত। বিনিয়োগ কমে যাওয়ার সরাসরি প্রভাব পড়ছে কর্মসংস্থান ও জিডিপি প্রবৃদ্ধির ওপর। যত কম বিনিয়োগ হবে, বেকারত্ব তত বাড়বে এবং অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধিও শ্লথ হবে।’

বিনিয়োগ স্থবিরতার আরেকটি বড় প্রমাণ মিলছে বেসরকারি খাতে ব্যাংকঋণের প্রবৃদ্ধিতে। টানা ছয় মাস এই প্রবৃদ্ধি ৭ শতাংশের নিচে আটকে রয়েছে। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের তথ্য মতে, ২০২৫ সালের নভেম্বর শেষে বেসরকারি খাতে ব্যাংকঋণের প্রবৃদ্ধি নেমে এসেছে মাত্র ৬.৫৮ শতাংশে, যা বাংলাদেশ ব্যাংকের নির্ধারিত লক্ষ্যমাত্রারও নিচে।

কেন্দ্রীয় ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, গত বছরের নভেম্বর মাসে বেসরকারি খাতে ঋণ বিতরণ হয়েছে এক লাখ ৭৭ হাজার ৩৮২ কোটি টাকা। আগের বছর একই সময়ে এই অঙ্ক ছিল এক লাখ ৬৬ হাজার ৪৩২ কোটি টাকা। ফলে এক বছরে ঋণ বিতরণ বেড়েছে ৬.৫৮ শতাংশ। তবে এর আগের মাস অক্টোবরে বেসরকারি খাতে ঋণ প্রবৃদ্ধি নেমে এসেছিল ইতিহাসের সর্বনিম্ন ৬.২৩ শতাংশে।

আবার চলতি অর্থবছরের জুলাই থেকে নভেম্বর সময়ে মূলধনী যন্ত্রপাতি আমদানির দায় নিষ্পত্তি ১৬ শতাংশেরও বেশি কমেছে। 

অর্থনীতিবিদদের মতে, এটি নতুন বিনিয়োগ স্থবিরতার আরেকটি শক্ত প্রমাণ। বাংলাদেশ নিটওয়্যার প্রস্তুতকারক ও রপ্তানিকারক সমিতির সভাপতি মোহাম্মদ হাতেম বলেন, “রাজনৈতিক অস্থিরতার মধ্যে কেউ ঝুঁকি নিয়ে বিনিয়োগ করবে না। বর্তমানে যে ‘মব সংস্কৃতি’ তৈরি হয়েছে, তা মোটেও ব্যবসাবান্ধব নয়। আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতি স্বাভাবিক না হলে দেশি কিংবা বিদেশি কোনো বিনিয়োগই আসবে না। ৫০ কোটি টাকার যন্ত্রপাতি এনে যদি তিন বছর ঠিকভাবে চালানোই না যায়, তাহলে লোকসানের পরিমাণ কতটা হবে, তা বলার অপেক্ষা রাখে না।” 

তিনি আরো বলেন, ‘নতুন ব্যবসা করতে গেলে গ্যাস ও বিদ্যুতের সংকট বড় বাধা হয়ে দাঁড়াচ্ছে। বিনিয়োগের আগে আমাকে ভাবতে হচ্ছে—আমি আদৌ গ্যাস পাব কি না। সরকার এখনো নিরবচ্ছিন্ন গ্যাস ও বিদ্যুৎ সরবরাহ নিশ্চিত করতে পারছে না। আমার নিজের কারখানায়ও গ্যাস ও বিদ্যুৎ সংকটের কারণে উৎপাদন ব্যাহত হয়েছে। সময় বেশি লাগায় খরচ বেড়েছে, যার সরাসরি প্রভাব পড়েছে মুনাফার ওপর।’

সব মিলিয়ে বিনিয়োগে অনিশ্চয়তার ছায়া যত দীর্ঘ হচ্ছে, ততই সরে যাচ্ছে বেসরকারি খাতের বৈদেশিক ঋণ। অর্থনীতিবিদদের আশঙ্কা, এই স্থবিরতা কাটাতে দ্রুত আস্থা ফেরানো না গেলে কর্মসংস্থান, শিল্পায়ন ও সামগ্রিক অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি আরো চাপে পড়বে। সৌজন্যে: কালের কণ্ঠ

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here