একটা চলচ্চিত্র শেষ হওয়ার পর যখন দর্শকরা দাঁড়িয়ে চোখ মুছতে মুছতে হাততালি দেয়, তখন সেই সিনেমা ভালো না খারাপ এই প্রশ্নটা অনেকটাই ছোট হয়ে যায়। বড় হয়ে ওঠে দর্শকের অনুভূতি, ভালো লাগার স্বার্থকতা। বনলতা এক্সপ্রেস দেখার পর ঠিক এমনই একটা অনুভূতি কাজ করে।
গত কয়েক বছরে ঈদের সিনেমা মানেই যেন অ্যাকশন, ক্রাইম, থ্রিলার। মারামারি আর উত্তেজনার ভিড়ে পরিবার নিয়ে বসে দেখার মতো গল্প কিছুটা কম ছিল। সেই জায়গা থেকে গত ঈদে উৎসব দিয়ে আলাদা নজর কাড়েন পরিচালক তানিম নূর। এবার তিনি ফিরেছেন বনলতা এক্সপ্রেস নিয়ে, যেখানে ফ্যামিলি অডিয়েন্সকে আবারও নিয়ে আসা হয়েছে সিনেমা হলে।
প্রখ্যাত কথাসাহিত্যিক হুমায়ুন আহমেদের ‘কিছুক্ষণ’ অবলম্বনে নির্মিত এই চলচ্চিত্র দেখতে বসে অনেক দিন পর মনে হয়েছে, যেন তাঁর চেনা জগতে আবার ফিরে যাওয়া। এক ধরনের নস্টালজিয়া পুরো সময়জুড়ে কাজ করে। তানিম নূর নিজের নির্মাণশৈলী ধরে রেখেই গল্পটা তুলে ধরেছেন।
গল্পের দিক থেকে এটি একেবারেই হুমায়ুনীয়। চঞ্চলতা, আবেগ আর একাধিক চরিত্রের ভেতরে আলাদা আলাদা গল্প। পুরো বিষয়টাই যেন এক যাত্রাপথ, যেখানে একসঙ্গে অনেকগুলো জীবনের টুকরো জুড়ে যায়।
চিত্রনাট্যের শুরুটা কিছুটা ধীর। চরিত্রগুলোর সঙ্গে পরিচিত হতে সময় নেয়। কিছু সংলাপ একটু দীর্ঘ মনে হয়, কিছু জায়গায় কাটছাঁট করা যেত। তবে ইন্টারভালের পর গতি বদলে যায়। একে একে চরিত্রগুলোর গল্প খুলতে থাকে, আর দর্শক ধীরে ধীরে ভেতরে ঢুকে যায়। শেষটা এসে বরং মনে হয়, আরও কিছুক্ষণ চলতে পারত।
অভিনয়ের জায়গায় সিনেমাটি শক্ত অবস্থানে। মোশাররফ করিম, চঞ্চল চৌধুরী, আজমেরী হক বাঁধন, সাবিলা নূর, শরিফুল রাজ, শ্যামল মাওলা, জাকিয়া বারী মম একসঙ্গে একটি সমৃদ্ধ কাস্ট তৈরি করেছেন।
মোশাররফ করিম এই সিনেমার কেন্দ্রবিন্দু, বরং বলা যায় এই গল্পের মূল চালিকাশক্তি। সাবলীল অভিনয়, নিখুঁত ডায়লগ ডেলিভারি, আবেগের জায়গাগুলোতে দখল, আবার প্রয়োজনমতো হালকা হাস্যরস, ইন্টেন্স মুহূর্ত কিংবা রাগ। সবকিছু তিনি এমনভাবে ক্যারি করেছেন, যা আলাদা করে চোখে পড়ে। শুধু নিজের চরিত্রটাকে জীবন্ত করাই না, অনেক জায়গায় অন্য অভিনেতাদেরও টেনে নিয়ে গেছেন। পুরো সিনেমা জুড়ে তাঁর উপস্থিতি একটা শক্ত ভিত তৈরি করে।
অভিনয়ের কথা বলতে গেলে শরিফুল রাজকে নিয়ে একটা আফসোস থেকেই যায়। তিনি ভালো করেন, কিন্তু বারবারই দেখা যায় তাঁর পাশেই কেউ না কেউ আরও বেশি উজ্জ্বল হয়ে ওঠেন। এখানে সেই জায়গাটা দখল করে নিয়েছেন মোশাররফ করিম। রাজ নিজের জায়গায় ঠিকই ছিলেন, কিন্তু আলোটা পুরোপুরি নিজের দিকে টানতে পারেননি।
চঞ্চল চৌধুরী যতটুকু সময় পেয়েছেন, নিজের মতোই স্বাভাবিক ছিলেন। তবে একটি জায়গায় মনে হয়েছে, কিছুটা জোর করে নৈতিকতার বার্তা দেওয়ার চেষ্টা এসেছে, যা পরিচালনার সিদ্ধান্ত বলেই মনে হয়।
জাকিয়া বারী মম আবেগের জায়গাগুলো সুন্দরভাবে ধরে রেখেছেন। শ্যামল মাওলা, সাবিলা নূর এবং ছোট্ট মেয়েটির অভিনয়ও ভালো লেগেছে। শ্যামল মাওলার ছোট কন্যার চরিত্রে তৃধা পাল মান আলাদা করে নজর কাড়ে।
শামীমা নাজনীন চরিত্রে আবেগের সঙ্গে হালকা কমিক রিলিফ এনে দিয়েছেন, যা গল্পের ভারসাম্য ধরে রাখতে সাহায্য করেছে।
আজমেরী হক বাঁধন কম স্ক্রিনটাইম পেয়েছেন। কোথাও কোথাও অভিনয়ে কিছুটা চাপানো অনুভূতি এসেছে। মাশা ইসলামের অভিনয় কিছুটা ওভার মনে হয়েছে। এছাড়া বাকি সবাই নিজ নিজ জায়গায় সাবলীল ছিলেন।
পুরো গল্পের লোকেশন মূলত একটি ট্রেন, দুই থেকে তিনটি বগির মধ্যেই সীমাবদ্ধ। তবুও একঘেয়েমি আসে না, যা পরিচালনার একটি বড় সাফল্য।
মিউজিক এই সিনেমার আলাদা একটি শক্তি হিসেবে কাজ করেছে। অর্থহীন থেকে শুরু করে আইয়ুব বাচ্চুর গান। যারা বাংলাদেশের ব্যান্ড মিউজিক ভালোবাসেন, তাদের জন্য এখানে আলাদা এক আবেগ কাজ করবে। বিশেষ করে প্রয়াত আইয়ুব বাচ্চুর গান অনেকের মধ্যেই নস্টালজিয়ার সঙ্গে আবেগ মিশিয়ে দেবে। এর সঙ্গে অর্ণবের গান যোগ হয়ে একটি ভিন্ন মাত্রা তৈরি করেছে। এছাড়াও ব্যাকগ্রাউন্ড স্কোর পুরো গল্পের সঙ্গে সাবলীলভাবে মিশে গেছে।
শুরুটা স্লো হলেও ইন্টারভালের পর পুরো সিনেমা এক ধরনের ইমোশনাল জার্নিতে পরিণত হয়। শেষটা রেখে যায় একটা শান্ত, ফিলগুড অনুভূতি। পরিবার নিয়ে বসে দেখার মতো গল্প খুঁজছেন যারা, তাদের জন্য বনলতা এক্সপ্রেস হতে পারে স্বস্তির একটি যাত্রা।

