বড় পতনে রপ্তানি খাত

0
বড় পতনে রপ্তানি খাত

রাজনৈতিক উত্তেজনা, ভোটের ডামাডোল, মব সন্ত্রাস আর নানা ইস্যুর আড়ালে নীরবে ডুবছে অর্থনীতির প্রাণ হিসেবে পরিচিত দেশের রপ্তানি খাত। পাঁচ মাস ধরে টানা এই খাতের আয় কমছে। কার্যাদেশ অন্য বছরের একই সময়ের তুলনায় ৩০ থেকে ৪০ শতাংশ পর্যন্ত কমে গেছে বলে জানিয়েছেন উদ্যোক্তারা। আগামী জুন মাস পর্যন্ত এই খাতের ঘুরে দাঁড়ানোর সম্ভাবনা কম বলে মনে করছেন তারা।

বৈশ্বিক চাহিদা সংকোচন, অভ্যন্তরীণ অস্থিরতা এবং নীতি সহায়তার ঘাটতির কারণে রপ্তানি আয়ে এমন নেতিবাচক ধাক্কা লেগেছে বলে মনে করা হচ্ছে। এই পরিস্থিতি অব্যাহত থাকলে এলডিসি গ্র্যাজুয়েশনের প্রাক্কালে দেশের রপ্তানি খাত আরো বড় সংকটে পড়তে পারে বলেও আশঙ্কা করছেন উদ্যোক্তারা।

দেশের রপ্তানি বাণিজ্যে টানা ভাটার এই চিত্র অর্থনীতির জন্য বাড়তি উদ্বেগ তৈরি করেছে। কারণ রপ্তানি হচ্ছে রেমিট্যান্স ও অভ্যন্তরীণ চাহিদার সঙ্গে দেশের অর্থনীতির অন্যতম প্রধান চালিকাশক্তি।

অথচ টানা পাঁচ মাস ধরে রপ্তানি আয় কমছে, যা সামনের দিনগুলোতে বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ, আমদানি সক্ষমতা ও কর্মসংস্থানের ওপর সরাসরি চাপ ফেলতে পারে বলে মনে করছেন খাতসংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা।

রপ্তানি উন্নয়ন ব্যুরো (ইপিবি) প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, গত ডিসেম্বর মাসে দেশের রপ্তানি আয় আগের বছরের একই সময়ের তুলনায় ১৪.২৫ শতাংশ কমে দাঁড়িয়েছে ৩৯৬ কোটি ডলারে। আগস্ট মাসে শুরু হওয়া এই নিম্নমুখী প্রবণতা এখনো কাটেনি। চলতি অর্থবছরের প্রথম ছয় মাসে (জুলাই-ডিসেম্বর) মোট রপ্তানি হয়েছে দুই হাজার ৩৯৯ কোটি ৬৮ লাখ ডলার, যা আগের বছরের একই সময়ের তুলনায় ২.১৯ শতাংশ বা প্রায় ৫৪ কোটি ডলার কম।

সংখ্যার হিসাবে এই ঘাটতির অঙ্ক খুব বড় মনে না হলেও বাস্তবতা ভিন্ন। কারণ এই ছয় মাসে একবারের জন্যও রপ্তানি আয়ে পুনরুদ্ধারের কোনো ইঙ্গিত পাওয়া যায়নি। অক্টোবরে রপ্তানি কমেছিল ৭.৪৩ শতাংশ, নভেম্বরে ৫.৫৪ শতাংশ এবং ডিসেম্বরে এসে পতনের হার আরো বেড়েছে। অর্থনীতিবিদদের মতে, ধারাবাহিকভাবে এমন ধারাবাহিকভাবে এমন পতন ভবিষ্যৎ অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতার জন্য স্পষ্ট সতর্কবার্তা। রপ্তানি আয়ের সঙ্গে সরাসরি সম্পৃক্ত দেশের বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ।

রিজার্ভের ওপর নির্ভর করে আমদানি সক্ষমতা, শিল্প উৎপাদন এবং বাজারে পণ্যের সরবরাহ। বাংলাদেশ খাদ্যশস্য, জ্বালানি ও শিল্পের কাঁচামালের বড় অংশ আমদানিনির্ভর। রিজার্ভ দুর্বল হলে আমদানিতে বাধা তৈরি হয়, এলসি খোলায় জটিলতা দেখা দেয় এবং ডলারের দাম বেড়ে যায়। এতে শিল্প উৎপাদন ব্যাহত হয় এবং ব্যবসার ব্যয় বেড়ে যায়। ২০২৩ সালের শেষ ভাগ থেকে ২০২৪ সালের মাঝামাঝি সময়ে এমন পরিস্থিতির অভিজ্ঞতা হয়েছে দেশের ব্যবসায়ীদের।

রিজার্ভ শক্ত রাখার প্রধান দুটি উৎস রেমিট্যান্স ও রপ্তানি। এর যেকোনো একটিতে বড় ধাক্কা লাগলে পুরো অর্থনীতিতে তার প্রভাব পড়ে। বর্তমানে বৈদেশিক ঋণের কিস্তি পরিশোধের চাপও বাড়ছে। ফলে পর্যাপ্ত ডলার প্রবাহ ও স্থিতিশীল রিজার্ভ নিশ্চিত করা সরকারের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে উঠছে।

রপ্তানি আয় কমে গেলে শিল্পপ্রতিষ্ঠানগুলো আর্থিক সংকটে পড়ে। এর প্রভাব পড়ে পরিবহন, বন্দর, ব্যাংক-বীমা এবং সেবা খাতেও। বিশেষ করে তৈরি পোশাক শিল্পে কর্মসংস্থান রয়েছে প্রায় ৪০ লাখ মানুষের। এই খাতের সঙ্গে প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে যুক্ত আরো কয়েক কোটি মানুষের জীবিকা। ফলে রপ্তানি খাতে দীর্ঘস্থায়ী মন্দা মানেই কর্মসংস্থানে বড় ধরনের ঝুঁকি।

কার্যাদেশ ৩০-৪০ শতাংশ কম
বিকেএমইএ সভাপতি মোহাম্মদ হাতেম বলেন, আগামী জুন মাস পর্যন্ত দেশের রপ্তানি আয় ঘুরে দাঁড়ানোর সম্ভাবনা খুবই কম। তিনি জানান, অন্যান্য বছরের একই সময়ের তুলনায় এ বছর কার্যাদেশ ৩০ থেকে ৪০ শতাংশ কম এসেছে। তার মতে, গ্যাস ও বিদ্যুৎ সরবরাহের অনিশ্চয়তা, ব্যাংকিং খাতের দুর্বলতা এবং পর্যাপ্ত নীতি সহায়তার অভাব রপ্তানি খাতকে চাপে ফেলেছে। তিনি আরো বলেন, প্রতিযোগী দেশগুলো যেখানে নগদ সহায়তা, করছাড় ও সহজ ঋণ সুবিধা দিয়ে রপ্তানিকে টিকিয়ে রাখছে, সেখানে বাংলাদেশ পিছিয়ে পড়ছে। দ্রুত নীতি সহায়তা না এলে সামনে পরিস্থিতি আরো খারাপ হতে পারে।

বিকেএমইএর সাবেক সভাপতি ও প্লমি ফ্যাশনস লিমিটেডের ব্যবস্থাপনা পরিচালক ফজলুল হক বলেন, অভ্যন্তরীণ ও বৈশ্বিক উভয় কারণেই রপ্তানি কমছে এবং এই ধারা আগামী আরো চার থেকে পাঁচ মাস অব্যাহত থাকতে পারে। বৈশ্বিক চাহিদা হ্রাসের পাশাপাশি যুক্তরাষ্ট্রের রেসিপ্রোকাল ট্যারিফ রপ্তানিতে নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে। তিনি আরো বলেন, অভ্যন্তরীণভাবে আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতি, ব্যাংক খাতের সংস্কার প্রক্রিয়ায় অনিশ্চয়তা এবং নতুন সরকারের অপেক্ষায় থাকা ক্রেতারা অর্ডার দিতে বিলম্ব করছেন। এর ফলে তার কারখানায় বর্তমানে ১৫ থেকে ২০ শতাংশ কম কার্যাদেশ পাওয়া যাচ্ছে।

বিজিএমইএর সাবেক পরিচালক মহিউদ্দিন রুবেল বলেন, ‘ইউরোপে চলমান অর্থনৈতিক মন্দা, যুক্তরাষ্ট্রের পোশাক বাজারে চাহিদা হ্রাস এবং ভোক্তাদের ক্রয়ক্ষমতা কমে যাওয়ার প্রভাব পাঁচ মাস ধরে বাংলাদেশের রপ্তানি প্রবৃদ্ধিকে নেতিবাচক ধারায় ঠেলে দিয়েছে।’ তার মতে, বৈশ্বিক বাজারে চাহিদা সংকোচনের সরাসরি প্রভাব পড়ছে তৈরি পোশাক খাতে।

তিনি আরো বলেন, ‘চীন, ভিয়েতনাম ও কম্বোডিয়ার তুলনামূলক দ্রুত, দক্ষ ও কম খরচে রপ্তানি প্রক্রিয়া, শক্তিশালী লজিস্টিক সুবিধা এবং ব্যবসাবান্ধব নীতি সহায়তার কারণে বাংলাদেশ প্রতিযোগিতায় পিছিয়ে পড়ছে। এসব দেশের দিকে বৈশ্বিক ক্রেতাদের ঝোঁক বাড়ছে, যা বাংলাদেশের জন্য বাড়তি চাপ তৈরি করছে।’

চলতি বছরই বাংলাদেশ এলডিসি থেকে উন্নয়নশীল দেশে উত্তরণের পথে রয়েছে। গ্র্যাজুয়েশনের পর শুল্কমুক্ত সুবিধাসহ নানা বাণিজ্যিক সুযোগ ধীরে ধীরে উঠে যাবে। যদিও উন্নত দেশগুলো তিন বছরের প্রস্তুতিকাল দেওয়ার কথা বলেছে, তবু সেই সময়ের জন্য প্রস্তুতি যথেষ্ট না হলে আঘাত বড় হতে পারে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা।

রাজনৈতিক ও নীতিগত অনিশ্চয়তার কারণে সরকারি ও বেসরকারি উভয় খাতেই প্রস্তুতি ব্যাহত হচ্ছে। বিনিয়োগ সিদ্ধান্ত স্থগিত থাকছে, নতুন প্রকল্পে গতি আসছে না। এতে উৎপাদন সক্ষমতা বাড়ানোর উদ্যোগও থমকে আছে।

সব মিলিয়ে এলডিসি গ্র্যাজুয়েশনের ঠিক আগমুহূর্তে রপ্তানি খাতের এই টানা ভাটা দেশের অর্থনীতির জন্য একটি স্পষ্ট সতর্কসংকেত। এখনই গ্যাস ও বিদ্যুতের নিরবচ্ছিন্ন সরবরাহ নিশ্চিত করা, ব্যাংকিং খাত সংস্কার, ব্যবসাবান্ধব নীতি সহায়তা জোরদার এবং রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা ফিরিয়ে আনতে না পারলে সামনে আরো বড় ধাক্কা আসতে পারে ।

সৌজন্যে: কালের কণ্ঠ

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here