দেশে নির্বাচন সামনে রেখে রাজনৈতিক সহিংসতায় খুনাখুনি বেড়েছে। গত এক বছরে দেশে শুধু রাজনৈতিক সহিংসতার ঘটনায় ১৩৩ জন নিহত হয়েছে। আহত হয়েছে সাত হাজার ৫১১ জন। গত বছর দেশে প্রায় চার হাজার হত্যা মামলা করা হয়েছে। পুলিশ সদর দপ্তর ও মানবাধিকার সংস্থা সূত্রে এসব তথ্য জানা গেছে।
তথ্য অনুযায়ী, গত এক বছরে মব সহিংসতা ও গণপিটুনিতে ১৬৮ জন নিহত এবং আহত হয়েছে ২৪৮ জন। হত্যা, নির্যাতন ও হয়রানির শিকার হয়েছেন ৫৩৯ জন সাংবাদিক। আইন-শৃঙ্খলা রক্ষা বাহিনীর অপরাধবিষয়ক প্রতিবেদন বিশ্লেষণে দেখা গেছে, দেশে হত্যা, ডাকাতি, দস্যুতা, মব সন্ত্রাসের ঘটনা বেড়েছে।
মানবাধিকার সংগঠন ও নাগরিক সমাজ বলছে, অপরাধ দমন ও আইনের শাসন প্রতিষ্ঠা না হলে সাধারণ মানুষের নিরাপত্তা আরো হুমকির মুখে পড়বে। গোয়েন্দা সূত্র বলছে, রাজনৈতিক অস্থিরতার কারণে কোনো অপরাধের লাগাম টানা সম্ভব হচ্ছে না। দুর্বৃত্তরা প্রকাশ্যে গুলি করে মানুষ হত্যায় দ্বিধা করছে না।সার্বিক তথ্য-উপাত্ত বলছে, রাজধানীর পাশাপাশি শহর, বন্দর, গ্রামে অপরাধমূলক ঘটনা বেড়েছে।
বিশেষ করে গুলি করে হত্যার ঘটনা বাড়তি আতঙ্ক সৃষ্টি করছে। বেশির ভাগ অপরাধমূলক ঘটনায় হামলাকারীরা গ্রেপ্তার হয়নি। নিরাপত্তা চেয়ে থানায় সাধারণ ডায়েরি (জিডি) করেও প্রাণ রক্ষা করতে পারেনি অনেকে। অপরাধীরা রাজনৈতিক আশ্রয়-প্রশ্রয়ে থাকায় পুলিশের বিরুদ্ধে তাদের গ্রেপ্তার না করার বিষয়ে অভিযোগ রয়েছে। অবশ্য আইন-শৃঙ্খলা রক্ষা বাহিনী বলে আসছে, দেশে আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতি অনেক ভালো রয়েছে।
সর্বশেষ গত সোমবার যশোরের মণিরামপুর উপজেলায় দুর্বৃত্তরা রানা প্রতাপ বৈরাগী নামের এক ব্যবসায়ীকে মাথায় অস্ত্র ঠেকিয়ে গুলি করে হত্যা করে। একই দিন বাজার থেকে হেঁটে বাড়ি যাওয়ার পথে চট্টগ্রামের রাউজানে জানে আলম সিকদার নামের সাবেক এক যুবদল নেতাকে গুলি করে হত্যা করে দুর্বৃত্তরা। নরসিংদীতে গত রবিবার দিবাগত রাতে মাধবদী থানার পাইকারচর ইউনিয়নের পুরানচর গ্রামে রমজান আলী নামের একজনকে পিটিয়ে হত্যা করা হয়।
অপরাধ বিশ্লেষকরা বলছেন, অন্তর্বর্তী সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর আশা করা হয়েছিল, দেশের আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতির উন্নতি হবে। কিন্তু উল্টো অবনতি হয়েছে। রাজনৈতিক হানাহানি, সামাজিক বিরোধ, বেকারত্ব ও মাদকাসক্তির কারণে অপরাধ প্রবণতা বাড়ছে।
স্বরাষ্ট্র উপদেষ্টা বলছেন, আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতি স্বাভাবিক রাখতে সর্বাত্মক চেষ্টা চলছে।
পুলিশ সদর দপ্তরের ভাষ্য : পুলিশ সদর দপ্তরের তথ্য বলছে, গত বছর সারা দেশে প্রায় চার হাজার হত্যা মামলা করা হয়েছে। এর মধ্যে ১১ মাসে বিভিন্ন থানায় তিন হাজার ৫০৯টি হত্যা মামলা করা হয়।
পুলিশ সদর দপ্তরের তথ্য বলছে, দেশে হত্যা, নারী ও শিশু নির্যাতন, অপহরণ, চুরি, ছিনতাই, দস্যুতা ও ডাকাতির ঘটনায় গত বছরের আগস্ট থেকে চলতি বছরের আগস্ট পর্যন্ত ১৩ মাসে অপরাধমূলক ঘটনায় ৩৯ হাজার ৯৩৬টি মামলা করা হয়েছে। এই হিসাবে প্রতি মাসে মামলা তিন হাজার ৭২টি। এই হিসাবে প্রতিদিন মামলা ৭২টি।
পুলিশ সদর দপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৩ সালের জানুয়ারি থেকে ২০২৪ সালের জানুয়ারি পর্যন্ত ১৩ মাসে এসব অপরাধের ঘটনায় ৩৬ হাজার ৩১৫টি মামলা করা হয়। এতে একই সময়ের মধ্যে আগের বছরের তুলনায় তিন হাজার ২১টি মামলা বেশি হয়।
ঢাকা মহানগর পুলিশের (ডিএমপি) তথ্য মতে, এ বছরের প্রথম ১০ মাসের প্রতি মাসে প্রায় ২০টি করে হত্যাকাণ্ড সংঘটিত হয়েছে। পুলিশ সদর দপ্তরের হিসাবে দেখা যাচ্ছে, প্রতি মাসে গড়ে ৩১টি হত্যাকাণ্ড হয়।
ডিএমপির গণমাধ্যম ও জনসংযোগ বিভাগের উপকমিশনার মুহাম্মদ তালেবুর রহমান বলেন, অনেক হত্যাকাণ্ডের রহস্য উদঘাটন করা হয়েছে। অন্য ঘটনাগুলোর বিষয়ে তদন্ত চলছে।
জাতীয় সংসদ নির্বাচন সামনে রেখে সারা দেশে আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে বিশেষ অভিযান অব্যাহত রাখার পাশাপাশি থানা থেকে লুণ্ঠিত অস্ত্র উদ্ধার তৎপরতা বাড়াতে মাঠ পর্যায়ে পুলিশ কর্মকর্তাদের নির্দেশ দিয়েছেন পুলিশ মহাপরিদর্শক (আইজিপি) বাহারুল আলম।
এইচআরএসএসের তথ্য যা বলছে : হিউম্যান রাইটস সাপোর্ট সোসাইটির (এইচআরএসএস) প্রতিবেদনে বলা হয়, ২০২৫ সালে সারা দেশে রাজনৈতিক ও দলীয় আধিপত্য বিস্তার, রাজনৈতিক প্রতিশোধ পরায়ণতা, সমাবেশকেন্দ্রিক সহিংসতা, কমিটি গঠন নিয়ে বিরোধ, নির্বাচনকেন্দ্রিক সহিংসতা, চাঁদাবাজি এবং বিভিন্ন স্থাপনা দখলকেন্দ্রিক ৯১৪টি সহিংসতার ঘটনায় ১৩৩ জনকে হত্যা করা হয়। এর মধ্যে বিএনপির ৯৩ জন, আওয়ামী লীগের ২৩ জন, জামায়াতের তিনজন রয়েছে। এ ছাড়া এসব ঘটনায় সাত হাজার ৫১১ জন আহত হয়েছে।
এ সময়ে মব সহিংসতা ও গণপিটুনির ঘটনায় উদ্বেগ জানিয়ে প্রতিবেদনে বলা হয়, ২০২৫ সালে সারা দেশে চুরি, ডাকাতি, ছিনতাই, আধিপত্য বিস্তার, ধর্মীয় অবমাননাসহ বিভিন্ন অভিযোগে ২৯২টি ঘটনায় মব সহিংসতা ও গণপিটুনিতে ১৬৮ জন নিহত ও ২৪৮ জন আহত হয়।
প্রতিবেদনে বলা হয়, ২০২৫ সালে সারা দেশে ৩১৮টি হামলার ঘটনায় কমপক্ষে ৫৩৯ জন সাংবাদিক হত্যা, নির্যাতন ও হয়রানির শিকার হয়েছেন। এর মধ্যে তিনজনকে হত্যা, ২৭৩ জনকে বিভিন্নভাবে নির্যাতন ও আহত, ৫৭ জন লাঞ্ছিত, ৮৩ জনকে হুমকি প্রদান এবং ১৭ জন সাংবাদিককে গ্রেপ্তার করা হয়।
এ সময়ে বিচারবহির্ভূত হত্যা, থানা ও কারাগারে মৃত্যুর বিষয়ে সংস্থাটির পক্ষ থেকে উদ্বেগ জানিয়ে প্রতিবেদনে বলা হয়, পুলিশি হেফাজত, নির্যাতন, গুলি, বন্দুকযুদ্ধ, আইন-শৃঙ্খলা রক্ষা বাহিনীর সঙ্গে সংঘর্ষে ৪০ জন নিহত হয়েছে। তাদের মধ্যে ছয়জন সংঘর্ষে বা কথিত বন্দুকযুদ্ধের নামে, ১২ জন নির্যাতনে, ১২ জন আইন-শৃঙ্খলা রক্ষা বাহিনীর হেফাজতে এবং ১০ জন গুলিবিদ্ধ হয়ে নিহত হয়েছে।
২০২৫ সালে কমপক্ষে দুই হাজার ৪৭ জন নারী ও কন্যাশিশু নির্যাতনের শিকার হয়েছে উল্লেখ করে প্রতিবেদনে বলা হয়, ৮২৮ জন ধর্ষণের শিকার হয়েছে। এর মধ্যে ৪৭৪ জন ১৮ বছরের কম বয়সী বা শিশু। ১৭৯ জন নারী ও কন্যাশিশুকে দলবদ্ধ ধর্ষণ এবং ধর্ষণের পর ২৮ জনকে হত্যা করা হয়েছে। এসব ঘটনায় আত্মহত্যা করেছেন ১০ জন নারী। ৪১৪ জন নারী ও কন্যাশিশু যৌন নিপীড়নের শিকার হয়েছে। এর মধ্যে শিশুর সংখ্যা ২৩৬।
শ্রমিক নির্যাতনে মানবাধিকার লঙ্ঘনের বিষয় উল্লেখ করে প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ২০২৫ সালে ৩৫৯টি শ্রমিক নির্যাতনের ঘটনায় শ্রমিক অসন্তোষ, শ্রমিক-পুলিশ সংঘর্ষ, হামলাসহ নানা কারণে ৯৬ জন নিহত এবং এক হাজার ২১ জন আহত হয়েছে। এ ছাড়া অস্বাস্থ্যকর পরিবেশ এবং শ্রমিকদের সুরক্ষামূলক সরঞ্জামের অভাবে দুর্ঘটনায় কমপক্ষে ১৬৮ জন শ্রমিক তাঁদের কর্মক্ষেত্রে প্রাণ হারিয়েছেন। প্রতিবেদনে বলা হয়, চারজন গৃহকর্মী মালিকের নির্যাতনে নিহত এবং আটজন গুরুতর আহত হয়েছে।
সার্বিক বিষয়ে এইচআরএসএস নির্বাহী পরিচালক ইজাজুল ইসলাম বলেন, দেশে আইনের শাসন প্রতিষ্ঠা, গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়া শক্তিশালী করা এবং মানবাধিকার সুরক্ষার জন্য রাষ্ট্র ও সমাজের সব স্তরে সমন্বিত উদ্যোগ প্রয়োজন। সাম্প্রতিক সময়ে মব সহিংসতা, রাজনৈতিক উত্তেজনা, নির্বাচনী সহিংসতা এবং মত প্রকাশের স্বাধীনতায় হস্তক্ষেপের বিষয় সমাধান না করা হলে মানবাধিকার পরিস্থিতি আরো অবনতির দিকে যেতে পারে।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজকল্যাণ ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের সহযোগী অধ্যাপক এবং সমাজ ও অপরাধ বিশেষজ্ঞ ড. তৌহিদুল হক বলেন, ‘আসলে আমরা যে ধরনের একটি নির্বাচন উপযোগী পরিবেশ এবং নাগরিক নিরাপত্তার প্রশ্নে যে ধরনের আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতি প্রত্যাশা করছি, সবাই যে পরিস্থিতি আশা করছে, সেটা তৈরি হচ্ছে না। কারণ এখানে বেশ কিছু চ্যালেঞ্জ আছে। এই চ্যালেঞ্জগুলোর কারণেই সেই ইতিবাচক বা প্রত্যাশিত পরিস্থিতি তৈরি হচ্ছে না। তো সে ক্ষেত্রে আসলে যে অভিযানগুলো পরিচালিত হচ্ছে, সেই অভিযানগুলোর টেবিল বা অভিযানের ভাষায় অনেক অপরাধী গ্রেপ্তার করা হচ্ছে বলে বলা হচ্ছে। কিন্তু তার পরও যে অপরাধগুলো সংঘটিত হচ্ছে, যে ধরনের অপরাধের ভয়াবহতা বা গুরুতর অপরাধ আমরা প্রতিনিয়ত দেখছি, সেগুলো যারা সৃষ্টি করছে বা সংঘটিত করছে, তারা বাইরে থেকে যাচ্ছে কোন বিবেচনায়, সেই প্রশ্নটা কিন্তু খুবই গুরুত্বপূর্ণ।’
সৌজন্য : কালের কণ্ঠ

