বগুড়ায় সরিষা ফুলে মধু সংগ্রহের ধুম

0
বগুড়ায় সরিষা ফুলে মধু সংগ্রহের ধুম

সরিষা ফুলে ছেয়ে গেছে বগুড়ার মাঠগুলো। শহরতলীর পাকা সড়ক অথবা গ্রামের মেঠোপথে গেলে যে দিকেই তাকাই চোখজুড়ে শুধু হলুদ আর হলুদ। এমন দৃশ্য বছরে একবারই আসে। দিগন্তজোড়া সরিষা ফুলে ঢেকে গেছে মাঠ-ঘাট, ফসলের জমি ও খোলা প্রান্তর। প্রকৃতি যেন নিজ হাতে হলুদ চাদর মেলে ধরেছে চারপাশে। সরিষা ফুলের সৌন্দর্য মুগ্ধ করছে পথচারী ও দর্শনার্থীদের। এই অপরূপ সৌন্দর্যের মাঝেই চলছে আরেক ব্যস্ত কর্মযজ্ঞ মধু সংগ্রহ। এ সময়টা মৌমাছি আর মৌয়ালদের মধু সংগ্রহের উৎসবে কেটে যায়। এবারও সরিষা মৌসুমে জেলার বিভিন্ন উপজেলায় ছুটে এসেছেন মৌ-খামারিরা। হলুদ ফুলে আকৃষ্ট হয়ে মৌমাছিদের আনাগোনা বেড়ে যাওয়ায় মধু সংগ্রহে ব্যস্ত সময় পার করছেন তারা।

বগুড়া কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর সূত্রে জানা যায়, চলতি মৌসুমে জেলায় সরিষা চাষের লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছে ৪৫ হাজার ৪৭১ হেক্টর জমিতে। আর ফলন লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছে ৭৫ হাজার ২৬ মেট্রিক টন। প্রতি হেক্টরে ফলন ধরা হয়েছে ১.৬ মেট্রিক টন করে। 

বগুড়া সদর উপজেলা, শিবগঞ্জ, কাহালু, দুপচাঁচিয়া, আদমদীঘি, সোনাতলা, গাবতলী, শেরপুর ও নন্দীগ্রামে সরিষা আবাদ বেশি হয়। আমন ধান কাটার পর উপজেলার কৃষকরা সরিষা চাষ করেছেন। চলতি বছর বারি-১৪, বারি-১৫, বারি-১৭, বিনা-৯, বিনা-৪, টরি-৭ জাতের সরিষা চাষ করেছেন তারা। চাষের জমি বৃদ্ধি পাওয়ায় মধু আহরণের লক্ষ্যমাত্রা বেড়েছে। দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে মৌয়ালরা এ জেলায় মধু সংগ্রহ করতে আসছেন। 

জানা যায়, বগুড়ার নন্দীগ্রাম, দুপচাঁচিয়া, শিবগঞ্জ, সারিয়াকান্দি, ধুনট, কাহালু, শাজাহানপুর, সোনাতলা ও আদমদীঘি উপজেলাগুলোর বিস্তীর্ণ এলাকাজুড়ে এখন হলুদের সমারোহ। সরিষা ফুলের রূপ এবং গন্ধে মাতোয়ারা চারিদিক। প্রতি বছরের মতো এবারও সরিষা ক্ষেত থেকে মধু সংগ্রহ করতে ব্যস্ত সময় পার করছেন মৌ খামারিরা। দেশের বিভিন্ন অঞ্চল থেকে ভ্রাম্যমাণ মৌ চাষিরা উপজেলার বিভিন্ন এলাকায় সরিষা ফুল থেকে মধু সংগ্রহের জন্য মৌমাছির খামার স্থাপন করেছেন। যা এই অঞ্চলের অর্থনীতিতে ইতিবাচক প্রভাব ফেলছে। 

উপজেলার বিভিন্ন মাঠে সরিষা ক্ষেতের পাশের ফাঁকা জমিতে সারি সারি করে সাজানো হয়েছে শত শত মৌমাছির বাক্স। দূর থেকেই শোনা যায় মৌমাছির ভু ভু গুঞ্জন। সরিষা ফুলে বসে মৌমাছিরা মধু আহরণ করছে। মুখভর্তি মধু নিয়ে তারা ফিরে যাচ্ছে মৌবাক্সে। সেখানে মধু জমা করে আবার ছুটে যাচ্ছে ফুলের রাজ্যে। এভাবেই দিনভর চলতে থাকে মৌমাছিদের নিরবচ্ছিন্ন পরিশ্রম। শুধু মধু সংগ্রহই নয়, ফুলে ফুলে ঘুরে বেড়ানোর মাধ্যমে মৌমাছিরা সরিষা গাছের পরাগায়নেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে। 

মৌ-খামারিরা জানান, একটি মৌবাক্সে সাধারণত ৮ থেকে ১০টি মোম দিয়ে তৈরি চাকের ফ্রেম রাখা হয়। বাক্সের ভেতরে রাখা হয় একটি রানি মৌমাছি। রানি মৌমাছির উপস্থিতির কারণেই শ্রমিক মৌমাছিরা ওই বাক্সে অবস্থান করে এবং ফুল থেকে মধু সংগ্রহ করে চাকের ভেতরে জমা করে। বাক্সের নিচের দিকে রাখা ছোট ছিদ্র দিয়ে মৌমাছিরা নিয়মিত আসা-যাওয়া করে। একটি মৌবাক্সের চাক সম্পূর্ণভাবে মধুতে ভরতে সময় লাগে প্রায় ১০ থেকে ১২ দিন। এরপর বিশেষ মেশিনের সাহায্যে চাকের ফ্রেম থেকে মধু সংগ্রহ করা হয়। এই প্রক্রিয়ায় মধুর স্বাভাবিক গুণাগুণ অক্ষুন্ন থাকে। 

বগুড়ার নন্দীগ্রাম উপজেলায় মধু সংগ্রহ করতে আসা নড়াইল জেলার চিলগাছা রঘুনাথপুর গ্রামের মৌ-খামারি মো. চাঁন মোল্লা জানান, গত কয়েকদিন হলে সরিষা ফুলের মধু সংগ্রহের জন্য এসেছি। এখানকার পরিবেশ ও ফুলের ঘনত্ব মধু সংগ্রহের জন্য খুবই উপযোগী। আশা করছি এবার ভালো পরিমাণ মধু পাব। গত ৭ বছর ধরে তিনি মধু সংগ্রহ ও বিক্রয়ের সঙ্গে যুক্ত। 

তিনি বলেন, নন্দীগ্রামে তার প্রায় ২০০টি মৌবাক্স রয়েছে। প্রতি ১০ থেকে ১৪ দিন পরপর মধু সংগ্রহ করা হয়। একেকবারে ১০ থেকে ১২ মণ পর্যন্ত মধু পাওয়া যায়। বাজারে প্রতি মণ মধু ১১ থেকে ১২ হাজার টাকা দরে বিক্রি হচ্ছে। একটি মৌসুমে প্রায় ৪ টন মধু সংগ্রহ করা সম্ভব হয়। এতে মোট খরচ পড়ে ১৩ থেকে ১৪ লাখ টাকা। সব মিলিয়ে বছরে ১৬ থেকে ১৮ লাখ টাকা পর্যন্ত আয় হয়ে থাকে।

নন্দীগ্রাম উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা গাজিউল হক জানান, মৌচাষের কারণে একদিকে যেমন সরিষার উৎপাদন বাড়ছে। অন্যদিকে এলাকাবাসীও অল্প মূল্যে খাঁটি ও ভেজালমুক্ত মধু পাচ্ছেন। এতে কৃষক, মৌ-খামারি এবং সাধারণ ভোক্তা সবাই লাভবান হচ্ছেন। সরিষা ফুলের হলুদ সৌন্দর্য, মৌমাছির কর্মব্যস্ততা আর খাঁটি মধুর সুবাস সব মিলিয়ে নন্দীগ্রামের মাঠ এখন শুধু ফসলের নয়, সম্ভাবনার এক উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত হয়ে উঠেছে।

বগুড়া কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপসহকারী কৃষি কর্মকর্তা ফরিদুর রহমান ফরিদ জানান, চলতি মৌসুমে জেলায় সরিষা চাষের লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছে ৪৫ হাজার ৪৭১ হেক্টর জমিতে। আর ফলন লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছে ৭৫ হাজার ২৬ মেট্রিক টন। প্রতি হেক্টরে ফলন ধরা হয়েছে ১.৬ মেট্রিক টন করে। 

তিনি বলেন, যেসব সরিষা ক্ষেতে মৌমাছির মাধ্যমে মধু সংগ্রহ করা হচ্ছে সেসব জমিতে অন্যান্য জমির তুলনায় ১৫ থেকে ২০ শতাংশ বেশি ফলন পাওয়া যাবে। কারণ মৌমাছি সরিষা ফুলের পরাগায়নে অত্যন্ত কার্যকর ভূমিকা পালন করে।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here