বগুড়ায় শুষ্ক মৌসুমে যমুনা নদীতে তীব্র নাব্যতা সংকট দেখা দিয়েছে। পানি কমে যাওয়ায় জেলার সারিয়াকান্দি, সোনাতলা ও ধুনট উপজেলার গুরুত্বপূর্ণ নৌরুটগুলো বন্ধ হয়ে গেছে। এতে নদী পারাপার ও কৃষকদের উৎপাদিত কৃষিপণ্য পরিবহনে চরম দুর্ভোগ পোহাতে হচ্ছে।
নদীর কোথাও হাঁটুসমান পানি, আবার কোথাও পায়ের গোড়ালি পর্যন্ত পানি রয়েছে। গত কয়েক মাস ধরে যমুনা নদীর পানি একেবারে তলানিতে নেমে গেছে। ফলে এই তিন উপজেলায় যমুনার প্রকট নাব্যতা সংকট বিরাজ করছে।
নাব্যতা সংকটের কারণে যমুনা নদীতে একাধিক ডুবোচরের সৃষ্টি হয়েছে। এসব ডুবোচরে প্রায়ই মাঝিদের নৌকা আটকে যাচ্ছে। ফলে মাঝিদের পানিতে নেমে নৌকা ঠেলে সরিয়ে নিতে হচ্ছে। এতে নৌকা পারাপারে ভোগান্তির শেষ নেই। এছাড়া চরাঞ্চলের মানুষ মাথায় মালামাল নিয়ে পায়ে হেঁটে গন্তব্যে যাচ্ছেন। কেউ কেউ ঘোড়ার গাড়িতে করে প্রয়োজনীয় মালামাল পারাপার করছেন, এতে তাদের বাড়তি খরচ গুনতে হচ্ছে।
এদিকে সিরাজগঞ্জ পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী মো. জুবায়ের ইমতিয়াজ জানান, যমুনা নদীর নাব্যতা ফিরিয়ে আনতে পানি উন্নয়ন বোর্ড কাজ করছে। বগুড়ার সারিয়াকান্দি উপজেলার কামালপুর ইউনিয়নের একটি পয়েন্টে চর কাটার একটি প্রকল্প প্রস্তাব জমা দেওয়া হয়েছে। প্রায় দুই কোটি টাকা ব্যয়ের এই প্রকল্পটি ডিজাইন অনুমোদন হলে বাস্তবায়ন শুরু হবে।
স্থানীয় প্রশাসন জানিয়েছে, সারিয়াকান্দিতে নৌবন্দর স্থাপনের কাজ চলমান রয়েছে। নৌবন্দর স্থাপন হলে সারাবছর নৌপথ ড্রেজিংয়ের আওতায় থাকবে। কৃত্রিম নৌপথ সৃষ্টি হলে এ সমস্যার স্থায়ী সমাধান সম্ভব হবে।
অন্যদিকে নীলফামারী জেলার তিস্তা নদী থেকে বাঙালি নদীর উৎপত্তি। বাঙালি নদী গাইবান্ধার গোবিন্দগঞ্জ উপজেলার কাটাখালি হয়ে বগুড়ায় প্রবেশ করেছে। নদীটি বগুড়ার সোনাতলা, ধুনট ও সারিয়াকান্দি উপজেলা দিয়ে প্রবাহিত হয়ে সিরাজগঞ্জের বাঘাবাড়ি ঘাটে হুড়াসাগর নদীর সঙ্গে মিলিত হয়েছে। প্রায় ১৮৩ কিলোমিটার দীর্ঘ বাঙালি নদীর অনেক স্থানে বর্তমানে পানি নেই।
উজানে অপরিকল্পিত বাঁধ নির্মাণ ও বর্ষাকালে নদীভাঙনের ফলে তলদেশে পলি জমে বাঙালি নদীর নাব্যতা ক্রমশ হ্রাস পাচ্ছে। তিনটি উপজেলা শহরের কয়েকটি স্থানে পয়ঃনিষ্কাশনের ব্যবস্থাও নদীতে যুক্ত হওয়ায় পানি দূষিত হয়ে কালচে রং ধারণ করেছে।
জানা যায়, ১৯৫৮ সাল থেকে যমুনা নদীর ডান তীরে ভাঙন শুরু হয়। ১৯৭৭ সালের পর এই ভাঙন ভয়াবহ রূপ নেয়। এতে বিভিন্ন সময়ে ডান তীরের ১০৫টির বেশি গ্রাম নদীভাঙনে সম্পূর্ণভাবে যমুনাগর্ভে বিলীন হয়ে যায়। ১৯৮৫ থেকে ২০১০ সাল পর্যন্ত ২৫ বছরে প্রাকৃতিক দুর্যোগের কারণে সারিয়াকান্দি এলাকায় যমুনা নদীর ডান তীরে প্রায় ৫৬০ মিটার ভাঙন ঘটে।
২০১০ সালের পর থেকে সরকারিভাবে নদীশাসনের কাজ হওয়ায় এ এলাকায় বড় ধরনের ভাঙন আর দেখা যায়নি। তবে সারিয়াকান্দি উপজেলার মধ্য দিয়ে প্রবাহিত যমুনা নদী ধীরে ধীরে তার গতিপথ পরিবর্তন করছে। বর্ষাকালে নদী পূর্ণ থাকায় গতিপথ স্পষ্ট বোঝা না গেলেও শুষ্ক মৌসুমে মূল প্রবাহ সারিয়াকান্দির কালিতলা গ্রোয়েন বাঁধ থেকে প্রায় দুই কিলোমিটার পূর্বদিকে সরে গেছে। ফলে নতুন নতুন চর জেগে উঠছে।
উপজেলার সবচেয়ে ব্যস্ত নৌরুট সারিয়াকান্দি-মাদারগঞ্জ পথে কালিতলা গ্রোয়েন বাঁধ থেকে প্রায় এক কিলোমিটার এলাকাজুড়ে বিশাল চর সৃষ্টি হয়েছে। মাঝিদের অর্থায়নে এই চর কেটে ড্রেনের মতো একটি খাল তৈরি করা হয়েছে। সেই সংকীর্ণ পথ দিয়ে কষ্ট করে প্রতিদিন শতাধিক নৌকা চলাচল করছে।
নাব্যতা সংকটের কারণে পারতিতপরল গ্রামের আলতাফ আলী খেয়াঘাট, হাসনাপাড়া, নিজবলাই, দিঘাপাড়া ও চারালকান্দিসহ একাধিক খেয়াঘাট বন্ধ হয়ে গেছে। নদীর বিস্তীর্ণ এলাকাজুড়ে ধূধূ বালুচরের সৃষ্টি হওয়ায় কৃষকেরা এসব চর ডিঙিয়ে অত্যন্ত কষ্টে তাদের উৎপাদিত কৃষিপণ্য পরিবহন করছেন।
সরেজমিনে পারতিতপরল এলাকায় গিয়ে দেখা যায়, কেউ ঘোড়ার গাড়িতে বেশি ভাড়া দিয়ে, আবার কেউ পায়ে হেঁটে মাথায় করে কৃষিপণ্য বহন করছেন। উপজেলার মোট উৎপাদিত কৃষি ফসলের অর্ধেকের বেশি যমুনার চরাঞ্চলে উৎপাদিত হয়। নাব্যতা সংকটের কারণে এসব ফসল পরিবহনে কৃষকদের অতিরিক্ত খরচ বেড়েছে, ফলে উৎপাদন ব্যয়ও বৃদ্ধি পাচ্ছে।
সারিয়াকান্দির আলতাফ আলী খেয়াঘাটের মাঝি রমজান আলী বলেন, যমুনা নদীর নাব্যতা সংকটের কারণে গত কয়েক মাস ধরে তার খেয়াঘাট বন্ধ রয়েছে। নৌকা চলাচল বন্ধ থাকায় তিনি উপার্জনহীন হয়ে পড়েছেন। কৃষকেরা এখন নৌকার পরিবর্তে ঘোড়ার গাড়ি বা পায়ে হেঁটে কৃষিপণ্য ও পশুখাদ্য পরিবহন করছেন।
বগুড়া পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী মাহমুদ হাসান জানান, শুষ্ক মৌসুমে যমুনা নদীর নাব্যতা ফিরিয়ে আনতে একটি প্রস্তাবনা মন্ত্রণালয়ে পাঠানো হয়েছে। প্রস্তাব অনুমোদন পেলে সারিয়াকান্দি, সোনাতলা ও ধুনট উপজেলায় যমুনা নদীতে ড্রেজিং কার্যক্রম শুরু করা যাবে।

