ফোকলা অর্থনীতি সচল করার পরীক্ষা

0
ফোকলা অর্থনীতি সচল করার পরীক্ষা

টানা প্রায় ১৭ বছর পর দেশে সুষ্ঠু গণতান্ত্রিক চর্চার সুযোগ তৈরি হয়েছে ১২ ফেব্রুয়ারি অনুষ্ঠিত ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের মধ্য দিয়ে। দায়িত্ব গ্রহণের অপেক্ষায় নতুন সরকার। ঠিক এই মুহূর্তে দেশের সামষ্টিক অর্থনীতি চরম ভঙ্গুর অবস্থায় রয়েছে। ব্যাংক খাতের অচলাবস্থা কাটাতে প্রয়োজন কার্যকর উদ্যোগ। চরম মন্দা অবস্থা চলছে ব্যবসা-বাণিজ্যে। উচ্চ মূল্যস্ফীতির চাপ, রাজস্ব ঘাটতি, বাজেট ঘাটতি, বিনিয়োগ ও কর্মসংস্থানের খরা কঠিন বাস্তবতার মুখে দাঁড় করিয়েছে নতুন সরকারকে।

নির্বাচিত নতুন সরকার ও অপেক্ষমাণ তরুণ প্রধানমন্ত্রী হিসেবে তারেক রহমানের কাছে মানুষের প্রত্যাশাও আকাশসম। নির্বাচনি ইশতেহারে তারেক রহমান আইনের শাসন নিশ্চিত করা, আর্থিক শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনা এবং দেশকে ঐক্যবদ্ধ করার প্রত্যয় ব্যক্ত করেছেন। তাঁর মতে, দেশকে ঐক্যবদ্ধ করতে না পারলে কোনো নীতিই কার্যকর করা সম্ভব হবে না। কয়েক দিন পরই শুরু হবে পবিত্র রমজান মাস। রোজায় মানুষের জীবনযাপন সহজ করতে পণ্যমূল্য সহনীয়  রাখার বিকল্প নেই বলে মনে করেন সাবেক তত্ত্বাবধায়ক সরকারের উপদেষ্টা ড. হোসেন জিল্লুর রহমান। তিনি বলেন, এই মুহূর্তে অর্থনীতি সংস্কার কার্যক্রমগুলো সম্পন্ন করা এবং মূল্যস্ফীতির চাপ কমিয়ে আনাকেই সর্বাধিক গুরুত্ব দেওয়া উচিত বলে তিনি মনে করেন।

ভঙ্গুর অর্থনীতি পুনরুদ্ধারে চ্যালেঞ্জগুলো নিয়ে পরিকল্পনার কথা জানিয়েছেন বিএনপি চেয়ারম্যান তারেক রহমান ও মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর। এর মধ্যে রয়েছে আইনশৃঙ্খলা ও সামাজিক স্থিতিশীলতা নিশ্চিত করা, সুশাসন প্রতিষ্ঠা, আন্তর্জাতিক সম্পর্ক পুনর্গঠন এবং প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কার- সব ক্ষেত্রেই দ্রুত, বিচক্ষণ ও দূরদর্শী সিদ্ধান্ত গ্রহণ অনিবার্য হয়ে উঠবে নতুন সরকারের সামনে। কয়েক মাস পরই দেশ স্বল্পোন্নত দেশের তালিকা থেকে বেরিয়ে যাওয়ার কথা। যদিও অন্তর্বর্তী সরকারের সময় ব্যবসায়ীরা সময়সীমা পিছিয়ে দেওয়ার দাবি জানিয়েছেন; তা খুব একটা আমলে নেয়নি জাতিসংঘ।

চলতি বছরের নভেম্বরে স্বল্পোন্নত দেশের তালিকা থেকে বেরিয়ে গেলে শুরু হবে নতুন অর্থনৈতিক বাস্তবতা। বৈশ্বিক বাণিজ্যের ক্ষেত্রে কঠিন চ্যালেঞ্জের মুখে পড়বে বাংলাদেশ। গভীর সংকটে পড়া দেশের অর্থনীতিকে মোটামুটি স্থিতিশীলতায় আনতে সক্ষম হয়েছে অন্তর্বর্তী সরকার। পতনের ধারা ঠেকিয়ে বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ সহনীয় পর্যায়ে এসেছে। অভ্যন্তরীণ খাতের চাহিদা স্বাভাবিক রাখতে সক্ষম হয়েছে। তবে কাটাতে পারেনি বিনিয়োগ স্থবিরতা। সৃষ্টি হয়নি নতুন কর্মসংস্থান। রপ্তানিমুখী উৎপাদন খাতেও বড় ধাক্কা লাগে জুলাই আন্দোলনে। সেই ধাক্কায় রপ্তানি আয় এখনো নেতিবাচক প্রবণতায় রয়েছে। গতি নেই বাজেট বাস্তবায়নে। রাজস্ব আহরণে তৈরি হয়েছে ৪৬ হাজার কোটি টাকার ঘাটতি। বছর শেষে বাজেট ঘাটতি কতটা কমিয়ে আনা যায় সেদিকে নজর রাখতে হবে

নতুন সরকারকে। বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালের নভেম্বরে বেসরকারি খাতে ঋণ প্রবৃদ্ধি ছিল ৬ দশমিক ৫৮ শতাংশ, যা কমে ডিসেম্বরে ৬ দশমিক ১০ শতাংশে নেমে আসে। এটি গত চার বছরে সর্বনিম্ন। ২০২৫ সালের জানুয়ারি-সেপ্টেম্বর পর্যন্ত প্রত্যক্ষ নিট বিদেশি বিনিয়োগ ১ দশমিক ৪১ বিলিয়ন ডলারে দাঁড়িয়েছে। এটি প্রত্যাশার চেয়ে কম। দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক অনিশ্চয়তা বিনিয়োগকারীদের আস্থা ক্ষয় করেছে। এটি দ্রুত ও দৃঢ় পদক্ষেপের মাধ্যমে পুনঃপ্রতিষ্ঠা করা প্রয়োজন। সামষ্টিক অর্থনীতির জন্য সবচেয়ে অস্বস্তিকর নিয়ামক হলো উচ্চ মূল্যস্ফীতি। যা মূলত কয়েক বছর ধরেই চলছে। অন্তর্বর্তী সরকারও মূল্যস্ফীতির চাপ সহনীয় পর্যায়ে আনতে পারেনি।

বিবিএস-এর সবশেষ প্রতিবেদন অনুযায়ী এই চাপ এখন দুই অঙ্কের কাছাকাছি। কয়েক বছরে মানুষের প্রকৃত আয় বাড়েনি। অনেকের কমেছে। জুলাই আন্দোলনের পর বেকার হয়েছে বিপুলসংখ্যক মানুষ। বিশ্বব্যাংকের ঢাকা অফিসের সাবেক প্রধান অর্থনীতিবিদ ড. জাহিদ হোসেন বলেন, মানুষ খুবই কষ্টে আছে। আর্থিক সচ্ছলতা ও জননিরাপত্তা নিশ্চিত করে স্বস্তি ফিরিয়ে আনাই হোক নতুন সরকারের জন্য অগ্রাধিকারের চ্যালেঞ্জ। ব্যাংক খাত গত ১৭ বছরে ধ্বংসের দ্বারপ্রান্তে চলে গেছে। বিতরণ করা ঋণের বেশির ভাগই খেলাপি হয়েছে। পাঁচটি ব্যাংককে একীভূত করা হয়েছে। অর্থনৈতিক খাত সংকটের মধ্যে থাকলেও গণ অভ্যুত্থানের পর কিছুটা সংস্কার আনা হয়েছে। নতুন করে অর্থ পাচার রোধ করতে সক্ষম হয়েছে।

ব্যাংক খাত সুসংহত করতে নতুন সরকারকে পাড়ি দিতে হবে বন্ধুর পথ। দেশে বর্তমানে দারিদ্র্যের হার বেড়ে ২৭ দশমিক ৯৩ শতাংশে দাঁড়িয়েছে। ২০২২ সালে ছিল ১৮ দশমিক ৭ শতাংশ। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) তথ্য অনুযায়ী, চরম দারিদ্র্যের হার বেড়ে ৯ দশমিক ৩৫ শতাংশে উন্নীত হয়েছে। আগে ছিল ৫ দশমিক ৬ শতাংশ। এ অবস্থার উত্তরণে কর্মসংস্থান বৃদ্ধির কোনো বিকল্প নাই। কর্মসংস্থান মানেই বিনিয়োগ বাড়াতে হবে। একই সঙ্গে ব্যবসা-বাণিজ্য খাতকে সর্বাধিক গুরুত্ব দিয়ে এগোতে হবে নতুন সরকারকে।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here