বাতাসে স্থির থেকে ডানা ঝাপটায়। দিনভর ঘুরে বেড়ায় এক ফুল থেকে আরেক ফুলে। লাল-সিঁদুরে রঙের ঝলমলে ছোট্ট এই পাখিটি সিঁদুরে মৌটুসি। এরা প্রজাপতি, ভ্রমর ও মৌমাছিদের মতো ফুল থেকে ফুলে মধু পান করে। তবে এদের দেখা পাওয়া অতোটা সহজ নয়।
প্রকৃতিবিদদের তথ্য অনুযায়ী, সিঁদুরে মৌটুসি আন্তর্জাতিক প্রকৃতি ও প্রাকৃতিক সম্পদ সংরক্ষণ সংঘ ইন্টারন্যাশনাল ইউনিয়ন ফর কনজারভেশন অব ন্যাচার (আইইউসিএন) বা ন্যূনতম বিপদগ্রস্ত হিসেবে তালিকাভুক্ত। তবে বাংলাদেশে এটি সংরক্ষিত বন্যপ্রাণীর তালিকায় নেই। মাঠ পর্যায়ের পর্যবেক্ষকরা বলছেন, আবাসস্থল কমে যাওয়ায় এদের দেখা এখন আগের তুলনায় কঠিন হয়ে পড়েছে।
সম্প্রতি বন্যপ্রাণী আলোকচিত্রী ও লেখক রানা মাসুদ হবিগঞ্জের সাতছড়ি এলাকা থেকে সিঁদুরে মৌটুসির একটি ছবি তুলেছেন। ছবিটি নিয়ে অনুভূতি জানাতে গিয়ে তিনি বলেন, ‘হবিগঞ্জের সাতছড়িতে এই ছবি তুলেছি। এর সৌন্দর্যের কাছে ক্যাপশন হারিয়ে গেছে। শুধুই মুগ্ধ হয়ে চেয়ে থাকা ছাড়া আর কিছু মনে হয়নি।’
পাখিটি সম্পর্কে জানা গেছে, অত্যন্ত চঞ্চল পাখি এরা, বেশিক্ষণ এক জায়গায় থাকে না। বাতাসে ঢেউ খেলিয়ে আলোর ঝিলিকের মতো এগাছ থেকে ওগাছে উড়ে বেড়ায়। পুরুষ পাখি বেশ আমুদে। ফুলের নির্যাস বা মধু পানের জন্য মৌটুসিদের রয়েছে লম্বা ও নিচের দিকে বাঁকানো ঠোঁট বা চঞ্চু। যা ফুলের ভেতরে ঢুকিয়ে খাঁজকাটা ও রবারের ডগারের মতো জিহ্বাটি দিয়ে মধু পান করে। নির্যাসের অভাবে ছোট ছোট পোকামাকড়ও খেতে পারে। অনেক সময় ফুলের ডাঁটার সঙ্গে ঝুলে বাদুড়ের মতো ভঙ্গিতে রস পান করতে দেখা যায়।
সিঁদুরে মৌটুসি সিঁদুরে-লাল মৌটুসি নামেও পরিচিত। ছোট্ট সুদর্শন পাখিটি এদেশের অন্যতম সুন্দর ও দুর্লভ আবাসিক পাখি। এটি চিরসবুজ ও পাতাঝরা বন, ক্ষুদ্র ঝোপ ও বাঁদাবনে বিচরণ করে। অনেক সময় গ্রাম ও শহরতলীর সুমিষ্ট মধুসম্পন্ন ফুল বাগানেও ঘুর ঘুর করতে দেখা যায়।
সিঁদুরে মৌটুসি পুরুষ লম্বায় প্রায় ১৫ সেন্টিমিটার ও মেয়ে ১০ সেন্টিমিটার। ওজনে ৮ থেকে ১১ গ্রাম হয়ে থাকে। নিচের দিকে বাঁকানো চঞ্চুটি মাঝারি আকারের। পুরুষ ও মেয়ে পাখির দেহের রঙে পার্থক্য রয়েছে। পুরুষের দেহের ওপরটা গাঢ় মেরুন। মাথা নীলাভ-সবুজ, নির্দিষ্ট কোণ থেকে যা চকচকে দেখায়। ঘাড় গাঢ় সবুজ ও পেছন দিকটা বেগুনি। কালচে গলায় বেগুনি আভা ও বুকে মেরুন ডোরা। দেহের নিচটা সাদাটে।
অন্যদিকে, মেয়ের দেহের ওপরটা জলপাই বা বাদামি। গলা সাদা ও বুক হলদে। লেজের ওপরের পালক-ঢাকনি কালো। চোখের ওপরে একটি হালকা দাগ থাকতে পারে। টোনা-টুনি নির্বিশেষে চোখের মনি লালচে। চঞ্চু, পা ও আঙুল কালচে।
প্রজাতিভেদে মৌটুসিরা ফেব্রুয়ারি থেকে জুলাইয়ের মধ্যে প্রজনন করে। তবে কোনো কোনো প্রজাতি বছরের যেকোনো সময় ডিম-ছানা তুলতে পারে। মৌটুসিরা সাধারণত গেরস্থ বাড়ির আঙিনায় বরই-ডালিম গাছে বাসা বাধে।

