ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের বাকি আর মাত্র ৩১ দিন। সবকিছু ঠিক থাকলে এর পরই শুরু হবে সংসদ অধিবেশন। কিন্তু এখনো পুরোপুরি প্রস্তুত নয় জাতীয় সংসদ সচিবালয়। চলছে সংস্কার কাজ। সংশ্লিষ্টরা মিটিংয়ের পর মিটিং করছেন। বাজেট নিয়ে রয়েছে অপ্রতুলতা। অন্যদিকে সংস্কারের বড় একটি অংশের কাজ করছে গণপূর্ত বিভাগ। কাজের অগ্রগতি নিয়ে গণপূর্ত ও সংসদ সচিবালয়ের মধ্যে চলছে টানাপোড়েন। ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানে ভবনের অভ্যন্তরে চালানো ব্যাপক ভাঙচুর ও ক্ষয়ক্ষতির চিহ্ন এখনো দৃশ্যমান।
৩০০ কোটি টাকার বেশি ক্ষতি হওয়া সংসদ ভবন প্রস্তুতের জন্য সরকার থেকে সময় নির্ধারণ করে দেওয়া হয় গত বছরের ডিসেম্বর পর্যন্ত। কিন্তু সংশ্লিষ্টরা সে সময়ের মধ্যে কাজ শেষ করতে পারেননি। মঙ্গলবার সংসদ ভবন সংস্কার কাজের অগ্রগতি নিয়ে বৈঠক ডাকা হয়েছে। সেখানে কাজের অগ্রগতির পাশাপাশি কত দিনের মধ্যে শেষ করা সম্ভব তা নিয়ে আলোচনা হবে। এদিকে জাতীয় ঐকমত্য কমিশনে রাজনৈতিক দলগুলো উচ্চকক্ষের পক্ষে মতামত দিয়েছে। এ নিয়ে সংসদ নির্বাচনের দিন অনুষ্ঠিত হবে গণভোট।
তবে সংসদ সচিবালয়ের কর্মকর্তারা জানান, সংসদ ভবনের কোন জায়গায় উচ্চকক্ষ গঠন করা হবে, তা নিয়ে এখন পর্যন্ত কোনো ধরনের নির্দেশনা নেই। এ বিষয়ে প্রাথমিক প্রস্তুতি নিয়ে থাকার কথাও বলা হয়নি। তাই বিষয়টি নিয়ে সংসদ সচিবালয়ের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা অন্ধকারে রয়েছেন বলে জানান।
সংসদ সচিবালয়ের ঊর্ধ্বতন কয়েকজন কর্মকর্তা বাংলাদেশ প্রতিদিনকে জানান, নির্ধারিত সময়ের মধ্যে সংস্কার কাজ শেষ করতে না পারলেও আগামী অধিবেশনের আগেই হয়তো কাজ শেষ করা সম্ভব। আপ্রাণ চেষ্টা চলছে।
অন্যদিকে সংসদ সচিবালয়ের মধ্যম পর্যায়ের কয়েকজন কর্মকর্তা বাংলাদেশ প্রতিদিনকে বলেন, পুরো কাজ শেষ করতে আরও অন্তত ছয় মাস লাগবে। কারিগরি অনেক বিষয় আছে যেগুলো এখনো প্রস্তুত নয়। এমনকি সেসবের কাজও ধরা সম্ভব হয়নি। বাজেট নিয়ে নানান ধরনের প্রতিবন্ধকতা রয়েছে। পাশাপাশি গণপূর্তের অধীনে থাকা কাজগুলো নতুন ঠিকাদার সিন্ডিকেট করছে। তারা বেশির ভাগই রাজনৈতিক পরিচয়ের রেফারেন্স দিয়ে কাজ করছে। এতে সংস্কার কাজের মান নিয়েও যে-কেউ প্রশ্ন তুলতে পারে বলে তাঁরা মন্তব্য করেন।
সংসদ সচিবালয় সূত্রে জানা গেছে, সংস্কারের কাজ দ্রুতগতিতে চললেও অধিবেশন কক্ষ, স্পিকার ও ডেপুটি স্পিকারের কার্যালয়সহ গুরুত্বপূর্ণ স্থানগুলোতে নতুন আসবাব স্থাপন ও প্রযুক্তিগত আধুনিকায়নের কাজ এখনো বাকি। ছাত্র-জনতার প্রবেশের সময় সংসদের চেয়ার, কার্পেট, গ্লাসসহ বিভিন্ন মূল্যবান আসবাব ক্ষতিগ্রস্ত হয়। লুই আই কানের মূল নকশা অক্ষুণ্ন রেখে এসব মেরামত করতে আরও সময়ের প্রয়োজন।
প্রধান উপদেষ্টা অধ্যাপক ড. মুহাম্মদ ইউনূস-ঘোষিত নির্বাচনি রোডম্যাপ অনুযায়ী, ফেব্রুয়ারির মাঝামাঝি নতুন সংসদের কার্যক্রম শুরু হওয়ার কথা। ফলে তার আগেই সংস্কার কাজ শেষ করতে জোর তৎপরতা চলছে। সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা আশা করছেন, নির্বাচনের আগেই অর্থাৎ জানুয়ারির শেষ নাগাদ অধিবেশন কক্ষসহ প্রধান ব্লকগুলোর কাজ সম্পন্ন হবে। তবে পুরোপুরি আধুনিক ও ‘স্মার্ট পার্লামেন্ট’ হিসেবে গড়ে তুলতে আরও কয়েক মাস লাগতে পারে।
এসব প্রসঙ্গে সংসদ সচিবালয়ের সচিব কানিজ মওলা বাংলাদেশ প্রতিদিনকে বলেন, ‘সংসদের একটি বড় অংশের কাজ করছে গণপূর্ত বিভাগ। তারা ভালো বলতে পারবে। আমি এটুকু বলতে পারি, সংস্কারের কাজ এগিয়ে চলছে।’
শেখ হাসিনার সরকারের পতনের পর ভাঙচুর ও লুটপাটে লন্ডভন্ড হয়ে যাওয়া জাতীয় সংসদ ভবন পুনরায় ব্যবহারোপযোগী করতে আনুমানিক ব্যয় ধরা হয়েছে ৩০০ কোটি টাকা। আর্থিক ক্ষয়ক্ষতি নিরূপণ করে প্রয়োজনীয় বরাদ্দ চেয়ে মন্ত্রণালয়ে চিঠি পাঠানো হয়। পুরো সংসদ ভবন মেরামতের বড় কাজ রয়েছে গণপূর্ত বিভাগের হাতে। এর পরের কাজ সংসদ সচিবালয়ের আইটি খাতের এবং বাকিটা সংসদ সচিবালয়ের সংশ্লিষ্ট দপ্তরগুলো করবে। ৫ আগস্টের ঘটনার পর সংসদ ভবনের সার্বিক পরিস্থিতি নিয়ে ওই বছরের ৪ সেপ্টেম্বর একটি সভা হয়।
সভায় সংসদ ভবনে ভাঙচুর ও লুটপাটের ঘটনায় ক্ষয়ক্ষতি নিরূপণ করা হয়। সভায় জানানো হয়, ঘটনার দিন তছনছ করা হয় সংসদ ভবনের স্পিকার, ডেপুটি স্পিকার, হুইপ, সংসদীয় কমিটির দপ্তর, আইটি সেন্টার ও ভিআইপি কক্ষগুলো। ধ্বংস হয়ে যায় এসি, কম্পিউটার, ই-ভোটিং প্রযুক্তি, সম্প্রচারব্যবস্থা ও টেলিকম সংযোগ। সংসদের অধীন এমপি হোস্টেল এবং কর্মকর্তা-কর্মচারীর আবাসিক ভবনেও বিক্ষুব্ধ জনতা ভাঙচুর চালায়। লুট হয়েছে আসবাব, ইলেকট্রনিক যন্ত্রপাতি এবং গুরুত্বপূর্ণ ফাইল।
এ ছাড়া সরকারি, ব্যক্তিগত তহবিলসহ প্রায় ৯০ লাখ টাকা লুট হয়। এর মধ্যে লুট হওয়া কিছু জিনিসপত্র উদ্ধার করা গেলেও সেগুলোর বেশির ভাগই ছিল ব্যবহারের অযোগ্য। ফলে নতুন করে কেনাকাটা এবং ভবনের সংস্কার কাজ শুরুর জন্য অপেক্ষা করতে হয় সংসদ সচিবালয়কে।

