বিশ্বজুড়ে বাড়তে থাকা তাপপ্রবাহ, বন্যা, খরা ও ঝড়ের মতো চরম আবহাওয়া এখন আর বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়। বিজ্ঞানীরা বলছেন, বর্তমান প্রজন্মের প্রতিটি মানুষ এমন এক পৃথিবীতে বড় হচ্ছে, যেখানে জলবায়ু ক্রমেই অস্থির ও বিপজ্জনক হয়ে উঠছে। পরিস্থিতি মোকাবিলায় সময় দ্রুত ফুরিয়ে আসছে। ভয়াবহ পরিস্থিতি এড়ানোর একমাত্র উপায় অবিলম্বে জীবাশ্ম জ্বালানি বর্জন করা।
সোমবার প্রকাশিত বিশ্ব আবহাওয়া সংস্থা (ডব্লিউএমও)-এর ‘স্টেট অব দ্য গ্লোবাল ক্লাইমেট ২০২৫’ প্রতিবেদনে এমন তথ্য উঠে এসেছে।
প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, পৃথিবীর জলবায়ু পর্যবেক্ষণের ইতিহাসে এখন সবচেয়ে বেশি ভারসাম্যহীন অবস্থায় রয়েছে। এই পরিবর্তনের প্রভাব শুধু বর্তমানেই সীমাবদ্ধ থাকবে না, বরং শতাব্দী থেকে সহস্রাব্দ পর্যন্ত এর প্রভাব পড়বে।
প্রতিবেদনে উঠে এসেছে, ২০১৫ থেকে ২০২৫ সাল পর্যন্ত সময়কাল ছিল রেকর্ডের মধ্যে সবচেয়ে উষ্ণতম দশক। টানা নবম বছর সমুদ্রের তাপমাত্রা নতুন উচ্চতায় পৌঁছেছে। একইসঙ্গে দ্রুত হারে গলছে হিমবাহ এবং পিছু হটছে সামুদ্রিক বরফ। বিজ্ঞানীরা এটিকে জলবায়ু ব্যবস্থার গভীর সংকটের ইঙ্গিত হিসেবে দেখছেন।
পৃথিবীর শক্তির ভারসাম্যও এখন চরম অবস্থায়। অর্থাৎ সূর্য থেকে যত শক্তি পৃথিবীতে প্রবেশ করছে, তার চেয়ে কম শক্তি বাইরে বের হচ্ছে। এর ফলে গ্রহটি ক্রমাগত উত্তপ্ত হয়ে উঠছে। বিগত দুই দশকের তুলনায় ২০১২ সাল থেকে বৈশ্বিক গড় সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা দ্রুত হারে বাড়ছে।
জাতিসংঘ মহাসচিব আন্তোনিও গুতেরেস সতর্ক করে বলেছেন, জলবায়ুর প্রতিটি প্রধান সূচকই এখন বিপদের সংকেত দিচ্ছে। মানবজাতি ইতিহাসের সবচেয়ে উষ্ণতম ১১টি বছর পার করেছে, যা কোনো কাকতালীয় ঘটনা নয়। এটি দ্রুত পদক্ষেপ নেওয়ার স্পষ্ট আহ্বান।
ডব্লিউএমওর তথ্য অনুযায়ী, গত বছর বৈশ্বিক গড় তাপমাত্রা প্রাক-শিল্প যুগের তুলনায় প্রায় ১.৪৩ ডিগ্রি সেলসিয়াস বেশি ছিল। এটি ইতিহাসের দ্বিতীয় বা তৃতীয় উষ্ণতম বছর হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। যদিও লা নিনা-এর সাময়িক শীতল প্রভাবের কারণে তাপমাত্রা কিছুটা কম ছিল, তবুও প্রবণতা ঊর্ধ্বমুখীই রয়েছে।
২০১৫ সালের প্যারিস চুক্তি অনুযায়ী, বৈশ্বিক উষ্ণতা ২ ডিগ্রি সেলসিয়াসের নিচে এবং সম্ভব হলে ১.৫ ডিগ্রি সেলসিয়াসে সীমাবদ্ধ রাখার লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছিল। কিন্তু বর্তমান প্রবণতা সেই লক্ষ্যকে ক্রমেই অনিশ্চিত করে তুলছে।
এই তাপমাত্রা বৃদ্ধির মূল কারণ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে গ্রিনহাউস গ্যাসের বাড়তি উপস্থিতি। তেল, কয়লা ও গ্যাস পোড়ানোর ফলে বায়ুমণ্ডলে কার্বন ডাই-অক্সাইডের মাত্রা ২০২৪ সালে অন্তত ২০ লাখ বছরের মধ্যে সর্বোচ্চ পর্যায়ে পৌঁছায় এবং ২০২৫ সালেও তা বাড়তে থাকে।
বিজ্ঞানীরা সতর্ক করছেন, চলতি বছরের শেষ দিকে এল নিনো ফিরে আসতে পারে, যা তাপমাত্রা আরও বাড়িয়ে দিতে পারে এবং চরম আবহাওয়ার ঘটনা বাড়িয়ে তুলতে পারে। ইতোমধ্যেই এর ভয়াবহ প্রভাব স্পষ্ট।
২০২৫ সালে তাপপ্রবাহ, দাবানল, বন্যা, খরা ও ঘূর্ণিঝড়ে হাজার হাজার মানুষের মৃত্যু হয়েছে। বিলিয়ন ডলারের অর্থনৈতিক ক্ষতি হয়েছে। শুধু ক্যালিফোর্নিয়ার দাবানলেই জানুয়ারিতে ৬০ বিলিয়ন ডলারের বেশি ক্ষতি হয়েছে। যা ইতিহাসের সবচেয়ে ক্ষতি করা দুর্যোগগুলোর একটি।
জলবায়ু পরিবর্তনের স্বাস্থ্যগত প্রভাবও বাড়ছে। ডেঙ্গু এখন বিশ্বের দ্রুততম বিস্তারিত মশাবাহিত রোগে পরিণত হয়েছে। প্রতিবছর বিশ্বের প্রায় ১.২ বিলিয়ন শ্রমিক বিপজ্জনক তাপপ্রবাহের মুখোমুখি হয়েছেন। যা তাদের কর্মক্ষমতা ও জীবনের ঝুঁকি বাড়াচ্ছে।
খাদ্য সংকট, পানির অভাব এবং বাধ্যতামূলক অভিবাসনও বাড়ছে। গত এক দশকে আবহাওয়াজনিত দুর্যোগে প্রায় ২৫ কোটি মানুষ বাস্তুচ্যুত হয়েছে। জাতিসংঘ বলছে, জলবায়ু সংকট এখন বৈশ্বিক অস্থিতিশীলতার সঙ্গে সরাসরি সম্পর্কিত।
এক বিবৃতিতে আন্তোনিও গুতেরেস বলেন, জীবাশ্ম জ্বালানির ওপর নির্ভরতা শুধু জলবায়ুই নয়, বৈশ্বিক নিরাপত্তাকেও ঝুঁকির মুখে ফেলছে। তিনি দ্রুত কার্বন নিঃসরণ কমানো এবং নবায়নযোগ্য জ্বালানিতে রূপান্তরের আহ্বান জানান। তার মতে, নবায়নযোগ্য জ্বালানি শুধু জলবায়ু সুরক্ষা নয়, জ্বালানি ও জাতীয় নিরাপত্তাও নিশ্চিত করতে পারে। তাই দেরি না করে এখনই কার্যকর পদক্ষেপ নিতে হবে।

