এক্সিম ব্যাংকের গ্রাহক মেহনাজ বেগমের সঙ্গে কথা হচ্ছিল বুধবার সকালে। কথার শুরুতেই তিনি কান্নায় ভেঙে পড়লেন। জানালেন, সারাজীবন শিক্ষকতা করেছেন। অবসরে যাওয়ার পর, তিনি তার প্রভিডেন্ট ফান্ডের টাকা তুলে এই ব্যাংকে ফিক্সড ডিপোজিট করেন। এখন তিনি না পারছেন টাকা তুলতে, না পাচ্ছেন লাভের টাকা।
তিনি বলেন, ‘বাংলাদেশ ব্যাংক ধীরে ধীরে আমাদের মৃত্যুর দিকে ঠেলে দিচ্ছে। আমার টাকা ব্যাংকে রেখেও আমি চিকিৎসার জন্য টাকা তুলতে পারছি না।’ সৌদি আরবে দীর্ঘদিন চাকরি শেষে করোনাকালীন সময়ে দেশে ফেরেন আফজালুল। প্রচলিত ব্যাংকে সুদ নিতে চাননি তিনি, এজন্যই টাকা রাখেন সোশ্যাল ইসলামী ব্যাংকে। কিন্তু এখন তিনি অসহায়। তিনি বলছিলেন, ‘এত বছর চাকরি করার পর এখন আমি পথের ফকির। আমি তো ন্যায়বিচার পাচ্ছি না।’
তিনি বলেন, ‘আমার টাকা আমি ফেরত পাব না কেন?’ এরকম কান্না প্রায় ৭৬ হাজার মানুষের। পাঁচটি ইসলামি ব্যাংকে যারা টাকা জমা রেখেছিলেন। তারা এখন নিঃস্ব, সর্বস্বান্ত, অসহায়। তাদের দোষ কোথায়? কী তাদের অপরাধ? তারা তো সরকারের অনুমোদিত ব্যাংকেই টাকা রেখেছিলেন। তখন তো সরকার বলেনি এখানে টাকা রাখা উচিত হবে না, কিংবা ঝুঁকি আছে।
তাহলে আমানতকারীদের টাকার দায়িত্ব কেন সরকার নেবে না? সম্মিলিত ইসলামী ব্যাংক বা একীভূত করা পাঁচ ব্যাংকের আমানতকারীরা অতিপ্রয়োজনেও টাকা না তুলতে পারাসহ নানা ধরনের সংকটে ভুগছেন। দুই বছর ধরেই তারা এমন ভোগান্তির মধ্যে রয়েছেন। সবশেষ ভোগান্তি হিসেবে এসব ব্যাংকের আমানতকারীদের হিসাব থেকে আগে দেওয়া মুনাফা কেটে নেওয়ার সিদ্ধান্ত নেয় বাংলাদেশ ব্যাংক। পরে আমানতকারীদের আন্দোলনের চাপে বাংলাদেশ ব্যাংকের সদ্য বিদায়ি গভর্নর আহসান এইচ মনসুর ৪ শতাংশ মুনাফা দেওয়ার ঘোষণা দেন। ফলে এসব ব্যাংকের আমানতকারীরা ২০২৪ ও ২০২৫ সালে তাদের স্থিতির ওপর ৪ শতাংশ হারে মুনাফা পাবেন। যদিও তারা ১২-১৪ শতাংশ মুনাফা পাবেন-এমন চুক্তিতেই আমানত রেখেছিলেন। এসব ব্যাংকের ৭৫ লাখ গ্রাহক হেয়ার কাট বাতিলের দাবি জানিয়ে এলেও তা এখনো কার্যকর হয়নি।
এমন বাস্তবতায় তারা নতুন সরকারের সিদ্ধান্তের অপেক্ষায় রয়েছেন। যদিও নতুন সরকারের পক্ষ থেকে বিষয়টি নিয়ে এখনো কোনো কিছু বলা হয়নি। তবে বাংলাদেশ ব্যাংকের নতুন গভর্নর মোস্তাকুর রহমান বলেছেন’ পাঁচ ব্যাংক একীভূত করে গঠিত ‘সম্মিলিত ইসলামী ব্যাংক’-এর কার্যক্রম অব্যাহত থাকবে।’ মঙ্গলবার (৩ মার্চ) বিকালে গভর্নরের কার্যালয়ে একীভূত হওয়া পাঁচ ব্যাংকের প্রশাসক ও বাংলাদেশ ব্যাংকের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের সঙ্গে অনুষ্ঠিত বৈঠকে তিনি এসব কথা বলেন। এদিকে হেয়ার কাট সম্পূর্ণভাবে প্রত্যাহার এবং এসব ব্যাংকে স্বাভাবিক লেনদেনের দাবিতে পাঁচ ব্যাংকের ভুক্তভোগী আমানতকারীরা আগামীকাল বৃহস্পতিবার বাংলাদেশ ব্যাংকের সামনে শান্তিপূর্ণ মানববন্ধন কর্মসূচি পালনের ঘোষণা দিয়েছেন।
যে পাঁচটি ব্যাংক একীভূত হয়েছে, সেগুলো হলো ফার্স্ট সিকিউরিটি ইসলামী ব্যাংক, গ্লোবাল ইসলামী ব্যাংক, ইউনিয়ন ব্যাংক, এক্সিম ব্যাংক ও সোশ্যাল ইসলামী ব্যাংক। এই পাঁচ ব্যাংক একীভূত করে সম্মিলিত ইসলামী ব্যাংক নামে নতুন ব্যাংক গঠন করা হয়েছে। আমানতকারীরা প্রত্যাশা করছেন, নিরঙ্কুশ বিজয়ের মাধ্যমে দেশে নতুন সরকার গঠিত হয়েছে। আগের গভর্নরকে সরিয়ে নতুন গভর্নরও নিয়োগ দিয়েছে সরকার। ফলে আগের গভর্নর যে অন্যায় সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন, নতুন সরকার বা নতুন গভর্নর নিশ্চয়ই সেই অন্যায় মেনে নেবেন না। তারা বলেন, ব্যাংকে আমানত রাখাই পাপ হয়েছে। তারা তো বাংলাদেশ ব্যাংকের অনুমোদিত ব্যাংকেই আমানত রেখেছিলেন। তারা বলেন, নতুন সরকার দায়িত্ব নিলেও এখন পর্যন্ত হেয়ার কাট বাতিলের ঘোষণা দেয়নি। জয়েন্ট অ্যাকাউন্টের মুনাফার টাকাও তারা তুলতে পারছেন না। তারা একসঙ্গে সব টাকা তুলে ফেলতে চাচ্ছেন না। শুধু স্বাভাবিক লেনদেন চাইছেন। এ বিষয়ে এক্সিম ব্যাংকের গ্রাহক শাহানুর রহমান বলেন, ‘আমরা তো বাংলাদেশ ব্যাংকের কাছে জিম্মি হয়ে গেছি। এখন নতুন গভর্নর কাজে যোগ দিয়েছেন। তিনি নিশ্চয়ই আমাদের যৌক্তিক দাবি মেনে নেবেন।’ এ প্রসঙ্গে বাংলাদেশ ভুক্তভোগী ব্যাংক আমানতকারী অ্যাসোসিয়েশনের সদস্যসচিব আলিফ রেজা বলেন, ‘বিদায়ি গভর্নর অন্যায়ভাবে আমাদের মুনাফার একটা অংশ কেটে রাখতে চাইছেন। যদিও এমন সিদ্ধান্তকে অর্থনীতিবিদ এবং শরিয়াহ আইন বিশেষজ্ঞরা অযৌক্তিক এবং আইনবহির্ভূত বলে মন্তব্য করেছেন। আমরা আশা করছি, নতুন গভর্নর বিষয়টি বিবেচনা করবেন এবং হেয়ার কাট পদ্ধতি বাতিল করবেন। এই লক্ষ্যে আমরা আগামী বৃহস্পতিবার বাংলাদেশ ব্যাংকের সামনে শান্তিপূর্ণ মানববন্ধনের আয়োজনের সিদ্ধান্ত নিয়েছি।’ আমানতকারীদের হিসাব থেকে হেয়ার কাটের নামে মুনাফা কাটার বিষয়টিকে অনৈতিক উল্লেখ করে বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক প্রধান অর্থনীতিবিদ ড. মুস্তফা কে মুজেরী বলেন, ‘নৈতিকতার দিক থেকে বাংলাদেশ ব্যাংকের এই সিদ্ধান্ত পুনর্বিবেচনা করা উচিত। কেননা যদি বাংলাদেশ ব্যাংকের বিবেচনায় ব্যাংকগুলো লস করার পরও মুনাফা দেয়, তাহলে এর দায় তো সংশ্লিষ্ট ব্যাংকের পরিচালকদের, কোনোভাবেই তা বিনিয়োগকারীদের ওপর বর্তায় না। এটা একটা অনৈতিক সিদ্ধান্ত। এটা অনেকটা উদোর পিণ্ডি বুধোর ঘাড়ে চাপানোর মতো অবস্থা। এই সিদ্ধান্ত বিনিয়োগকারীদের মধ্যে বড় ধরনের বৈষম্য সৃষ্টি করবে। কারণ ব্যাংক হয়তো সব বিনিয়োগকারীকেই মুনাফা দিয়েছিল। এর মধ্যে যারা টাকাটা উঠিয়ে নিয়েছেন অথবা বন্ধ করে দিয়েছেন তাদের কাছ থেকে তো আর কাটার সুযোগ নেই। আর যারা নানাভাবে এখনো বিনিয়োগ বহাল রেখেছেন, তারা জরিমানার শিকার হবেন।’ তিনি আরও বলেন, ‘যেহেতু ব্যাংকগুলো পুঁজিবাজারে তালিকাভুক্ত, তাই এই দুই বছরে ব্যাংকগুলো মুনাফার ভিত্তিতে সরকারকে করও দিয়েছে। তাহলে সরকার কি সেটা ফেরত দেবে?’
এমনিতেই অনেক আমানতকারী নিজেদের জমাকৃত অর্থ নিজেদের প্রয়োজনে তুলতে পারছেন না। তার ওপর তাদের আমানত থেকে ২০২৪ ও ২০২৫ সালের মুনাফার একটা অংশ কেটে নেওয়া হবে। ফলে তারা মুনাফা থেকেও বঞ্চিত হবেন। আর যারা ইতোমধ্যে আমানত তুলে নিয়েছেন, তাদের মুনাফা তো আর কাটা সম্ভব হবে না। তারা সুবিধাপ্রাপ্ত হলেন। এখানে বড় ধরনের বৈষম্য তৈরি হচ্ছে। সব আমানতকারীর জন্য সমান বিচার হচ্ছে না। ব্যাংক রেজল্যুশন অধ্যাদেশের বাইরে গিয়ে বাংলাদেশ ব্যাংকের ক্ষমতাবলে অনেক সিদ্ধান্ত নেওয়া হচ্ছে। রেজল্যুশনে বলা আছে, বাংলাদেশ ব্যাংক সময়ে সময়ে বিভিন্ন বিষয়ে হস্তক্ষেপ করতে পারবে। সেই ক্ষমতাবলেই তারা নানা ধরনের বিতর্কিত সিদ্ধান্ত নিয়েছিল সাবেক গভর্নর।
বাংলাদেশ ব্যাংকের কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, ২০২৪ ও ২০২৫ সালে ব্যাংক পাঁচটি বড় অঙ্কের লোকসান করেছে। এ জন্য আমানতকারীরা এই দুই বছরের জন্য তাদের আমানতের বিপরীতে ৪ শতাংশ হারে মুনাফা পাবেন। যদিও ব্যাংকগুলোতে ৭ থেকে ৯ শতাংশ মুনাফার আমানত রয়েছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, ৫ ব্যাংকে বর্তমানে ৭৫ লাখ আমানতকারীর প্রায় ১ লাখ ৪২ হাজার কোটি টাকা জমা রয়েছে। যার বড় অংশ ক্ষুদ্র আমানতকারীদের। ২০২৪ সালের আগস্টের পর থেকে এ ব্যাংকগুলোর আমানতকারীরা চাহিদা অনুযায়ী টাকা তুলতে পারছে না। আমানতের বিপরীতে বিপরীতে এসব ব্যাংকের ঋণ রয়েছে ১ লাখ ৯৩ হাজার কোটি টাকা, যার বড় অংশ ইতোমধ্যে খেলাপি হয়ে গেছে।
সম্মিলিত ইসলামী ব্যাংক পিএলসির মূলধন হিসেবে এরই মধ্যে ২০ হাজার কোটি টাকার জোগান দিয়েছে সরকার। এ অর্থ থেকে ১০ হাজার কোটি টাকা সরকারের সুকুকে বিনিয়োগ করা হয়েছে। বাকি ১০ হাজার কোটি টাকা থেকে গ্রাহকদের আমানতের অর্থ ফেরত দেওয়ার পাশাপাশি পরিচালন ব্যয় বহন করা হচ্ছে বলে সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন। তারা বলছেন, প্রতি মাসে পাঁচ ব্যাংকের কর্মীদের বেতন-ভাতাসহ পরিচালন খাতে ব্যয় হয় অন্তত ৩৫০ কোটি টাকা। কিন্তু এ পরিমাণ অর্থ ব্যাংকগুলোর বিনিয়োগ ও অন্যান্য খাত থেকে আয় হচ্ছে না। এতে আনুষ্ঠানিক কার্যক্রম শুরুর আগেই সম্মিলিত ইসলামী ব্যাংকের ওপর বিপুল লোকসানের ভার এসে পড়ছে। এভাবে চলতে থাকলে সরকারের জোগান দেওয়া মূলধন দ্রুতই ফুরিয়ে যাবে। সম্মিলিত ইসলামী ব্যাংক পিএলসি নামে লাইসেন্স ইস্যু করা ব্যাংকটির অনুমোদিত মূলধন নির্ধারণ করা হয়েছে ৪০ হাজার কোটি টাকা। আর পরিশোধিত মূলধন ৩৫ হাজার কোটি টাকা, যার মধ্যে ২০ হাজার কোটি টাকা জোগান দিয়েছে সরকার। বাকি ১৫ হাজার কোটি টাকা ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানের স্থায়ী আমানত এবং অন্যান্য প্রাতিষ্ঠানিক আমানতকে শেয়ারে রূপান্তরের মাধ্যমে মূলধনে অন্তর্ভুক্ত করার কথা রয়েছে। গত ৩০ ডিসেম্বর ব্যাংকটির লোগো উন্মোচন করা হয়। এরপর ২৫ জানুয়ারি আনুষ্ঠানিকভাবে উদ্বোধনের কথা থাকলেও শেষ মুহূর্তে সেটি বাতিল করা হয়। কিছু আমানতকারী ও চট্টগ্রামের বিভিন্ন পর্যায়ের ব্যাংক কর্মকর্তাদের পক্ষ থেকে অনুষ্ঠানস্থলে ঘেরাও কর্মসূচি ঘোষণা করা হয়। উদ্ভূত পরিস্থিতিতে উদ্বোধনী অনুষ্ঠানটি স্থগিত করে কেন্দ্রীয় ব্যাংক। সম্মিলিত ইসলামী ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) নিয়োগের বিষয়ে তিন মাস ধরেই তৎপর ছিল বাংলাদেশ ব্যাংক ও অর্থ মন্ত্রণালয়। বিভিন্ন প্রক্রিয়া শেষ করে শেষ পর্যন্ত ইউনাইটেড কমার্শিয়াল ব্যাংকের (ইউসিবি) অতিরিক্ত ব্যবস্থাপনা পরিচালক নাবিল মুস্তাফিজুর রহমানকে এমডি নিয়োগ দেওয়া হয়েছিল। কিন্তু নিয়োগের মাত্র দুই দিন পরই তিনি ব্যাংকটির এমডি পদে দায়িত্ব পালনে অপারগতা প্রকাশ করেন। কারণ হিসেবে নিজের অসুস্থতার কথা জানিয়েছেন তিনি। এরই মধ্যে একীভূতকরণের বিরুদ্ধে উচ্চ আদালতে রিট আবেদন দায়ের করেছেন এক্সিম ব্যাংক ও সোশ্যাল ইসলামী ব্যাংকের (এসআইবিএল) উদ্যোক্তারা। নতুন করে ফার্স্ট সিকিউরিটি ইসলামী ব্যাংক, গ্লোবাল ইসলামী ব্যাংক ও ইউনিয়ন ব্যাংকের উদ্যোক্তারাও রিট করার উদ্যোগ নিচ্ছেন বলে জানা গেছে। এই পাঁচ ব্যাংক নিয়ে সৃষ্ট জটিলতার অন্যতম কারণ হলো, সাবেক গভর্নর আহসান এইচ মনসুরের একগুঁয়েমি এবং অযৌক্তিক সিদ্ধান্ত। সকলেই আশা করছেন, নতুন গভর্নর, সবার সঙ্গে সমন্বয় করে আমানতকারীদের স্বার্থ রক্ষায় কাজ করবেন। তাদের কান্না থামাতে উদ্যোগ নেবেন। কারণ, এই কান্না না থামলে পুরো ব্যাংকিং ব্যবস্থার ওপর মানুষের আস্থা নষ্ট হবে। সরকার যখন একটি ব্যাংকে অনুমোদন দেয় তখন সরকার আমানতকারীদের টাকার জিম্মাদারও হয়। কাজেই সরকার ও বাংলাদেশ ব্যাংকে দ্রুত এই সংকট থেকে আমানতকারীদের মুক্তি দিতে হবে।

