পাবনা মানসিক হাসপাতালে ১৭ বছর চিকিৎসার পর মারা গেলেন নাইমা চৌধুরী (৪২)। গত ৫ জানুয়ারি হাসপাতালের একাকী কক্ষে তিনি শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন। মৃত্যুর চার দিন পার হলেও কোনো স্বজন তাকে দেখতে বা মরদেহ নিতে আসেননি। বর্তমানে হাসপাতালের হিমঘরে বেওয়ারিশ হিসেবে দাফনের অপেক্ষায় রাখা হয়েছে তার নিথর দেহ।
হাসপাতাল সূত্রে জানা গেছে, ২০০৯ সালের ১৪ নভেম্বর মাত্র ২৫ বছর বয়সে নাইমা চৌধুরীকে পাবনা মানসিক হাসপাতালে ভর্তি করেন তার স্বজনেরা। ভর্তির সময় প্রাণবন্ত এই নারী সিজোফ্রোনিয়ায় আক্রান্ত ছিলেন। শুরুর দিকে পরিবার বা স্বজনরা নিয়মিত যোগাযোগ রাখতেন। কিন্তু সময়ের সঙ্গে সঙ্গে নাইমা তাদের কাছে ‘বোঝা’ হয়ে ওঠেন। গত এক দশকেরও বেশি সময় ধরে পরিবারের কেউ তার কোনো খোঁজ নেয়নি।
নাইমার শারীরিক অবস্থা এক সময় স্থিতিশীল হলেও পরিবারের অনাগ্রহের কারণে তার আর বাড়ি ফেরা হয়নি। দীর্ঘদিন হাসপালে বন্দির মতো জীবন কাটানোয় একসময় মানসিক অবসাদ ও শারীরিক জটিলতা তাকে গ্রাস করে। গায়ের উজ্জ্বল রং ফিকে হয়ে যায়, কমতে থাকে হিমোগ্লোবিনের মাত্রা। শেষ কয়েক বছর তিনি খাবার খেতে চাইতেন না। নার্সরা জোর করে মুখে তুলে খাইয়ে দিতেন।
হাসপাতালের আবাসিক মেডিক্যাল অফিসার ডা. মোহাম্মদ সেলিম মোরশেদ জানান, নাইমার মৃত্যুর পরও তার ফাইলে থাকা বড় ভাইয়ের মোবাইল নম্বরে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হয়েছে। কিন্তু সেটি বন্ধ পাওয়া গেছে। ঢাকার কেরানীগঞ্জের দেওয়া ঠিকানায় খোঁজ নিয়েও তাদের হদিস মেলেনি।
হাসপাতালের পরিচালক ডা. শাফকাত ওয়াহিদ বলেন, পুলিশের মাধ্যমে স্বজনদের খোঁজা হচ্ছে। নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে কেউ না এলে আঞ্জুমান মুফিদুল ইসলামের মাধ্যমে তাকে বেওয়ারিশ হিসেবে দাফন করা হবে। আমরা আগামীকাল শনিবার দিনটা দেখব।
তিনি আরো বলেন, নাইমার মৃত্যু যেন আমাদের সমাজের এক নিষ্ঠুর মানসিকতার প্রতিফলন। পাবনা মানসিক হাসপাতালে নাইমার মতো আরও অন্তত ছয়জন রোগী আছেন, যাদের পরিবারের কোনো খোঁজ নেই। তার মধ্যে ৬৫ বছর বয়সি সাইদ হোসেন আজও শিশুর মতো ডুকরে কাঁদেন বাড়ি যাওয়ার জন্য। তার বাড়ির লোকজনেরও কোনো খোঁজ মিলছে না। একইভাবে শিপ্রা রানী, গোলজার বিবি ও শাহানারা আক্তাররা অসুস্থ হয়ে অভিভাবকদের হাত ধরে হাসপাতালে এসেছিলেন অল্প বয়সে, এখন তারা বার্ধক্যে উপনীত।
তিনি আক্ষেপের সুরে বলেন, মানসিক রোগকে পাগল হিসেবে আখ্যায়িত করে, পরিবার থেকে বিচ্ছিন্ন করে দেওয়ার এই প্রবণতা নাইমার মতো শত শত মানুষের জীবনকে অন্ধকারে ঠেলে দিচ্ছে। নাইমা চলে গেছেন, কিন্তু অসংখ্য প্রশ্ন রেখে গেছেন।

