নির্বাচনের পর টানা তিন দিনে তিনটি হত্যাকাণ্ডে উদ্বেগ ও আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়েছে বগুড়াজুড়ে। চিহ্নিত সন্ত্রাসী ও কিশোর গ্যাংদের দৌরাত্ম্য ঠেকাতে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারছে না এমন অভিযোগ স্থানীয়দের। পুলিশ হত্যার মোটিভ উদঘাটন, অস্ত্র উদ্ধার ও আসামি গ্রেপ্তারের আশ্বাস দিলেও এখনো তিনটি ঘটনায় কাউকে আটক করা হয়নি। দুটি হত্যাকাণ্ডকে ‘ক্লুলেস’ বলছেন তদন্ত সংশ্লিষ্টরা।
স্থানীয়দের ভাষ্য, নির্বাচনের সময় কঠোর নিরাপত্তা ও টহল থাকলেও ভোট শেষে সেই তৎপরতা শিথিল হয়। আর সেই সুযোগেই সক্রিয় হয়ে ওঠে দুর্বৃত্তরা। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর টহল ও নজরদারি জোরদার না হলে অপরাধ আরও বাড়তে পারে বলে আশঙ্কা করছেন তারা।
শুক্রবার (১৩ ফেব্রুয়ারি) সকালে শহরের দক্ষিণ বৃন্দাবন পাড়া এলাকায় আলিফ (১৬) নামে এক কিশোরকে ছুরিকাঘাতে হত্যা করা হয়। প্রায় পাঁচ মাস আগে বাবার গ্যারেজে কাজ শেখা শুরু করেছিল সে। সকাল সাড়ে ৯টার দিকে ছেলে আলিফের সঙ্গে কথা বলেন বাবা রিপন মিয়া। ঘণ্টাখানেক পর স্থানীয়দের খবর পেয়ে ছুটে এসে গ্যারেজের কাছে ছেলের লাশ দেখতে পান তিনি।
রিপন মিয়া জানান, বাবা-ছেলে একসঙ্গে গ্যারেজে যেতেন, একসঙ্গে ফিরতেন। আলিফের কোনো শত্রু ছিল না, কারও সঙ্গে বিরোধও হয়নি। এলাকাবাসীও তাকে পছন্দ করত। তবে নিজের গ্যারেজ ব্যবসা নিয়ে কিছু সমস্যা আছে উল্লেখ করে তিনি বলেন, “আসলে কে শত্রু বুঝতে পারছি না।” এ ঘটনায় অজ্ঞাত আসামিদের বিরুদ্ধে মামলা করা হয়েছে।
শনিবার সকালে বগুড়া সদর উপজেলার মাটিডালী এলাকায় উপজেলা পরিষদের সামনে ফাহিম নামে এক তরুণের ওপর হামলা হয়। ভোটের ছুটি শেষে বিসিক এলাকায় কর্মস্থলে যাচ্ছিলেন তিনি। একই এলাকার তনয় নামে এক যুবক পেছন থেকে হামলা চালায় বলে অভিযোগ।
স্থানীয়রা গুরুতর আহত অবস্থায় ফাহিমকে প্রথমে টিএমএসএস মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি করেন। পরে তাকে শহীদ জিয়াউর রহমান মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নেওয়া হলে অতিরিক্ত রক্তক্ষরণে দুপুরে তার মৃত্যু হয়।
ফাহিমের দুলাভাই মেহেদী হাসান জানান, তনয় একাধিকবার ক্ষতির হুমকি দিয়েছিল। এ বিষয়ে থানায় জিডিও করা হয়েছিল। তার দাবি, ফাহিমকে কয়েকদিন ধরে অনুসরণ করা হচ্ছিল। হত্যার ঘটনায় তনয়সহ পাঁচজনের নাম উল্লেখ করে মামলা হয়েছে। তবে ঘটনার তিন দিন পরও কাউকে গ্রেপ্তার করতে পারেনি পুলিশ।
রবিবার গাবতলী উপজেলার সোন্দাবাড়ি এলাকায় ট্রাক পরিবহন ব্যবসায়ী সাইফুল ইসলামকে কুপিয়ে ও গলাকেটে হত্যা করা হয়। শনিবার গভীর রাত পর্যন্ত তিনি বাড়ি ফেরেননি। ব্যবসার কারণে দেরিতে ফেরাটা অস্বাভাবিক ছিল না বলে জানায় পরিবার।
রবিবার সকালে প্রতিবেশীদের মাধ্যমে খবর পেয়ে বাড়ির সামনে ঘাসের জমিতে সাইফুল ইসলামের মরদেহ দেখতে পান স্বজনরা। বড় মেয়ে সাদিয়া জানান, কারও সঙ্গে বাবার দ্বন্দ্ব ছিল বলে জানা নেই। গাবতলী থানার ওসি আনিসুর রহমান জানান, এ ঘটনায় এখনো মামলা হয়নি। ব্যবসায়িক বিরোধকে প্রাথমিকভাবে গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে।
তিন হত্যাকাণ্ডের একটিতে প্রতিহিংসা ও ব্যক্তিগত রাগের বিষয়টি প্রাথমিকভাবে জানা গেলেও বাকি দুটি ঘটনায় এখনো সুস্পষ্ট মোটিভ মেলেনি। অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (অপরাধ) হোসাইন মোহাম্মদ আবু রায়হান বলেন, রাজনৈতিক সম্পৃক্ততার প্রমাণ মেলেনি। একাধিক টিম কাজ করছে, দ্রুত অপরাধীদের গ্রেপ্তার করা হবে।
বগুড়া প্রেসক্লাবের সাধারণ সম্পাদক সিনিয়র সাংবাদিক কালাম আজাদ বলেন, জেলার আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি আরও জোরদার করতে হবে। জনসাধারণের নিরাপদ চলাচল নিশ্চিত করা আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর দায়িত্ব।
টানা তিন দিনে তিনটি হত্যাকাণ্ডে সাধারণ মানুষের মধ্যে গভীর উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। নিরাপত্তা নিয়ে প্রশ্ন উঠছে সর্বত্র। দ্রুত তদন্ত ও দৃশ্যমান পদক্ষেপ না নিলে আতঙ্ক আরও বাড়বে এমনটাই মনে করছেন বগুড়াবাসী।

