নির্বাচনের আগের মাস জানুয়ারিতে বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচি (এডিপি) বাস্তবায়নে বড় ধরনের ধস নেমেছে। চলতি ২০২৫-২৬ অর্থবছরের প্রথম সাত মাসে (জুলাই-জানুয়ারি) এডিপি বাস্তবায়িত হয়েছে মাত্র ২১.১৮ শতাংশ। আগের ২০২৪-২৫ অর্থবছরের একই সময়ে যা ছিল ২১.৫২ শতাংশ। শুধু গত বছরই নয়, তার আগের তিন অর্থবছরে প্রথম সাত মাসে বাস্তবায়নের হার ছিল ২৭ থেকে ৩০ শতাংশের বেশি।
ফলে দুই দশকের মধ্যে সর্বনিম্ন বাস্তবায়নের রেকর্ড হয়েছে চলতি অর্থবছর। পরিকল্পনা মন্ত্রণালয়ের বাস্তবায়ন পরিবীক্ষণ ও মূল্যায়ন বিভাগ (আইএমইডি) প্রকাশিত সর্বশেষ তথ্যে দেখা যায়, সাত মাসে উন্নয়ন ব্যয় হয়েছে ৫০ হাজার ৫৫৬ কোটি ২৯ লাখ টাকা। যেখানে আগের অর্থবছরের একই সময়ে ব্যয় ছিল ৫৯ হাজার ৮৭৬ কোটি ৭৮ লাখ টাকা। অর্থাৎ এক বছরের ব্যবধানে ব্যয় কমেছে প্রায় ৯ হাজার ৩২০ কোটি টাকা।
যদিও একক মাস হিসেবে সদ্যোবিদায়ি জানুয়ারিতে ব্যয় হয়েছে ৩.৬৪ শতাংশ, যা আগের অর্থবছরের জানুয়ারির ৩.৫৫ শতাংশের চেয়ে সামান্য বেশি। তবে ডিসেম্বরে বাস্তবায়ন ছিল ৫.৮০ শতাংশ। জানুয়ারিতে তা নেমে আসে ৩.৫৫ শতাংশে, যা বড় ধাক্কার ইঙ্গিত দেয়। সরকার এরই মধ্যে বড় ধরনের কাটছাঁট করে সংশোধিত এডিপির আকার দুই লাখ কোটি টাকায় নামিয়েছে।
মূল এডিপি ছিল দুই লাখ ৩০ হাজার কোটি টাকা। অর্থাৎ ৩০ হাজার কোটি টাকা বা মোট বরাদ্দের ১৩.০৪ শতাংশ কমানো হয়েছে। সবচেয়ে বেশি কাটছাঁট হয়েছে স্বাস্থ্য ও শিক্ষা খাতে। স্বাস্থ্যসেবা খাতে বরাদ্দ কমেছে ৭৩ শতাংশ এবং মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা খাতে কমেছে ৫৫ শতাংশ। বাস্তবায়নের দুরবস্থার চিত্র আরো স্পষ্ট হয়েছে মন্ত্রণালয়ভিত্তিক পরিসংখ্যানে।
সাত মাসেও বরাদ্দের ১০ শতাংশ বাস্তবায়ন করতে পারেনি ছয়টি মন্ত্রণালয় ও বিভাগ। এগুলো হলো পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তন মন্ত্রণালয়; আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগ, অভ্যন্তরীণ সম্পদ বিভাগ, সুরক্ষা সেবা বিভাগ, জননিরাপত্তা বিভাগ এবং সংসদবিষয়ক সচিবালয়। এর মধ্যে সংসদবিষয়ক সচিবালয়ে ছয় মাসে বরাদ্দের এক টাকাও খরচ হয়নি। বিশেষ প্রয়োজনে রাখা ১০ হাজার ৭৭১ কোটি ৬৭ লাখ টাকার বরাদ্দ থেকেও কোনো অর্থ ব্যয় হয়নি।
অন্যদিকে কিছু মন্ত্রণালয় তুলনামূলক ভালো করেছে। খাদ্য মন্ত্রণালয় বরাদ্দের চেয়ে ১১৯ কোটি টাকা বেশি ব্যয় করে ১৪৫.৯৮ শতাংশ বাস্তবায়ন দেখিয়েছে। এ ছাড়া বাস্তবায়ন পরিবীক্ষণ ও মূল্যায়ন বিভাগ, মন্ত্রিপরিষদ বিভাগ, পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়, মহিলা ও শিশু বিষয়ক মন্ত্রণালয়, পানি সম্পদ মন্ত্রণালয়, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ বিভাগ, প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয় এবং শ্রম ও কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয় বরাদ্দের ৪০ শতাংশের বেশি ব্যয় করেছে।
সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা বলছেন, অর্থবছরের শুরুর দিকে বাস্তবায়ন সাধারণত কম থাকে এবং সময়ের সঙ্গে বাড়ে। তবে ২০২৪ সালের জুলাইয়ে সরকারবিরোধী আন্দোলন, আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতি, কারফিউ ও শাটডাউনের মতো ঘটনায় উন্নয়ন কর্মকাণ্ড মারাত্মকভাবে ব্যাহত হয়। আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর অন্তর্বর্তী সরকার বিভিন্ন প্রকল্প খতিয়ে দেখার সিদ্ধান্ত নেয়, অনেক প্রকল্পে অর্থ ছাড় স্থগিত রাখা হয় এবং রাজনৈতিক বিবেচনায় নেওয়া প্রকল্পগুলোতে কাটছাঁট করা হয়। এতে উন্নয়ন কার্যক্রমে স্থবিরতা তৈরি হয়, যার প্রভাব পড়েছে এডিপি বাস্তবায়নে।
গত ২০২৪-২৫ অর্থবছর শেষে সংশোধিত এডিপির মোট বরাদ্দের ৬৭.৮৫ শতাংশ ব্যয় হয়েছিল, যা তার আগের ২০২৩-২৪ অর্থবছরের ৮০.৬৩ শতাংশের তুলনায় প্রায় ১৩ শতাংশ পয়েন্ট কম। আইএমইডির তথ্য অনুযায়ী, ২০০৪-০৫ অর্থবছরের পর থেকে এত কম বাস্তবায়ন আর দেখা যায়নি। বর্তমান পরিস্থিতিতে বাকি পাঁচ মাসে বাস্তবায়ন করতে হবে ৭৮.৮২ শতাংশ, যা বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে সরকারের সামনে।

