বিশ্বজুড়ে সংঘাত ও সহিংসতা ক্রমশ বেড়েই চলছে। ২০২৫ সালে সেটি তীব্র আকার ধারণ করে। নরওয়েভিত্তিক গবেষণা প্রতিষ্ঠান পিস রিসার্চ ইনস্টিটিউট অসলো (পিআরআইও)-এর সর্বশেষ প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর ২০২৫ সালই ছিল সবচেয়ে সংঘাতপূর্ণ ও প্রাণঘাতী বছর। এ সময়ে যুদ্ধ, রাজনৈতিক সহিংসতা ও সংঘর্ষে প্রাণ হারিয়েছেন প্রায় আড়াই লাখ মানুষ। বৈশ্বিক নিরাপত্তা পরিস্থিতি কতটা উদ্বেগজনক হয়ে ওঠেছে এটি তারই ইঙ্গিত দেয়।
আজ মঙ্গলবার (৯ জুন) বার্তা সংস্থা এএফপির বরাতে জার্মানির সংবাদমাধ্যম ডয়চে ভেলে এ তথ্য প্রকাশ করেছে।
পিআরআইওর বার্ষিক ‘কনফ্লিক্ট ট্রেন্ডস’ প্রতিবেদনে বলা হয়, ২০২৫ সালে অন্তত ৬৫টি রাষ্ট্র-সংশ্লিষ্ট সংঘাতের ঘটনা নথিভুক্ত হয়েছে, যেখানে অন্তত একটি দেশ জড়িত ছিল। একই সঙ্গে রাষ্ট্রের মধ্যে সংঘাতের সংখ্যাও গত ৮০ বছরের মধ্যে সর্বোচ্চ পর্যায়ে পৌঁছেছে। আগের বছরের তুলনায় এ সংখ্যা দ্বিগুণ হয়ে দাঁড়িয়েছে আটটিতে।
প্রতিবেদনে ভারত-পাকিস্তান সীমান্ত সংঘর্ষ, আফগানিস্তান-পাকিস্তান উত্তেজনা, কম্বোডিয়া-থাইল্যান্ড সীমান্ত বিরোধ, ইউক্রেনে রাশিয়ার আগ্রাসন এবং সিরিয়ায় ইসরায়েলের সামরিক অভিযানকে উল্লেখযোগ্য সংঘাত হিসেবে তুলে ধরা হয়েছে।
প্রতিবেদন উপস্থাপনকালে পিআরআইওর গবেষক সিরি আস রুস্তাদ বলেন, ‘দুর্ভাগ্যজনকভাবে এ বছর ইতিবাচক কিছু বলার সুযোগ খুব কম। সাধারণত প্রতিবেদনে কিছু আশাব্যঞ্জক দিক তুলে ধরা যায়, কিন্তু এবারের পরিসংখ্যান গভীর উদ্বেগের কারণ।’
প্রতিবেদন অনুযায়ী, গত বছর যুদ্ধ ও রাজনৈতিক সহিংসতায় নিহত হয়েছেন ২ লাখ ৪৫ হাজার মানুষ। এর মধ্যে ৭৬ হাজার ৫০০ জন ছিলেন বেসামরিক নাগরিক, যাদের সরাসরি লক্ষ্য করে হামলা চালানো হয়। অথচ ২০২৪ সালে এ সংখ্যা ছিল মাত্র ১৪ হাজার ২০০।
বেসামরিক মানুষের প্রাণহানি বৃদ্ধির অন্যতম কারণ হিসেবে সুদানে সেনাবাহিনী ও আধাসামরিক বাহিনীর চলমান সংঘাতকে দায়ী করা হয়েছে। বিশেষ করে দারফুর অঞ্চলের এল-ফাশের শহরে অবরোধ ও গণহত্যার ঘটনায় প্রায় ৬০ হাজার মানুষের মৃত্যু হয়েছে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
স্নায়ুযুদ্ধ-পরবর্তী সময়ে কেবল ১৯৯৪ ও ২০২১ সালে এর চেয়ে বেশি প্রাণহানি ঘটেছিল। ১৯৯৪ সালে রুয়ান্ডার গণহত্যা এবং ২০২১ সালে ইথিওপিয়ার টিগ্রে অঞ্চলের যুদ্ধ সেই উচ্চ মৃত্যুহারের জন্য দায়ী ছিল।
অঞ্চলভিত্তিক হিসাবে ২০২৫ সালে সবচেয়ে বেশি সংঘাতের ঘটনা ঘটেছে আফ্রিকায়। মহাদেশটিতে ২৯টি সংঘাত নথিভুক্ত হয়েছে। এরপর রয়েছে এশিয়া, মধ্যপ্রাচ্য, আমেরিকা ও ইউরোপ।
রুস্তাদ বলেন, ‘গত পাঁচ-ছয় বছরে ধারাবাহিকভাবে বড় বড় সংঘাত শুরু হয়েছে। বিশ্ববাসী কার্যত এক মুহূর্তের জন্যও সংঘাতমুক্ত সময় পায়নি। এখন দীর্ঘস্থায়ী ও উচ্চমাত্রার সংঘাত বৈশ্বিক বাস্তবতায় পরিণত হয়েছে।’
উপসালা কনফ্লিক্ট ডেটা প্রোগ্রাম (ইউসিডিপি)-এর তথ্যের ভিত্তিতে প্রতিবেদনটি প্রস্তুত করা হয়েছে। এতে সংঘবদ্ধ সহিংসতার তিনটি ধরন চিহ্নিত করা হয়েছে—রাষ্ট্র-সংশ্লিষ্ট সংঘাত, অ-রাষ্ট্রীয় গোষ্ঠীর মধ্যে সংঘাত এবং বেসামরিক মানুষের বিরুদ্ধে একতরফা সহিংসতা।
রুস্তাদের মতে, বিশ্বের সবচেয়ে আগ্রাসী রাষ্ট্রগুলোর অন্যতম ইসরায়েল বর্তমানে গাজা, সিরিয়া, লেবানন, ইরান এবং ইয়েমেনের হুতি বিদ্রোহীদের সঙ্গে বিভিন্ন মাত্রার সংঘাতে জড়িত।
তিনি আরও বলেন, যুক্তরাষ্ট্রে ডোনাল্ড ট্রাম্পের ক্ষমতায় প্রত্যাবর্তনের পর আন্তর্জাতিক অঙ্গনে হামলা-সহিংসতা বৃদ্ধি পেয়েছে এবং বৈদেশিক বাণিজ্যেও নতুন বাধা তৈরি হয়েছে।
রুস্তাদের ভাষায়, ‘আন্তর্জাতিক সহযোগিতার পরিবেশ দুর্বল হয়ে পড়েছে। জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদ কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারছে না। বিশ্ব রাজনীতিতে এখন স্পষ্ট মেরুকরণ দেখা যাচ্ছে।’

