ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কের দক্ষিণ পাশে কুমিল্লার চান্দিনা উপজেলার তীরচর গ্রাম। গ্রামের মাঝ দিয়ে একটি সড়ক চলে গেছে বাতাঘাসী এলাকার দিকে। সড়কের পাশে একটি খাল রয়েছে যেখানে বর্তমানে পানি প্রবাহ নেই। অনেকটা ডোবার মতো এই খালের বুকে এখন কচুরিপানার আধিপত্য।
এই সড়ক দিয়ে চলাচলকারী নতুন পথচারীদের নজর আটকে যায় খালের পাড়ে। কেউ দূর থেকে ছবি তোলার চেষ্টা করেন। কারণ শীতের সময় এখানে রোদ পোহাতে দেখা যায় একাধিক গুইসাপকে। নামের সঙ্গে সাপ হলেও এই প্রাণীটি নিরীহ এবং মানুষের কোনো ক্ষতি করে না। তাই গ্রামবাসীরাও এদের বিরক্ত করে না। স্থানীয়দের ভাষ্য অনুযায়ী, গত সাত বছর ধরে এখানে মানুষ ও গুইসাপের সহাবস্থান গড়ে উঠেছে। গ্রামটি বর্তমানে দেড় শতাধিক গুইসাপের নিরাপদ আবাসস্থল হিসেবে পরিচিত।
সরেজমিনে দেখা যায়, তীরচর গ্রামের হাসান সওদাগরের বাড়ি, ওয়ারিশ বেপারির বাড়ির পাশের খালপাড় এবং রুহুল আমিনের পুকুর পাড়ে গুইসাপের অভয়ারণ্য গড়ে উঠেছে। সেখানে রোদ পোহাতে থাকা গুইসাপগুলোকে এমন আয়েশী ভঙ্গিতে শুয়ে থাকতে দেখা যায়, যেন তারা কোনো রাজ পরিবারের সদস্য। শব্দ পেলে তারা ধুপধাপ শব্দ তুলে কচুরিপানার ভেতর মুখ লুকিয়ে ফেলে। বড় আকারের গুইসাপগুলো গাঢ় বাদামি রঙের। সারা শরীরে চামড়ার ওপর হলুদ রঙের রিং দেখা যায়। এদের পা ও নখ লম্বা এবং দ্রুত গাছে উঠতে ও সাঁতরে খাল পার হতে সক্ষম।
বন বিভাগের সূত্র জানায়, গুইসাপ গিরগিটি প্রজাতির প্রাণী। এদের দৈর্ঘ্য সর্বাধিক ১০ ফুট পর্যন্ত হতে পারে। তবে অধিকাংশ গুইসাপের দৈর্ঘ্য ২ থেকে ৪ ফুট এবং প্রস্থ প্রায় ১১ ইঞ্চি। বাংলাদেশে তিন প্রজাতির গুইসাপ দেখা যায়- সোনা গুই, কালো গুই এবং রামগাদি বা বড় গুই। এরা কাঁকড়া, শামুক, ইঁদুর, হাঁস-মুরগির ডিম, পচা-গলা প্রাণীদেহ, সাপ, ব্যাঙ, ছোট কুমির, কুমিরের ডিম, কচ্ছপসহ বিভিন্ন পশু-পাখি ও উচ্ছিষ্ট খেয়ে থাকে।
সামাজিক বন প্রশিক্ষণ ও নার্সারি কেন্দ্র চান্দিনার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা মো. মাজহারুল ইসলাম চৌধুরী জানান, নগরায়ণ ও শিকারিদের দাপটে গুইসাপ বর্তমানে বিপন্ন হয়ে পড়েছে। পরিবেশের ওপর ক্ষতিকর প্রভাবের কথা বিবেচনায় নিয়ে ১৯৯০ সালে সরকার গুইসাপ হত্যায় নিষেধাজ্ঞা জারি করে।
গ্রামবাসী রুহুল আমিন বলেন, গুইসাপগুলো কারো কোনো ক্ষতি করে না এবং তারাও এগুলোর কোনো ক্ষতি করেন না। তার মতে, এলাকায় বর্তমানে দেড় শতাধিক গুইসাপ রয়েছে এবং অনেক মানুষ এগুলো দেখতে এসে ছবি তোলে। স্থানীয় বাসিন্দা মো. অহিদুল ইসলাম জানান, কয়েক দিন আগে তিনি একসঙ্গে ১৭টি গুইসাপ বসে থাকতে দেখেছেন এবং আজ তিনি ৮টি গুইসাপ দেখতে পেয়েছেন। পথ দিয়ে যাওয়ার সময় শিক্ষার্থীরাও দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে গুইসাপগুলো দেখেন।
গোমতা ইসহাকিয়া উচ্চ বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী শাহাদাত হোসেন বলেন, স্কুলে যাওয়ার পথে তারা খালের পাড়ে গুইসাপ বসে থাকতে দেখেন এবং কেউ এগুলোর ক্ষতি করেন না। স্থানীয় পরিবেশ সংগঠক মতিন সৈকত বলেন, গুইসাপ একটি নিরীহ ও উপকারী প্রাণী। নিরাপদ আবাস থাকার কারণে এখানে তারা নির্বিঘ্নে বসবাস করছে। শীতকালে খালের পাড়ে একসঙ্গে ৮ থেকে ১০টি গুইসাপ রোদ পোহাতে দেখা যায়। তার মতে, গুইসাপের মতো অন্যান্য প্রাণীর প্রতিও আমাদের যত্নবান হওয়া উচিত।
কুমিল্লা সামাজিক বন বিভাগের বিভাগীয় বন কর্মকর্তা জি এম মোহাম্মদ কবির বলেন, গুইসাপ প্রকৃতি, পরিবেশ ও কৃষকের বন্ধু। তারা ফসলের জমির ক্ষতিকর পোকা ও ইঁদুর খেয়ে ফেলে। গুইসাপের নিরাপদ পরিবেশ বজায় রাখতে বন বিভাগ কাজ করবে বলে তিনি আশ্বাস দেন।

