দেশে গত পাঁচ বছর ধরে একই জায়গায় আটকে আছে দক্ষ শ্রমিকের হার। এতে বাংলাদেশি শ্রমবাজার মধ্যপ্রাচ্যনির্ভর হয়ে পড়ছে। দক্ষ শ্রমিকের অভাবে এমন চাহিদার অন্য কোনো দেশের শ্রমবাজারে জায়গা করে নিতে পারছে না বাংলাদেশ। এতে অধরাই থেকে যাচ্ছে নতুন শ্রমবাজার। ফলে বাংলাদেশের শ্রমবাজার নিয়ে বড় ধরনের ঝুঁকি তৈরি হয়েছে।
সম্প্রতি মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধের কারণে প্রবাসী বাংলাদেশিরা অনিশ্চয়তার মধ্যে পড়েছেন। দেশের অর্থনীতির অন্যতম চালিকাশক্তি প্রবাস আয়। কিন্তু দক্ষ কর্মী তৈরিতে তেমন তৎপরতা আগের সরকারের পক্ষ থেকে দেখা যায়নি।
অভিবাসন বিশেষজ্ঞরা বলছেন, আমাদের শিক্ষাব্যবস্থায়ই বড় গলদ রয়েছে। পড়াশোনা মূলত সার্টিফিকেটনির্ভর। দেশে একাধিক কারিগরি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান গড়ে উঠলেও সেগুলো শিক্ষার্থীদের আকৃষ্ট করতে পারছে না। এগুলো মূলত ভবনসর্বস্ব মানহীন প্রতিষ্ঠানে পরিণত হয়েছে।
সম্প্রতি দেশে নতুন সরকার দায়িত্ব নিয়েছে। তাদের মুখে নয়, সত্যিকার অর্থে কারিগরি শিক্ষায় সর্বাধিক গুরুত্ব দিতে হবে। শিক্ষার্থীদের বাধ্যতামূলক কারিগরি শিক্ষার আওতায় আনতে হবে। তাহলে নতুন নতুন শ্রমবাজারের দ্বার উন্মুক্ত হবে। প্রবাস আয়েও বড় ধরনের সফলতা আসবে।
বাংলাদেশ জনশক্তি, কর্মসংস্থান ও প্রশিক্ষণ ব্যুরোর (বিএমইটি) তথ্য বিশ্লেষণ করে জানা যায়, ২০২৫ সালে ১১ লাখ ৩০ হাজার ৭৫৭ জন কর্মী বিদেশে গেছেন। এর মধ্যে মাত্র ৪ শতাংশ পেশাজীবী ও ২২ শতাংশ দক্ষ কর্মী। বাকি ৭৪ শতাংশই স্বল্প ও অদক্ষ কর্মী। ২০২৪ সালে ২৩.৬২ শতাংশ দক্ষ ও ৪.৫৯ শতাংশ পেশাজীবী বিদেশে গেছেন। ২০২৩ সালে ২৪ শতাংশ দক্ষ ও পেশাজীবী ছিল ৪.১৪ শতাংশ। ২০২২ সালে মোট জনশক্তির ২২.৭৩ শতাংশ দক্ষ ও ০.৩৪
শতাংশ ছিল পেশাজীবী। ২০২১ সালে বিদেশে যাওয়া মোট জনশক্তির ২১ শতাংশ দক্ষ ও ০.১৪ শতাংশ পেশাজীবী কর্মী। অর্থাৎ গত পাঁচ বছরের প্রতিবছরই বিদেশে যাওয়া কর্মীদের মধ্যে দুই-তৃতীয়াংশই স্বল্প ও অদক্ষ কর্মী।
ব্র্যাকের মাইগ্রেশন প্রোগ্রামের প্রধান শরিফুল হাসান বলেন, ‘সত্তরের দশকে মধ্যপ্রাচ্য দিয়ে আমাদের অভিবাসন যাত্রা শুরু। আমরা এখনো একই জায়গায় আটকে আছি। গত পাঁচ বছরে সৌদি আরবে আমাদের যে কর্মী ছিলেন, এখন এরচেয়ে অনেক বেড়েছে। কিন্তু ওই দেশ থেকে প্রবাস আয় বাড়েনি। এর প্রধান কারণ হচ্ছে আমরা অদক্ষ শ্রমিক পাঠাই। অন্যদিকে আমাদের শ্রমিকদের বিদেশে যাওয়ার খরচ সবচেয়ে বেশি। অথচ ভারত, ফিলিপিন্স, নেপালের দিকে তাকালে দেখা যাবে তারা কম খরচে দক্ষ শ্রমিক পাঠাচ্ছে, আয়ও বেশি করছে।’
শরিফুল হাসান বলেন, ‘আমাদের শিক্ষাব্যবস্থা সার্টিফিকেটনির্ভর। এখান থেকে বের হয়ে আসতে হবে। দেশে এখন নতুন সরকার। তাদের কারিগরি শিক্ষা বাধ্যতামূলক করতে হবে। শুধু দুর্বল শিক্ষার্থী নয়, সব শিক্ষার্থীকে কারিগরি শিক্ষার আওতায় আনতে হবে। আমাদের প্রশিক্ষণকেন্দ্র আছে, কিন্তু ভালো শিক্ষক ও যন্ত্রপাতি নেই। এতে শিক্ষার্থীরা যাচ্ছেন না। অথচ জাপান ও ইউরোপের দেশগুলোতে আমাদের বড় শ্রমবাজারের হাতছানি।’
বেসরকারি গবেষণাপ্রতিষ্ঠান রেফিউজি অ্যান্ড মাইগ্রেটরি মুভমেন্ট রিসার্চ ইউনিট (রামরু) বলছে, বাংলাদেশ মূলত আধা দক্ষ এবং স্বল্প দক্ষ শ্রমবাজারে অংশগ্রহণ করে। এর মধ্যে পেশাজীবী কর্মীদের সংখ্যা সব সময় খুব কম। বিএমইটি থেকে দেওয়া প্রশিক্ষণের গুণগত মান, সনদের স্বীকৃতির অভাব, প্রয়োজনীয় বাজেটের অভাব, জনবলের শূন্যতা ও জনশক্তি রপ্তানিকারক ব্যবসায়ীদের অনীহার কারণেই দক্ষ ও পেশাজীবী কর্মীর সংখ্যা বাড়ছে না।
বাংলাদেশ থেকে যেসব কর্মী বিদেশে কাজ করতে যায়, তাদের তিন ভাগে ভাগ করে বিএমইটি। এই তিন ভাগের মধ্যে রয়েছে পেশাজীবী, দক্ষ ও স্বল্প দক্ষ কিংবা অদক্ষ কর্মী। পেশাজীবী কর্মী বলতে ডাক্তার, প্রকৌশলী, আর্কিটেক্ট, শিক্ষক, অ্যাকাউন্ট্যান্ট, কম্পিউটার অপারেটর, ফার্মাসিস্ট, নার্স, ফোরম্যান, ডিপ্লোমা ইঞ্জিনিয়ার, প্যারামেডিক ও বিক্রয়কর্মীদের বোঝানো হয়।
এ ছাড়া মেকানিক, ওয়েল্ডার, ইলেকট্রিশিয়ান, রংমিস্ত্রি, পাচক, ড্রাইভার, প্লাম্বার, গার্মেন্ট শ্রমিক এবং সনদপ্রাপ্ত কেয়ারগিভাররা দক্ষ কর্মী হিসেবে বিবেচিত হন। আর কৃষক, মালি, দোকানপাটে সহায়ক, পরিচ্ছন্নতাকর্মী, গৃহকর্মী ও বিভিন্ন ধরনের সহায়তাকারী কর্মীদের স্বল্প দক্ষ কিংবা অদক্ষ কর্মী হিসেবে বিবেচনা করা হয়।
অভিবাসন বিশেষজ্ঞদের মতে, দক্ষ ও পেশাজীবী কর্মী বাড়ানোর জন্য দেশে কারিগরি প্রশিক্ষণকেন্দ্র বেড়েছে। এসব কেন্দ্রে প্রয়োজন মানসম্মত প্রশিক্ষক ও আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত সনদের প্রশিক্ষণ।
সম্প্রতি ইরানে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের হামলার পরিপ্রেক্ষিতে মধ্যপাচ্যের দেশগুলোতে থাকা মার্কিন ঘাঁটিতে পাল্টা হামলা চালাচ্ছে ইরান। এতে মধ্যপ্রাচ্যে অবস্থানরত প্রায় ৬০ লাখ বাংলাদেশি প্রবাসী চরম অনিশ্চয়তা ও আতঙ্কের মধ্যে দিন কাটাচ্ছেন। অনেকে জরুরি প্রয়োজনে দেশে ফিরতে পারছেন না। মধ্যপ্রাচ্যের আকাসসীমা বন্ধ বা সীমিত থাকায় অনেকে ছুটি শেষে যথাসময়ে ফিরতে পারছেন না। কারো কারো ভিসার মেয়াদ প্রায় শেষ হয়ে যাওয়ায় নতুন জটিলতা সৃষ্টি হয়েছে। এই যুদ্ধ দীর্ঘস্থায়ী হলে যাঁরা মধ্যপ্রাচ্যে অবস্থান করছেন তাঁদের প্রতিষ্ঠান বন্ধ হবে, তাঁরা চাকরিচ্যুত হবেন। নতুনদের সুযোগ কমে যাবে। এতে বাংলাদেশের গোটা শ্রমবাজার ঝুঁকিতে পড়ে রেমিট্যান্সে ধাক্কা খাবে।
বাংলাদেশের শ্রমবাজার যে এককেন্দ্রিক হয়ে গেছে, বিএমইটির গত বছরের পরিসংখ্যানে এর প্রমাণ মেলে। ২০২৫ সালে মোট অভিবাসীর ৬৭ শতাংশ, অর্থাৎ সাত লাখ ৫৪ হাজার ৩৬৯ জন সৌদি আরব গেছেন। এরপর যথাক্রমে ১০ শতাংশ, এক লাখ সাত হাজার ৫৯৬ জন কাতারে; ৬ শতাংশ, ৭০ হাজার ১৭৭ জন সিঙ্গাপুরে; ৪ শতাংশ, ৪২ হাজার ২৪১ জন কুয়েতে ও ৪ শতাংশের কাছাকাছি, ৪০ হাজার ১৩৯ জন গেছেন মালদ্বীপে।
এরপর ১৩ হাজার ৭৫২ জন গেছেন সংযুক্ত আরব আমিরাত (ইউএই), ১২ হাজার ৩০১ জন গেছেন জর্দান, ১২ হাজার ২৫১ জন গেছেন কম্বোডিয়ায়, ৯ হাজার ৩৬৫ জন গেছেন ইতালি ও ছয় হাজার ৬৫০ জন গেছেন কিরগিজস্তান। অর্থাৎ বেশির ভাগ কর্মীই অদক্ষ শ্রমিক হিসেবে মধ্যপ্রাচ্যে গেছেন।
জানা যায়, ইন্দোনেশিয়া, নেপাল, মায়ানমার, ফিলিপিন্স, থাইল্যান্ড ও ভিয়েতনাম থেকে দীর্ঘদিন ধরে কর্মী নিচ্ছে জাপান। এ তালিকায় ২০১৯ থেকে যুক্ত হয় বাংলাদেশ। জাপানের কম্পানিগুলো কর্মী খুঁজে পাচ্ছে না। শ্রমিকসংকট চরম আকার ধারণ করায় তারা বিশ্বের বিভিন্ন দেশের লোক চাইছে। শর্ত হচ্ছে, কর্মীদের জাপানি ভাষা জানা থাকতে হবে। এর পাশাপাশি যে পেশায় কাজ করতে চান, সেই দক্ষতা থাকতে হবে। আপাতত কেয়ারগিভার, ইন্ডাস্ট্রিয়াল প্যাকেজিং, ওয়েল্ডিং ও অটোমোবাইল মেকানিক খাতে বেশি লোক নিচ্ছে তারা। কিন্তু দক্ষতা না থাকায় সেই সুযোগ নিতে পারছে না বাংলাদেশ। গত সাত বছরে বেশ কিছু জাপানি ভাষা শিক্ষা কেন্দ্র গড়ে উঠলেও এখনো খুব বেশি সফলতা আসেনি। একই অবস্থা ইউরোপের বিভিন্ন দেশ ও কোরিয়ায়।
অভিবাসন বিশেষজ্ঞ আসিফ মুনীর বলেন, ‘অভিবাসনের ক্ষেত্রে আমরা শুধু সংখ্যাতত্ত্বের দিক দিয়েই বেশি জোর দিই। বর্তমান সরকারের ইশতেহারেও এক কোটি লোক বিদেশে পাঠানোর কথা আছে। কিন্তু আমরা যদি দক্ষ কর্মী পাঠাতে পারি, তাহলে কিন্তু কম লোক দিয়েও রেমিট্যান্স বাড়বে। অভিবাসন কূটনীতি বাড়াতে হবে। আমাদের যদি দক্ষ লোক থাকে, তাদের আন্তর্জাতিক সার্টিফিকেশন থাকে, তাহলে যাদের কর্মী দরকার তারাই খুঁজে নেবে। বিএমইটির যেসব প্রশিক্ষণকেন্দ্র আছে সেগুলোর আধুনিকায়ন করে ভাষা শিক্ষায় জোর দিতে হবে।’
সৌজন্যে কালের কণ্ঠ

