ভেনেজুয়েলায় আকস্মিক ও বিতর্কিত সামরিক অভিযানের রেশ কাটতে না কাটতেই মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের পরবর্তী লক্ষ্যবস্তু হিসেবে আলোচনায় উঠে এসেছে বিশাল আর্কটিক অঞ্চল গ্রিনল্যান্ড। ডেনমার্কের শাসনাধীন এই স্বায়ত্তশাসিত অঞ্চলটি নিয়ে হোয়াইট হাউসের ক্রমবর্ধমান আগ্রহ আর সামরিক পদক্ষেপের প্রচ্ছন্ন হুমকি আটলান্টিকের দুই পাড়ের দেশগুলোর মধ্যে এক নজিরবিহীন উত্তেজনার সৃষ্টি করেছে।
ডেনমার্কের প্রধানমন্ত্রী মেট ফ্রেডেরিকসেন জাতীয় ভাষণে ওয়াশিংটনকে কঠোর হুঁশিয়ারি দিয়ে বলেছেন, গ্রিনল্যান্ড বিক্রির জন্য নয়। যুক্তরাষ্ট্র যদি কোনো ন্যাটো মিত্রের ওপর সামরিক আক্রমণ চালায়, তবে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ পরবর্তী বিশ্ব নিরাপত্তা ব্যবস্থা এবং ন্যাটো জোটের অস্তিত্বই সংকটে পড়বে।
ড্যানিশ প্রধানমন্ত্রীর এই অবস্থান ইউরোপীয় দেশগুলোর মধ্যে মার্কিন বিরোধী অভূতপূর্ব ঐক্যের জন্ম দিয়েছে। ফ্রান্স, জার্মানি, ইতালি, ব্রিটেনসহ ইউরোপের প্রধান শক্তিগুলো যৌথ বিবৃতিতে জানিয়েছে, তারা সার্বভৌমত্ব এবং সীমানার অলঙ্ঘনীয়তা রক্ষায় বদ্ধপরিকর। আর্কটিক অঞ্চলের নিরাপত্তা রক্ষার বিষয়টি কোনো একক দেশের ইচ্ছা অনুযায়ী চলতে পারে না।
ট্রাম্প সম্প্রতি এয়ার ফোর্স ওয়ানে সাংবাদিকদের সাথে আলাপকালে পুনর্ব্যক্ত করেছেন, জাতীয় নিরাপত্তার স্বার্থে যুক্তরাষ্ট্রের জন্য গ্রিনল্যান্ড অত্যন্ত কৌশলগত একটি অঞ্চল। তিনি দাবি করেছেন, এই বিশাল দ্বীপটি বর্তমানে রুশ এবং চীনা জাহাজে ছেয়ে গেছে। ডেনমার্ক একাকী এই পরিস্থিতি সামাল দিতে সক্ষম নয়।
ট্রাম্পের এই দাবির পরপরই হোয়াইট হাউসের ডেপুটি চিফ অফ স্টাফ স্টিফেন মিলার সরাসরি জানিয়েছেন, গ্রিনল্যান্ডের যুক্তরাষ্ট্রের অংশ হওয়া উচিত। যদিও তিনি আপাতত সামরিক শক্তি প্রয়োগের সম্ভাবনা সরাসরি স্বীকার করেননি। তবে ডেনমার্কের অধিকার নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন। একই সময়ে ট্রাম্পের ঘনিষ্ঠ মহলের পক্ষ থেকে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে গ্রিনল্যান্ডের মানচিত্রের ওপর মার্কিন পতাকার ছবি পোস্ট করে ‘শীঘ্রই আসছে’ লিখে উসকানি দেওয়া হয়েছে। এই ধরণের প্রচারণাকে ডেনমার্ক এবং তার ইউরোপীয় মিত্ররা সরাসরি উসকানি এবং ন্যাটোর মূল নীতির পরিপন্থী হিসেবে দেখছে।
গত অক্টোবর মাসে গ্রিনল্যান্ড সফরে গিয়ে সিএনএন দেখেছে, ড্যানিশ সামরিক বাহিনীর নজিরবিহীন মহড়া চালাচ্ছে। ‘এক্সারসাইজ আর্কটিক লাইট’ নামক এই মহড়ায় ডেনমার্ক তাদের বিমান ও নৌবাহিনীর শক্তি প্রদর্শন করেছে। যার মূল উদ্দেশ্য ছিল ওয়াশিংটনকে আশ্বস্ত করা যে ডেনমার্ক নিজেই গ্রিনল্যান্ডের নিরাপত্তা রক্ষা করতে সক্ষম।
ড্যানিশ সামরিক কর্মকর্তারা মনে করেন, ইউক্রেন যুদ্ধের পর রাশিয়া এই অঞ্চলে তাদের নজরদারি বাড়াতে পারে এবং চীন ‘পোলার সিল্ক রোড’ তৈরির মাধ্যমে আর্কটিক অঞ্চলে প্রভাব বিস্তারের চেষ্টা করছে। তবে বর্তমানে গ্রিনল্যান্ডে কোনো প্রত্যক্ষ সামরিক হুমকি নেই। গ্রিনল্যান্ডের প্রতিকূল আবহাওয়া এবং দুর্গম ভূপ্রকৃতির কারণে এই দ্বীপটিকে জয় করা প্রায় অসম্ভব বলে মনে করেন সামরিক বিশেষজ্ঞরা। ডেনমার্ক মূলত ট্রাম্পের আগ্রাসী মনোভাব প্রশমিত করতেই এই বিশাল মহড়া পরিচালনা করেছিল। কিন্তু বর্তমান পরিস্থিতি বলছে সেই কৌশল খুব একটা কাজে আসেনি।
ভেনেজুয়েলায় সফল সামরিক অভিযানের পর ট্রাম্প প্রশাসন এখন অনেক বেশি আত্মবিশ্বাসী এবং বেপরোয়া। তারা মনে করছে, আর্কটিক অঞ্চলের নিয়ন্ত্রণ মার্কিন আধিপত্য বজায় রাখার জন্য অপরিহার্য।
অন্যদিকে, ন্যাটোর ভেতরে এই প্রথম এমন পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে। যেখানে এক সদস্য দেশ আরেক সদস্য দেশের ভূখণ্ড নিয়ে প্রকাশ্য দাবি তুলছে। ইউরোপীয় দেশগুলো এখন ভাবছে, যদি ওয়াশিংটন সত্যিই গ্রিনল্যান্ড দখলের চেষ্টা করে, তবে ন্যাটো জোটের নিরাপত্তা গ্যারান্টি বা ‘আর্টিকেল ফাইভ’ এর আর কোনো কার্যকারিতা থাকবে না।
গ্রিনল্যান্ড নিয়ে এই টানাপড়েন কেবল ভৌগোলিক সীমান্ত রক্ষার লড়াই নয় বরং এটি দীর্ঘস্থায়ী পশ্চিমা সামরিক জোটের ফাটল। সেই সঙ্গে বিশ্ব রাজনীতির এক নতুন মেরুকরণের দিকে ইঙ্গিত দিচ্ছে। ট্রাম্পের অনড় অবস্থান এবং ডেনমার্কের পিছু না হটার ঘোষণা গ্রিনল্যান্ডকে এখন বৈশ্বিক ভূ-রাজনীতির সবচেয়ে বিপজ্জনক কেন্দ্রে পরিণত করেছে।
গ্রিনল্যান্ডের এই অনিশ্চয়তা ইউরোপের প্রতিরক্ষা নীতিতে আমূল পরিবর্তনের সম্ভাবনা তৈরি করেছে। ডেনমার্কের কমান্ডাররা ব্যক্তিগতভাবে স্বীকার করেছেন , তাদের এই সামরিক তৎপরতা মূলত রাশিয়ার চেয়েও ট্রাম্পের হাত থেকে গ্রিনল্যান্ডকে রক্ষার একটি কূটনৈতিক বার্তা ছিল। কিন্তু ওয়াশিংটন এখন গ্রিনল্যান্ডের সম্পদ এবং কৌশলগত অবস্থানকে তাদের জাতীয় নিরাপত্তার জন্য অবিচ্ছেদ্য বলে মনে করছে। রাশিয়ার ক্রমবর্ধমান উপস্থিতি এবং চীনের আর্কটিক আকাঙ্ক্ষাকে অজুহাত হিসেবে ব্যবহার করে ট্রাম্প প্রশাসন তাদের সম্প্রসারণবাদী এজেন্ডা বাস্তবায়ন করতে চাইছে। এর ফলে কয়েক দশকের পুরনো আটলান্টিক মৈত্রী এখন খাদের কিনারে দাঁড়িয়ে আছে।

