ট্যাঙ্কার যুদ্ধের দুঃস্বপ্ন, হরমুজে ফের ডুববে মার্কিন আধিপত্য?

0
ট্যাঙ্কার যুদ্ধের দুঃস্বপ্ন, হরমুজে ফের ডুববে মার্কিন আধিপত্য?

হরমুজ প্রণালীর নীল জলরাশি বর্তমানে উত্তপ্ত রণক্ষেত্রে পরিণত হয়েছে। এই ঘটনা অনেক সামরিক বিশ্লেষককে আশির দশকের সেই ভয়াবহ ‘ট্যাঙ্কার যুদ্ধের’ স্মৃতি মনে করিয়ে দিচ্ছে। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প যখন এই গুরুত্বপূর্ণ জলপথে তেলবাহী জাহাজগুলোকে সুরক্ষা দিতে নৌবাহিনীর এসকর্ট পাঠানোর কথা ভাবছেন, তখন ইতিহাসবিদরা বলছেন এই দৃশ্যপট মোটেও নতুন নয়। প্রায় চার দশক আগে ঠিক এই একই জলসীমায় মার্কিন নৌবাহিনী এবং ইরানের ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কোর আইআরজিসি মুখোমুখি অবস্থানে দাঁড়িয়েছিল। সেই সময়কার সংঘাতের ক্ষত এবং শিক্ষা বর্তমান পরিস্থিতির জন্য অত্যন্ত প্রাসঙ্গিক। যেখানে একটি ছোট ভুল বড় ধরনের বিপর্যয়ের সূত্রপাত ঘটাতে পারে।

আশির দশকের সেই সংঘাতের বীজ বপন করা হয়েছিল মূলত ইরাক-ইরান যুদ্ধের মাধ্যমে। যখন ইরাকি নেতা সাদ্দাম হোসেন ইরানের অর্থনীতিকে পঙ্গু করতে তেলবাহী ট্যাঙ্কারের ওপর হামলা শুরু করেন। এর প্রতিক্রিয়ায় ইরানও পাল্টা ব্যবস্থা হিসেবে ইরাকের মিত্র দেশগুলোর বাণিজ্যিক জাহাজে আক্রমণ চালায়। পাল্টাপাল্টি এই হামলায় যখন পারস্য উপসাগর উত্তাল হয়ে ওঠে, তখন কুয়েত তাদের জাহাজগুলোর সুরক্ষার জন্য আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের সাহায্য প্রার্থনা করে। সোভিয়েত ইউনিয়ন প্রথম সাড়া দিলেও ওয়াশিংটন দ্রুত প্রভাব বিস্তারের লক্ষে কুয়েতি জাহাজগুলোকে মার্কিন পতাকাবাহী হিসেবে পুননিবন্ধিত করে এবং অপারেশন ‘আর্নেস্ট উইল’ এর অধীনে সুরক্ষা প্রদান শুরু করে।

এই অভিযানের শুরুতেই মার্কিন নৌবাহিনীকে চরম মূল্য দিতে হয়েছিল। সেই ঘটনা আজও ইতিহাসে এক ট্রাজেডি হিসেবে পরিচিত। ১৯৮৭ সালের মে মাসে ইউএসএস স্টার্ক নামক একটি মার্কিন যুদ্ধজাহাজ ইরাকি যুদ্ধবিমানের ছোড়া দুটি মিসাইলের আঘাতে লন্ডভন্ড হয়ে যায়। সেই হামলায় ৩৭ জন মার্কিন নাবিক প্রাণ হারান। যদিও ইরাক পরে এটিকে অনিচ্ছাকৃত ভুল হিসেবে বর্ণনা করে ক্ষমা চেয়েছিল। 

এই ঘটনা প্রমাণ করে যে যুদ্ধক্ষেত্রে উন্নত প্রযুক্তি থাকা সত্ত্বেও ভুল বোঝাবুঝির ফলে যেকোনো মুহূর্তে প্রাণঘাতী পরিস্থিতির সৃষ্টি হতে পারে যা বর্তমানের উত্তপ্ত পরিস্থিতিতেও সমভাবে প্রযোজ্য।

ট্যাঙ্কার যুদ্ধের অন্যতম লজ্জাজনক এবং সামরিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায় ছিল ব্রিজেটন নামক একটি বিশাল তেলের জাহাজের মাইন বিস্ফোরণে আক্রান্ত হওয়া। মার্কিন সুরক্ষায় থাকা সত্ত্বেও ইরানি মাইনের আঘাতে জাহাজটি ক্ষতিগ্রস্ত হলে পরিস্থিতি এমন দাঁড়ায় যে মার্কিন যুদ্ধজাহাজগুলোই উল্টো সেই বিশাল ট্যাঙ্কারের পেছনে আশ্রয় নেয়।

এর কারণ ছিল মার্কিন রণতরীগুলোর তুলনায় ওই বিশাল তেলের জাহাজের মাইন সহ্য করার ক্ষমতা বেশি ছিল। এই ঘটনাটি মার্কিন নৌবাহিনীর মাইন শনাক্তকরণ ও তা ধ্বংস করার সক্ষমতার সীমাবদ্ধতাকে বিশ্ব দরবারে উন্মোচিত করেছিল। বর্তমান প্রেক্ষাপটে একই উদ্বেগ ফিরে এসেছে।

সমুদ্রের তলদেশে লুকিয়ে থাকা এই অদৃশ্য মাইনগুলো আজও হরমুজ প্রণালিতে বড় আতঙ্ক হিসেবে কাজ করছে। যদিও বর্তমানের প্রযুক্তি অনেক উন্নত হয়েছে, তবুও ইরানের মাইন বিছানোর সক্ষমতা এবং কৌশলে বড় ধরনের পরিবর্তন এসেছে বলে বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন। 

বর্তমানে মার্কিন নৌবাহিনীতে মাইন পরিষ্কারকারী জাহাজের সংখ্যা আশঙ্কাজনকভাবে কম। কারণ, বিভিন্ন সময়ে বাজেট কর্তনের ফলে এই বিভাগটি অবহেলিত থেকেছে। মিত্র দেশগুলোর কাছ থেকে সাহায্য পাওয়ার আশা থাকলেও এখন পর্যন্ত কোনো শক্তিশালী দেশ সরাসরি তাদের হার্ডওয়্যার বা যুদ্ধজাহাজ পাঠানোর বিষয়ে সুনির্দিষ্ট প্রতিশ্রুতি দেয়নি। 

ইতিহাসের পাতায় ১৯৮৮ সালের ‘অপারেশন প্রেয়িং ম্যান্টিস’ একটি মাইলফলক হিসেবে পরিচিত। যেখানে যুক্তরাষ্ট্র এবং ইরানের মধ্যে সরাসরি এবং বিধ্বংসী নৌযুদ্ধ সংঘটিত হয়েছিল। ইউএসএস স্যামুয়েল বি রবার্টস নামক একটি যুদ্ধজাহাজ ইরানি মাইনে প্রায় দুই টুকরো হয়ে যাওয়ার পর আমেরিকা এই প্রতিশোধমূলক অভিযান চালায়। এটি ছিল দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর মার্কিন নৌবাহিনীর অন্যতম বৃহত্তম এবং আধুনিক মিসাইল বনাম মিসাইল যুদ্ধ। এই যুদ্ধের মাধ্যমে আমেরিকা বিশ্বকে তাদের সামরিক শ্রেষ্ঠত্বের জানান দিলেও বর্তমানের ২০২৬ সালের প্রেক্ষাপট অনেক বেশি জটিল ও বহুমুখী বলে মনে করা হচ্ছে।

বর্তমান পরিস্থিতিতে ইরানের হাতে কেবল প্রচলিত মিসাইল বা মাইন নেই বরং তারা এখন ড্রোন প্রযুক্তিতেও অত্যন্ত শক্তিশালী অবস্থানে রয়েছে। সমুদ্রের ওপর এবং নিচ দিয়ে চলাচলকারী সস্তা অথচ কার্যকর ড্রোনের বহর মার্কিন রণতরীগুলোর জন্য নতুন এক হুমকি হয়ে দাঁড়িয়েছে।

এছাড়া আশির দশকে ইরান যখন ইরাকের সাথে যুদ্ধে লিপ্ত ছিল, এখন তাদের সেই অভ্যন্তরীণ চাপ নেই বললেই চলে। যার ফলে তারা সম্পূর্ণ মনোযোগ হরমুজ প্রণালীর দিকে দিতে পারছে। সামরিক বিশ্লেষক কার্ল শুস্টার মনে করেন মাইন কেবল চলাচলে বাধা দেয় না বরং এটি নাবিক ও জাহাজ মালিকদের মধ্যে একটি তীব্র মনস্তাত্ত্বিক ভীতি তৈরি করে যা বিশ্ব বাজারে তেলের দাম অস্থির করে তুলতে পারে।

সূত্র: সিএনএন

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here