টেট্রিস গেইমে মিলতে পারে কষ্টদায়ক স্মৃতি কমানোর নতুন পথ

0
টেট্রিস গেইমে মিলতে পারে কষ্টদায়ক স্মৃতি কমানোর নতুন পথ

ক্লাসিক ভিডিও গেইম টেট্রিস খেলা মানসিক ট্রমা বা আঘাত পরবর্তী কষ্টদায়ক স্মৃতি কমাতে নতুন ও কার্যকর উপায় হতে পারে বলে উঠে এসেছে সাম্প্রতিক এক গবেষণায়।

গবেষকরা বলছেন, যেসব স্বাস্থ্যকর্মী তাদের চিকিৎসার অংশ হিসেবে এই পাজল গেইমটি খেলেছেন তাদের ক্ষেত্রে পুরানো ভয়াবহ স্মৃতির আকস্মিক উদয় বা ‘ফ্ল্যাশব্যাক’ ব্যাপকহারে কমেছে। এখন এ পদ্ধতিটিকে আরও বড় পরিসরে পরীক্ষা করতে আগ্রহী বিশেষজ্ঞরা। তাদের মতে, এ প্রক্রিয়াটি সহজলভ্য ও মানিয়ে নেওয়ার মতো।

ব্রিটিশ পত্রিকা ইন্ডিপেনডেন্ট প্রতিবেদনে লিখেছে, যুক্তরাজ্য ও সুইডেনের গবেষকদের পরিচালিত এ যৌথ গবেষণায় অংশ নিয়েছিলেন ৯৯ জন ব্রিটিশ স্বাস্থ্যকর্মী। তারা সবাই কোভিড-১৯ মহামারীর সময় মৃত্যু প্রত্যক্ষ করার মতো বিভিন্ন ট্রমার মুখে পড়েছিলেন। অংশগ্রহণকারীদের মধ্যে ৪০ জন ‘ইমেজারি কমপিটিং টাস্ক ইন্টারভেনশন’ বা আইসিটিআই নামের এক চিকিৎসা গ্রহণ করেছেন, যার মূল কাজ ধীরগতির টেট্রিস গেইম খেলা।

এ প্রক্রিয়ার সময় প্রথমে অংশগ্রহণকারীদের ট্রমার একটি স্মৃতি সংক্ষেপে মনে করতে বলা হয়। এরপর তাদের মনে মনে টেট্রিস গেইমের গ্রিড ও ওপর থেকে পড়ে যাওয়া বিভিন্ন ব্লক কল্পনা করতে বলেন গবেষকরা। গবেষণার ফলাফল বলছে, এ সহজ পদ্ধতিটি মানসিক আঘাতের প্রভাব কমাতে মূল্যবান হাতিয়ার হতে পারে।

আইসিটিআই পদ্ধতিটি মস্তিষ্কের ‘ভিসুওস্পেশিয়াল’ এলাকাকে ব্যস্ত রাখে। মস্কিষ্কের এ অংশটি দৃশ্যমান জায়গা বা বস্তুর অবস্থান বুঝতে সাহায্য করে। এর ফলে যন্ত্রণাদায়ক বিভিন্ন স্মৃতির উজ্জ্বলতা বা স্পষ্টতা কমে আসে। উপসালা ইউনিভার্সিটি’র মনোবিজ্ঞানের অধ্যাপক ও এ গবেষণার প্রধান এমিলি হোমস বলেছেন, অতীতের কোনো ট্রমার সামান্য স্মৃতিও দৈনন্দিন জীবনে শক্তিশালী প্রভাব ফেলতে পারে, যা মানুষের মনোযোগ কেড়ে নেয় এবং অনিচ্ছাকৃত ও কষ্টদায়ক বিভিন্ন আবেগের কাছে মানুষকে অসহায় করে ফেলে। এ সংক্ষিপ্ত দৃশ্যমান পদ্ধতির মাধ্যমে স্মৃতির যন্ত্রণাদায়ক অংশটি দুর্বল হয়ে যায়, ফলে মানুষের মনে ট্রমার পুরানো বিভিন্ন ছবি বারবার ভেসে ওঠা কমে যায়।

এ গবেষণায় অংশ নেওয়া অন্যান্য রোগীদের মানসিক চাপ কমানোর জন্য মোৎসার্টের সংগীত ও তার ওপর তৈরি পডকাস্ট শোনানো হয়েছিল এবং তাদের প্রচলিত সাধারণ চিকিৎসা দিয়েছিলেন গবেষকরা। গবেষণার ফলাফল প্রকাশ পেয়েছে বিজ্ঞানভিত্তিক ম্যাগাজিন ‘ল্যানসেট সাইকিয়াট্রি’তে। এ গবেষণায় চার সপ্তাহের মধ্যে দেখা গেছে, যারা টেট্রিস বা আইসিটিআই চিকিৎসা নিয়েছেন তাদের ক্ষেত্রে অন্য দলের তুলনায় ফ্ল্যাশব্যাক বা পুরানো স্মৃতি ফিরে আসার হার ৯০ শতাংশ কমেছে।

এর ছয় মাস পর প্রায় ৭০ শতাংশ অংশগ্রহণকারী বলেছেন, তাদের মনে আর কোনো যন্ত্রণাদায়ক স্মৃতি ফিরে আসছে না। এ পদ্ধতিটি ‘পোস্ট-ট্রমাটিক স্ট্রেস ডিসঅর্ডার’ বা পিটিএসডি’র বিভিন্ন উপসর্গ কমাতেও সাহায্য করেছে। অধ্যাপক হোমস বলেছেন, এ পদ্ধতিটি যে কাজ করে তা প্রমাণ করতে পেরে আমরা অত্যন্ত আনন্দিত। বিষয়টি কেবল টেট্রিস খেলা নয়, বরং পদ্ধতিটি ব্যবহার করা সহজ মনে হলেও তা তৈরি এবং পরিমার্জনের প্রক্রিয়াটি ছিল বেশ জটিল।

তিনি আরও জানান, পদ্ধতিটি শব্দের বদলে আমাদের মানসিক কল্পচ্ছবির ওপর কাজ করে। প্রক্রিয়াটিকে এমনভাবে তৈরি করা হয়েছে যেন তা অত্যন্ত সহজ, সংক্ষিপ্ত ও কার্যকর হয়। যাতে মানুষ তাদের ব্যস্ত জীবনের ফাঁকেই গেইমটি খেলতে পারেন। আমরা এ গবেষণাকে আরও বড় পরিসরে নিয়ে যেতে চাই, যাতে বিভিন্ন ধরনের মানুষ ও পরিস্থিতির ক্ষেত্রে এর কার্যকারিতা পরীক্ষা করে তা প্রয়োগ করা সম্ভব হয়।

‘ইউনিভার্সিটি অফ কেমব্রিজ’-এর ইনটেনসিভ কেয়ার মেডিসিনের অধ্যাপক শার্লট সামার্স বলেছেন, গোটা বিশ্বের স্বাস্থ্যকর্মীরা প্রতিদিন তাদের কাজের প্রয়োজনে বিভিন্ন ট্রমাটিক ঘটনার মুখে পড়েন। যারা আমাদের অসুস্থতায় সেবা দেন এসব ঘটনা তাদের মানসিক ও শারীরিক সুস্থতার ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলে। বিশ্বজুড়ে স্বাস্থ্যসেবা ব্যবস্থা যখন চরম চাপের মধ্যে রয়েছে তখন স্বাস্থ্যকর্মীদের মানসিক স্বাস্থ্যের উন্নতির জন্য এ ডিজিটাল সমাধান খুঁজে পাওয়া সত্যিই এক রোমাঞ্চকর পদক্ষেপ।

এখন আরও বড় ও বৈচিত্র্যময় জনগোষ্ঠীর ওপর এই পদ্ধতিটি পরীক্ষার উপায় খুঁজছে গবেষক দলটি। এ ছাড়া, গেইমটির এমন সংস্করণ তৈরির কথাও ভাবছেন তারা, যা কোনো বিশেষজ্ঞের নির্দেশনা ছাড়াই সাধারণ মানুষ নিজে নিজে ব্যবহার করতে পারবেন।

তথ্য সূত্র – ইউনিভার্সিটি অব অক্সফোর্ড।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here