ছোট্ট শহর থেকে বিশ্বমঞ্চে, গিনেস রেকর্ড —আশার জীবনের অজানা অধ্যায়

0
ছোট্ট শহর থেকে বিশ্বমঞ্চে, গিনেস রেকর্ড —আশার জীবনের অজানা অধ্যায়

ভারতীয় সঙ্গীত জগতের এক অত্যন্ত উজ্জ্বল নক্ষত্র আশা ভোঁসলে, যাঁর কণ্ঠের জাদুতে বুঁদ হয়ে রয়েছে প্রজন্মের পর প্রজন্ম। আজ রবিবার ৯২ বছর বয়সে মুম্বইয়ের ব্রেচ ক্যান্ডি হাসপাতালে তাঁর প্রয়াণে শোকস্তব্ধ সংগীত প্রেমীরা। মাত্র ১০ বছরে গানের ক্যারিয়ার শুরু আট দশকেরও বেশি দীর্ঘ বর্ণাঢ্য সংগীত জীবনে প্রায় এক ডজন ভাষায় ১২ হাজারেরও বেশি গান গেয়ে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করেছিলেন এক অনন্য উচ্চতায়। তাঁর গাওয়া বহু গান আজও সমান জনপ্রিয়।

১৯৩৩ সালের ৮ সেপ্টেম্বর মহারাষ্ট্রের সাংলি জেলায় এক সঙ্গীত পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন আশা ভোঁসলে। তাঁর জন্মনাম আশা মঙ্গেশকর। তাঁর পিতা দীনানাথ মঙ্গেশকর ছিলেন মারাঠি নাট্যজগতের পরিচিত মুখ ও শাস্ত্রীয় সঙ্গীতশিল্পী। ছোটবেলা থেকেই সুরের আবহে বেড়ে ওঠা আশার সঙ্গীতযাত্রা শুরু হয় ১৯৪৩ সাল থেকে।

হিন্দি চলচ্চিত্রে নেপথ্য সঙ্গীত গাওয়ার জন্য তিনি বিশেষভাবে খ্যাতি অর্জন করলেও, তাঁর কণ্ঠ ছড়িয়ে পড়েছিল ভারতের নানা ভাষার গান ও অ্যালবামে। বহুমুখী প্রতিভা, অনন্য কণ্ঠ ও পরীক্ষামূলক গায়নশৈলীর জন্য তিনি গণমাধ্যমে হিন্দি চলচ্চিত্রের অন্যতম প্রভাবশালী শিল্পী হিসেবে স্বীকৃতি পান।

১০ বছর বয়সেই জীবনযুদ্ধ শুরু
আশা ভোঁসলের সঙ্গীত জীবনের শুরুটা হয়েছিল নেহাতই বাধ্যবাধকতায়। ১৯৪৩ সালে মাত্র ১০ বছর বয়সে মারাঠি ছবি ‘মাজহা বাল’-এর জন্য তিনি প্রথম গান রেকর্ড করেন। বাবার অকালপ্রয়াণের পর পরিবারের আর্থিক হাল ধরতে বড় দিদি লতা মঙ্গেশকরের সঙ্গে কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে খুব অল্প বয়সেই পেশাদার গায়িকা হিসেবে যাত্রা শুরু করতে হয়েছিল তাঁকে।

গিনেস বুক অফ ওয়ার্ল্ড রেকর্ডস
২০১১ সালে আশা ভোঁসলেকে বিশ্বের সবচেয়ে বেশি গান রেকর্ড করা শিল্পী হিসেবে স্বীকৃতি দেয় গিনেস বুক অফ ওয়ার্ল্ড রেকর্ডস। ১৯৪৭ সাল থেকে হিসাব করলে ২০টিরও বেশি ভারতীয় ভাষায় প্রায় ১১ হাজারেরও বেশি একক, দ্বৈত এবং কোরাস গান গেয়েছেন তিনি। সঙ্গীত জগতের ইতিহাসে এই সংখ্যা কার্যত অতুলনীয়।

আন্তর্জাতিক মঞ্চে গ্র্যামি মনোনয়ন
ভারতীয় গায়িকাদের মধ্যে আন্তর্জাতিক স্তরে সফল হওয়ার নজির আশার ঝুলিতেই প্রথম জমা হয়। ১৯৯৭ সালে আলি আকবর খানের সঙ্গে তাঁর ‘লিগ্যাসি’ অ্যালবামটি এবং ২০০৬ সালে ক্রোনোস কোয়ার্টেটের সঙ্গে ‘ইউ হ্যাভ স্টোলেন মাই হার্ট’ অ্যালবামটি বিশ্ববিখ্যাত গ্র্যামি অ্যাওয়ার্ডের জন্য মনোনীত হয়েছিল।

ক্রিকেট তারকার সঙ্গে গান
গানের জগতে সীমানা মানতে চাননি তিনি কোনওদিনই। এমনকি অস্ট্রেলিয়ার প্রাক্তন ফাস্ট বোলার ব্রেট লি-র সঙ্গেও গলা মিলিয়েছেন আশা। আইসিসি চ্যাম্পিয়ন্স ট্রফির সময় ব্রেট লি-র লেখা ‘ইউ আর দ্য ওয়ান ফর মি’ গানটি ব্যাপক জনপ্রিয়তা পেয়েছিল। এই জুটি ভারতীয় এবং আন্তর্জাতিক মহলে সাড় ফেলে দেয়।

দাদাসাহেব ফালকে ও পদ্মবিভূষণ
দীর্ঘ কর্মজীবনের স্বীকৃতি স্বরূপ অজস্র সম্মান পেয়েছেন তিনি। ২০০০ সালে ভারত সরকার তাঁকে চলচ্চিত্র জগতের সর্বোচ্চ সম্মান ‘দাদাসাহেব ফালকে’ পুরস্কারে ভূষিত করে। এর ঠিক আট বছর পর ২০০৮ সালে তত্কালীন রাষ্ট্রপতি প্রতিভা পাটিলের হাত থেকে তিনি দেশের দ্বিতীয় সর্বোচ্চ নাগরিক সম্মান ‘পদ্মবিভূষণ’ গ্রহণ করেন।

বিদেশে নিজের রেস্তোরাঁ চেইন
সঙ্গীতের পাশাপাশি রান্নার প্রতিও অগাধ টান ছিল আশার। সেই ভালবাসাকেই পেশাদার রূপ দিয়েছেন তিনি। সংযুক্ত আরব আমিরশাহি, কুয়েত, বাহারিনের পাশাপাশি বিলেতের বার্মিংহাম বা ম্যাঞ্চেস্টারের মতো শহরেও রমরমিয়ে চলছে তাঁর রেস্তোরাঁ ‘আশা’স’। মূলত উত্তর ভারতীয় খাবারের সঙ্গে ঘরোয়া স্বাদ মিশিয়েই ভোজনরসিকদের মন জয় করছেন তিনি।

মাদাম তুসোর মিউজিয়ামে স্থান
দিল্লির মাদাম তুসো মিউজিয়ামে আশা ভোঁসলের একটি পূর্ণাবয়ব মোমের মূর্তি রয়েছে। মিউজিক জোনে মাইকেল জ্যাকসনের মতো বিশ্ববিখ্যাত তারকাদের মূর্তির পাশেই রাখা হয়েছে তাঁকে। ১৫০টিরও বেশি নিখুঁত পরিমাপ এবং কয়েক হাজার ছবির রেফারেন্স নিয়ে তৈরি করা হয়েছে এই প্রাণবন্ত মূর্তিটি।

এদিকে, একজন গায়িকা হিসেবে আশা ভোঁসলের জীবনটা আলোঝলমলে থাকলেও আড়ালের জীবনটা ছিল গাঢ় অন্ধকারে ভরা; জীবনজুড়ে দুঃসহ যন্ত্রণার সঙ্গে লড়াই করেছেন তিনি। ‘আশা ভোঁসলে : আ লাইফ ইন মিউজিক’ বইয়ে জীবনের অজানা অধ্যায় নিয়ে অকপটে সব বলে গেছেন এই সংগীতশিল্পী। জীবনীতে আশার কোনো রাখঢাক ছিল না। যন্ত্রণাদায়ক দাম্পত্য থেকে আত্মহত্যার চেষ্টা—সবই বলে গেছেন আশা।

স্বামীর নির্যাতনের শিকার
অল্প বয়সে গণপতরাও ভোঁসলেকে বিয়ে করেন আশা। স্বামীর সঙ্গে বয়সের ব্যবধান ছিল প্রায় ২০ বছর। কিন্তু এই সম্পর্ক কোনো রূপকথার মতো ছিল না। বইটিতে উঠে এসেছে ভয়াবহ কিছু তথ্য। সেখানে উল্লেখ করা হয়েছে, ‘শোনা যায়, গণপতরাও মদ্যপ ছিলেন এবং প্রায়ই স্ত্রীকে মারধর করতেন—এমনকি গর্ভাবস্থায়ও, যার ফলে তাঁকে প্রায়ই হাসপাতালে ভর্তি হতে হতো।’

নিজের অভিজ্ঞতা জানাতে গিয়ে আশা বলেন, পরিবারটি ছিল রক্ষণশীল, তারা গায়িকা পুত্রবধূকে মেনে নিতে পারেনি। স্বামী সম্পর্কে তিনি বলেন, ‘আমার স্বামীর মেজাজ খারাপ ছিল। হয়তো তিনি কষ্ট দিতে পছন্দ করতেন, হয়তো তিনি স্যাডিস্ট ছিলেন। কিন্তু বাইরে কেউ তা জানতে পারত না। আমি তাঁকে সম্মান দিতাম, কখনো তাঁর কাজ নিয়ে প্রশ্ন তুলিনি।’

আত্মহত্যার চেষ্টা
জীবনীতে আশা ভোঁসলে জানান, তৃতীয় সন্তান গর্ভে থাকাকালে তিনি আত্মহত্যার চেষ্টা করেছিলেন। আশা বলেন, ‘একবার মনে হয়েছিল, আমার নিজের জীবন শেষ করে দেওয়া উচিত। আমি অসুস্থ ছিলাম। চার মাসের অন্তঃসত্ত্বা অবস্থায় হাসপাতালে ছিলাম, যেখানে পরিস্থিতি খুবই খারাপ ছিল।’

নিজের মানসিক অবস্থার বর্ণনা দিতে গিয়ে আশা বলেন, ‘মনে হয়েছিল যেন নরকে এসে পড়েছি। মানসিক যন্ত্রণায় ছিলাম। তাই ঘুমের ওষুধ খেয়ে ফেলেছিলাম। কিন্তু গর্ভের সন্তানের প্রতি ভালোবাসা এতটাই প্রবল ছিল যে আমি মারা যাইনি। আমাকে আবার জীবনে ফিরিয়ে আনা হয়।’

আশার ব্যক্তিগত জীবনে ছিল নানা বাঁক। মাত্র ১৬ বছর বয়সে গণপতরাও ভোঁসলেকে বিয়ে করলেও সেই সম্পর্ক সুখের হয়নি। পরবর্তীতে ১৯৮০ সালে তিনি বিখ্যাত সঙ্গীত পরিচালক রাহুল দেব বর্মণকে বিয়ে করেন।

তবে তিনি ব্যক্তিজীবনকে ছাপিয়ে বহু চড়াই-উৎরায় নিজের কণ্ঠের বৈচিত্র্য এবং অদম্য প্রাণশক্তি দিয়ে বিশ্ব সঙ্গীতের ইতিহাসে এক অপরিহার্য নাম হয়ে ওঠেন। কেবল ভারত নয়, আন্তর্জাতিক সংগীতের ইতিহাসেও চিরস্মরণীয় হয়ে থাকবেন আশা ভোঁসলে।

সূত্র : দ্য ওয়াল ও দ্য ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here