আমাদের বিদ্যমান গ্যাসক্ষেত্রগুলো থেকে গ্যাস উৎপাদন বৃদ্ধি করাই সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার হওয়া উচিত। বিভিন্ন ক্ষেত্রেই গ্যাসের মজুদ থাকার কথা বলা হচ্ছে, কিন্তু সেই মজুদ নিরূপণ কতটুকু সঠিক, তা আমরা নিশ্চিত নই। যদি মজুদ নিরূপণ সঠিকও হয়, তাহলে প্রশ্ন উঠছে, সেসব মজুদ কেন উৎপাদনে রূপান্তর করা যাচ্ছে না? কূপগুলোতে অতিরিক্ত গ্যাস পাওয়ার কথা বলা হলেও মূলত মোট উৎপাদন বাড়ছে না। কারণ একদিকে অনেক কূপ থেকে উৎপাদন কমছে, অন্যদিকে নতুন কূপ খনন বা পুনঃখননের মাধ্যমে যে বৃদ্ধি আসছে, তা সেই ক্ষতি জুড়তে পারছে না।
পেট্রোবাংলা ও বাপেক্স বিভিন্ন পরিকল্পনা নিয়েছে। একসময় ৫৮টি নেওয়া হলেও বর্তমানে ১০৮টি কূপ খননের পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে। কিন্তু এসবের ফলে মোট উৎপাদন বৃদ্ধির বদলে আমরা যে আংশিক সাফল্য পাচ্ছি, তা টেকসই হচ্ছে না। এর মানে হতে পারে—(ক) যেটা মজুদ বলা হচ্ছে, বাস্তবে তার তুলনায় কম থাকতে পারে, অথবা (খ) মজুদ থাকলেও আমরা সেই মজুদ থেকে স্থায়ীভাবে উৎপাদন বাড়াতে ব্যর্থ হচ্ছি।
আমার মতে, এর পেছনে মূলত তিনটি ঘাটতি কাজ করছে—বিনিয়োগের অভাব, আধুনিক প্রযুক্তির অভাব এবং জ্ঞান ও দক্ষতার অভাব। বিশেষ করে ইঞ্জিনিয়ারিং ও অপারেশনাল ক্ষেত্রে আমাদের অভিজ্ঞতার ঘাটতি স্কষ্ট দেখা যায়।
এই সমস্যাগুলো সমাধানের জন্য কয়েকটি পদক্ষেপ জরুরি—
১. আন্তর্জাতিক কনসাল্টিং ও রিজার্ভ ম্যানেজমেন্ট ফার্ম নিয়োগ : আন্তর্জাতিক অভিজ্ঞতা ও প্রযুক্তি নিয়ে এমন কোনো কনসাল্টিং ফার্মকে কন্ট্রাকচুয়াল টাস্ক হিসেবে নিয়োগ দেওয়া উচিত, যারা আমাদের ক্ষেত্রগুলোর ব্যাপক পুনর্বিন্যাস ও পুনর্মূল্যায়ন করে বাস্তবসম্মত রোডম্যাপ দেবে, কোন কূপগুলো পুনঃখনন করা উচিত, কোনগুলো উন্নত প্রযুক্তি প্রয়োগে কার্যকর হবে ইত্যাদি। এই কনসালট্যান্টদের মাধ্যমে একটি সময় নির্ধারিত ও ফলাফলকেন্দ্রিক কার্যক্রম নির্ধারণ করা সম্ভব হবে।
২. ছোট ও মধ্যম আকারের স্তরগুলো কাজে লাগানো : বড় স্তরের ওপরে থাকা ছোট ছোট গ্যাসস্তরগুলোকে দ্রুত উৎপাদনে আনার পথ খুঁজতে হবে; এগুলোকে উপেক্ষা করলে বড় উৎপাদন দক্ষতা মিস হবে।
৩. ছাতক ক্ষেত্রের সম্ভাব্যতা যাচাই ও উন্নয়ন : ছাতক অঞ্চলে আগে দু-তিনটি ব্লো-আউট ছিল; তবে ধারণা আছে সেখানে প্রায় এক টিসিএফ পর্যন্ত গ্যাস থাকতে পারে। যথাযথ সিজিবি, টেকনিক্যাল মূল্যায়ন ও প্রযুক্তি প্রয়োগে এই ক্ষেত্রকে উৎপাদনে আনা সম্ভব; এবং তা উল্লেখযোগ্য অবদান রাখতে পারে। অবশ্যই এ কাজ সময়সাপেক্ষ এবং সুনির্দিষ্ট পরিকল্পনা প্রয়োজন।
৪. অনুসন্ধান কার্যক্রম ত্বরান্বিত করা : নতুন ক্ষেত্র আবিষ্কার ও লাইসেন্সিং প্রক্রিয়া দ্রুত ও স্বচ্ছভাবে পরিচালনা করা দরকার।
অনশোর ও অফশোর উভয়েই সমন্বিত অনুসন্ধান প্রয়োজন। যদিও বিশ্ববাজারে তেল-গ্যাসের মূল্য ওঠানামায় আছে এবং অংশগ্রহণকারী পাওয়া কঠিন হতে পারে, তবু খোলামেলা লাইসেন্সিং রেখে প্রাতিষ্ঠানিক বাধাসমূহ কমানো উচিত।
৫. প্রস্তাব বিচার ও নীতিগত স্বচ্ছতা : আন্তর্জাতিক কোম্পানিগুলো যদি উৎপাদন বৃদ্ধির প্রস্তাব দেয় (যেমন—শেভরনের মতো), সেগুলোকে অযথা বাতিল না করে যথাযথভাবে মূল্যায়ন করা আবশ্যক। জানতে পেরেছি, শেভরনের নতুন প্রস্তাব মন্ত্রণালয় নাকচ করেছে। তা কেন নাকচ করেছে, এ ব্যাপারে পরিষ্কার ব্যাখ্যা ও বিবেচনা থাকা উচিত; কারণ ক্রান্তিকালীন সিদ্ধান্তগুলো আরো সতর্ক ও যুক্তিসংগত হতে হবে।
গত কয়েক বছরে বারবার কূপসংখ্যা ও পরিকল্পনা বদল হওয়া সত্ত্বেও স্থায়ীভাবে উৎপাদন বাড়েনি। আমরা যদি একই পথ অবিরত রাখি, তাতে ফল পরিবর্তন হবে না। অতএব, বাইরে থেকে দক্ষতা ও প্রযুক্তি আনা, বিনিয়োগ বাড়ানো, ছোট স্তরগুলো কাজে লাগানো, অনুসন্ধান ত্বরান্বিত করা এবং প্রস্তাব নিরীক্ষায় স্বচ্ছতা রাখা—এগুলো দ্রুত ও প্রাথমিকভাবে গ্রহণ করা উচিত।
শিল্পে প্রবৃদ্ধি ও রপ্তানি বৃদ্ধিতে নিরবচ্ছিন্ন গ্যাস সরবরাহ : আমাদের দেশীয় দীর্ঘমেয়াদি শিল্প প্রবৃদ্ধি এবং রপ্তানি বাড়াতে নিরবচ্ছিন্ন গ্যাস সরবরাহ একেবারেই অপরিহার্য। শিল্প খাতে যেভাবেই হোক নিরবচ্ছিন্ন গ্যাস দিতে হবে, এটা এখন অত্যন্ত জরুরি। কিন্তু আমরা দেখতে পাচ্ছি, দেশীয় গ্যাস উৎপাদনে আমরা ব্যর্থ হচ্ছি এবং উৎপাদন ধীরে ধীরে কমে আসছে। বিশেষ করে বিবিয়ানা গ্যাসক্ষেত্র থেকে প্রায় ৫০ শতাংশ গ্যাস আসে, সেখানেও উৎপাদন কমে যাচ্ছে। যেকোনো সময় ২০০ থেকে ৩০০ মিলিয়ন ঘনফুট উৎপাদন কমে গেলে আমাদের নিজস্ব গ্যাস উৎপাদন এক ধরনের বড় বিপর্যয়ের মুখে পড়বে।
এই প্রেক্ষাপটে আমি মনে করি, শেভরনের যেসব প্রস্তাব ছিল, সেগুলো আরো গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করে সঠিকভাবে নেগোশিয়েট করা উচিত ছিল। কোনো আপত্তি থাকলে আলোচনার মাধ্যমে সমাধান করে তাদের সুযোগ দেওয়া যেত। আর বিকল্প যেটা আগের সরকার ভেবেছিল, এলএনজি আমদানি করে সক্ষমতা বাড়ানো হবে, সেটাও পিছিয়ে গেছে। কারণ দুটি নতুন ভাসমান এলএনজি টার্মিনালের মধ্যে একটি সামিটের, যেটা কোর্টে চলে গিয়ে বন্ধ হয়ে গেছে। আর মার্কিন কম্কানি এক্সেলারেটকে যেটা দেওয়া হয়েছিল, সেটা শুধু একটি এমওইউ পর্যায়ে ছিল, সেটিও বাতিল হয়েছে। এখন সরকার আরো নতুন এফএসআরইউ আনার চেষ্টা করছে, কিন্তু এরই মধ্যে আমরা পিছিয়ে পড়েছি। সামিটের প্রকল্পটি থাকলে হয়তো ২০২৬ সালের শেষ দিকেই আমরা নতুন করে এলএনজি আমদানি বাড়াতে পারতাম।
এ অবস্থায় স্বল্পমেয়াদি বিকল্প হলো, যেখানে এখন গ্যাস সরবরাহ হচ্ছে, সেখান থেকে কিছু গ্যাস পুনর্বণ্টন করা। প্রথমেই আসে সিএনজি খাত। সিএনজির বিকল্প হিসেবে এলপিজি আছে। দেশের এলপিজির অবকাঠামো শক্তিশালী চাহিদা বাড়ালেই তা দ্রুত সম্ক্রসারণ সম্ভব। তাই সিএনজির জন্য গ্যাস সম্কূর্ণ বন্ধ না করে গ্যাসের মূল্য আন্তর্জাতিক আমদানি সমমান অর্থাৎ মার্কেট প্রাইসে নিয়ে গেলে মানুষ স্বাভাবিকভাবেই এলপিজিতে চলে যাবে।
বসতবাড়িতে এখন প্রায় ১২ শতাংশ গ্যাস ব্যবহৃত হয়। আমি মনে করি, সেগুলোর মূল্যও আমদানীকৃত গ্যাসের সমপর্যায়ে নিয়ে যেতে হবে। এতে যারা মিটারে গ্যাস ব্যবহার করতে চাইবে, তারা যতটুকু ব্যবহার করবে ততটুকুই বিল দেবে। এতে তাদের মোট খরচ বর্তমানের ১০০০ থেকে ১১০০ টাকার কাছাকাছি থাকতে পারে, বা কাউকে হয়তো ১৫০০ থেকে ২০০০ টাকা পর্যন্ত দিতে হতে পারে ব্যবহার অনুযায়ী। কারণ বসতবাড়িতে পুরোপুরি গ্যাস বন্ধ করে দেওয়া বাস্তবসম্মত নয়।
এদিকে বিদ্যুৎ উৎপাদনের ক্ষেত্রে যদি আমরা আরো বেশি কয়লাভিত্তিক উৎপাদন ব্যবহার করতে পারি, এবং রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের ২৪০০ মেগাওয়াট যোগ হয়, তাহলে বিদ্যুৎ উৎপাদনে গ্যাসের ওপর নির্ভরতা কমবে। পুরনো গ্যাসভিত্তিক কেন্দ্রগুলো আংশিকভাবে বন্ধ রেখে নতুন কার্যকর কেন্দ্রগুলোতে সীমিত গ্যাস সরবরাহের ব্যবস্থা করা যেতে পারে। এর পাশাপাশি গ্যাস উৎপাদন বাড়ানোর প্রচেষ্টা তো চলতেই হবে।
জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিতকরণ : দেশে দীর্ঘ মেয়াদে জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে আমাদের ফোকাস অবশ্যই নবায়নযোগ্য জ্বালানির দিকে বাড়াতে হবে। কিন্তু এটা মাথায় রাখতে হবে, বাংলাদেশের জ্বালানি সমস্যা শুধু নবায়নযোগ্য দিয়ে কখনোই পুরোপুরি সমাধান করা সম্ভব নয়। কোনো দিনই পুরো দেশ শতভাগ নবায়নযোগ্য জ্বালানি দিয়ে চলবে না। তবে আমরা যত বেশি নবায়নযোগ্য জ্বালানি ব্যবহার করতে পারব, তত বেশি আমাদের ফসিল ফুয়েল ও আমদানিনির্ভর জ্বালানির ওপর নির্ভরশীলতা কমবে। নির্ভরশীলতা যত কমবে, জ্বালানি নিরাপত্তা তত বাড়বে। এ জন্য নবায়নযোগ্য জ্বালানির ক্ষেত্রে দৃঢ় পদক্ষেপ নিয়ে আমাদের ব্যাপকভাবে এগিয়ে যেতে হবে। কোন কোন ক্ষেত্রে করা যেতে পারে, তা অনেক দীর্ঘ আলোচনা, তবে কয়েকটি উদাহরণ দিচ্ছি। কৃষি খাতে করা সম্ভব, যেমন—পাকিস্তানে এখন ইরিগেশন প্রায় পুরোটা সোলারচালিত। সোলার পানির ব্যবহার সেখানে দ্রুত বেড়েছে। বাংলাদেশেও একই মডেল প্রয়োগ সম্ভব বলে আমি মনে করি।
ইন্ডাস্ট্রি সেক্টরেও বিশাল সম্ভাবনা : ইন্ডাস্ট্রির ছাদগুলো রুফটপ সোলারের জন্য অত্যন্ত কার্যকর। আজকেও আমি একটি বড় শিল্প গ্রুপে প্রায় ৬০ মেগাওয়াট রুফটপ সোলার বসানো দেখেছি। বহু বড় কম্কানি তাদের কারখানায় রুফটপ সোলার স্থাপন করছে, এটা ভবিষ্যতের জন্য খুবই ভালো লক্ষণ। তবে শুধু রুফটপ নয়, বড় আকারে গ্রিড সংযুক্ত নবায়নযোগ্য বিদ্যুৎ উৎপাদনও সম্ভব।
বাংলাদেশের জ্বালানি কাঠামোতে দীর্ঘমেয়াদি কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্র রয়েছে ২৫ বছরের চুক্তিতে ৮০০০ থেকে ৯০০০ মেগাওয়াট সক্ষমতার। এ ছাড়া আরো প্রায় ৮০০০ মেগাওয়াট গ্যাসভিত্তিক বিদ্যুতের ২০ বছরের চুক্তিও রয়েছে। এসব বিবেচনা করে আমাদের এমন একটি দীর্ঘমেয়াদি রোডম্যাপ করতে হবে, যেখানে নতুন সব সংযোজনই নবায়নযোগ্য জ্বালানির মাধ্যমে আনার চেষ্টা থাকবে।
সৌজন্য: কালের কণ্ঠ

