বেসরকারি গবেষণা প্রতিষ্ঠান সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) গবেষণা পরিচালক খন্দকার গোলাম মোয়াজ্জেম বলেছেন, ‘১২ ফেব্রুয়ারি ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন ও গণভোট একসঙ্গে অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে। এ মুহূর্তে দেশব্যাপী প্রার্থীরা নির্বাচনি প্রচারে ব্যস্ত সময় পার করছেন এবং একই সঙ্গে তাঁরা তাঁদের ইশতেহার ঘোষণা করেছেন। সেখানে ভোটারদের আকৃষ্ট করতে তাদের সামনে বিভিন্ন প্রতিশ্রুতি তুলে ধরছেন। তবে একই সঙ্গে এ কথাও বলা জরুরি, জাতীয় নির্বাচনকে যে অর্থে অন্তর্ভুক্তিমূলক বলা দরকার, বাস্তবে সে অর্থে এটিকে অন্তর্ভুক্তিমূলক বলতে আমরা পারছি না। গণভোটের যে কাঠামো, অধ্যাদেশের দুর্বলতা, সে কারণে ফলাফল নিয়েও গ্রহণযোগ্যতার প্রশ্ন থাকতে পারে।’
গতকাল রাজধানীর মহাখালী ব্র্যাক সেন্টারে ‘নির্বাচনি এলাকায় সবুজ সমাজের পরিস্থিতি ও প্রত্যাশা : প্রার্থী ও ভোটার জরিপের ফলাফল’ শীর্ষক সংবাদ সম্মেলনে তিনি এসব কথা বলেন। সংবাদ সম্মেলনে তারা ক্লাইমেট ফাউন্ডেশন বাংলাদেশের প্রোগ্রাম ডিরেক্টর ড. শওকত আরা বেগম, সিপিডির জ্যেষ্ঠ গবেষণা সহযোগী হেলেন মাশিয়াত, অনুষ্ঠান সহযোগী সামি মোহাম্মদ উপস্থিত ছিলেন।
দেশের আট বিভাগ, ৫৮ জেলা ও ১৫০টি জলবায়ু-ঝুঁকিপূর্ণ সংসদীয় আসনে এ জরিপ পরিচালনা করে সিপিডি। এতে অংশ নেন ১ হাজার ২০০ জন ভোটার এবং বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের ৪৫০ জন প্রার্থী ও প্রতিনিধি। জরিপের প্রশ্নগুলো সাজানো হয় পরিবেশ, অর্থনীতি, সমাজ এ তিনটি স্তম্ভকে কেন্দ্র করে, যাতে বোঝা যায় মানুষ উন্নয়ন, পরিবেশ ও রাজনীতিকে কোন চোখে দেখছে। হেলেন মাশিয়াত ও সামি মোহাম্মদ জরিপ উপস্থাপন করেন। জরিপে ভোটারদের উত্তরে সবচেয়ে বেশি যে বিষয়টি উঠে এসেছে, তা হলো পরিবেশগত সমস্যার দৈনন্দিন উপস্থিতি।
অধিকাংশ ভোটার জানিয়েছেন, তাদের এলাকায় আগের তুলনায় গরম বেড়েছে এবং বাতাসের মান খারাপ হয়েছে। উপকূল ও নদীসংলগ্ন এলাকার ভোটাররা বন্যা, ভাঙন ও লবণাক্ততার কথা বলেছেন। হাওরাঞ্চলে বসবাসকারীরা অকালবন্যা ও ফসলহানির অভিজ্ঞতা তুলে ধরেছেন।
বারিন্দ অঞ্চলের ভোটারের বড় একটি অংশ জানিয়েছেন, অতিরিক্ত তাপ ও পানির সংকট তাদের জীবনযাত্রা ও কৃষিকাজ কঠিন করে তুলেছে। এ উত্তরগুলো থেকে স্পষ্ট হয়, পরিবেশগত সংকট ভোটারদের কাছে কোনো দূরের বিষয় নয়, বরং প্রতিদিনের বাস্তবতা।
জরিপে বলা হয়েছে, ৭৭ শতাংশ ভোটার উন্নয়ন বলতে রাস্তা, কালভার্ট নির্মাণ এবং কর্মসংস্থান সৃষ্টিকে বোঝেন। এর মধ্যে শহরাঞ্চলের ৮৬ শতাংশ ভোটার, পার্বত্য চট্টগ্রাম এবং উপকূলীয় অঞ্চলের ৭৯ শতাংশ ভোটার রাস্তা এবং সেতুকে উন্নয়নের একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হিসেবে দেখেন।
খরাপ্রবণ অঞ্চলের ৮১ শতাংশ ভোটার ‘বর্ধিত তাপমাত্রা’কে পরিবেশগত অবক্ষয়ের অন্যতম প্রধান সমস্যা হিসেবে উল্লেখ করেছেন। পরিবেশ পুনরুদ্ধারের প্রধান উপায় হিসেবে ৮৮ শতাংশ ভোটার এবং ৯৫ শতাংশ রাজনৈতিক দলের উত্তরদাতারা বৃক্ষরোপণকে চিহ্নিত করেছেন এবং ৭০ শতাংশ ভোটার এবং ৭৪ দশমিক ৫ শতাংশ দলীয় প্রতিনিধিরা বলেছেন যে প্লাস্টিকের ব্যবহার হ্রাস করা হলে পরিবেশদূষণ কমবে। ৯৫ শতাংশ ভোটারের মতে বাংলাদেশে সবুজ সমাজ গড়ে তোলা সম্ভব। রাজনৈতিক দলগুলোর প্রতিনিধিদের উত্তরে পরিবেশগত সমস্যার কথা থাকলেও গুরুত্বের জায়গায় পার্থক্য দেখা যায়। বিএনপির প্রতিনিধিরা জরিপে নদীদূষণ, পানি ব্যবস্থাপনা ও শিল্পবর্জ্যকে বড় সমস্যা হিসেবে উল্লেখ করেছেন।
তাঁরা বলেছেন, এসব কারণে স্থানীয় মানুষের স্বাস্থ্য ও জীবিকা ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। তবে একই সঙ্গে তাঁদের অনেকেই তাপমাত্রা বৃদ্ধি বা জলবায়ু পরিবর্তনকে তাৎক্ষণিক রাজনৈতিক অগ্রাধিকারের তালিকায় তুলনামূলকভাবে নিচে রেখেছেন। জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) প্রতিনিধিরা জরিপে পরিবেশগত সংকটের কথা তুলনামূলকভাবে বেশি জোর দিয়ে বলেছেন। তাঁরা বায়ুদূষণ, জলবায়ু পরিবর্তন ও জীবাশ্ম জ্বালানিনির্ভর উন্নয়নকে সমস্যার মূল হিসেবে দেখিয়েছেন।
তাঁদের মতে পরিবেশগত ক্ষতির প্রভাব সরাসরি মানুষের আয়, স্বাস্থ্য ও ভবিষ্যৎ নিরাপত্তার সঙ্গে জড়িত। জামায়াতে ইসলামীর প্রতিনিধিরা নদী, পানি ও কৃষিভিত্তিক সমস্যার কথা বেশি বলেছেন। তাঁরা নদীভাঙন, পানিদূষণ এবং প্রাকৃতিক সম্পদের সঠিক ব্যবস্থাপনার অভাবকে স্থানীয় দুর্ভোগের কারণ হিসেবে উল্লেখ করেছেন। একই সঙ্গে বন উজাড় ও ভূমি ব্যবহারের অনিয়মের কথাও তাঁদের উত্তরে উঠে এসেছে। ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের প্রতিনিধিরা জ্বালানি ও বিদ্যুৎ খাতের পরিবেশগত প্রভাবের দিকে নজর দিয়েছেন। তাঁরা ভাড়াভিত্তিক বিদ্যুৎ কেন্দ্র, জীবাশ্ম জ্বালানির ব্যবহার এবং শহরাঞ্চলের দূষণকে বড় সমস্যা হিসেবে চিহ্নিত করেছেন। তাঁদের মতে জ্বালানি খাতের বর্তমান কাঠামো পরিবেশের ওপর দীর্ঘমেয়াদি চাপ সৃষ্টি করছে। এদিকে জরিপে নবায়নযোগ্য জ্বালানি বিষয়ে দেখা যায়, নবায়নযোগ্য জ্বালানি সম্পর্কে জানেন এমন ভোটারের হার ৪৭ শতাংশ। প্রার্থীর ক্ষেত্রে এ হার প্রায় ৪২ শতাংশ।
ভোটারের একটি বড় অংশ সৌরবিদ্যুৎ সম্পর্কে জানেন, কিন্তু খুব কম ভোটার এটিকে সরাসরি পরিবেশ রক্ষা বা সবুজ জীবনের অংশ হিসেবে দেখছেন। রাজনৈতিক দলগুলোর প্রতিনিধিরা নবায়নযোগ্য জ্বালানির কথা বলেছেন, তবে সেটিকে স্থানীয় জীবিকা, কর্মসংস্থান বা পরিবেশ পুনরুদ্ধারের সঙ্গে যুক্ত করে ব্যাখ্যা করার প্রবণতা কম। অর্থনৈতিক বিষয়ে জরিপে অংশ নেওয়া ভোটারের বড় অংশ টেকসই অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির ধারণাকে সমর্থন করেছেন। তবে একই সঙ্গে তাঁরা বলেছেন, পরিবেশ রক্ষার কারণে যদি দৈনন্দিন খরচ বাড়ে, তাহলে সেটি তাঁদের জন্য চাপ তৈরি করবে। রাজনৈতিক দলগুলোর প্রতিনিধিরা তুলনামূলকভাবে দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা, মানবসম্পদ উন্নয়ন ও সামাজিক নিরাপত্তার কথা বলেছেন।

