ক্যান্সার প্রতিরোধে রাষ্ট্রের অভিভাবকত্ব ও বিশ্ব ক্যান্সার দিবস ২০২৬-এর প্রতিপাদ্য

0
ক্যান্সার প্রতিরোধে রাষ্ট্রের অভিভাবকত্ব ও বিশ্ব ক্যান্সার দিবস ২০২৬-এর প্রতিপাদ্য

৪ ফেব্রুয়ারি বিশ্ব ক্যান্সার দিবস। ২০২৬ সালে দাঁড়িয়ে এবারের প্রতিপাদ্য-‘United by Unique’। প্রতিটি নাগরিকের শারীরিক বৈশিষ্ট্য, পরিবেশগত ঝুঁকি এবং আর্থ-সামাজিক অবস্থান আলাদা বা ‘অনন্য’ (Unique)। কিন্তু এই ভিন্নতা সত্ত্বেও নাগরিকের জীবন রক্ষার প্রশ্নে রাষ্ট্রকে হতে হবে ‘ঐক্যবদ্ধ’ (United)। ক্যান্সার প্রতিরোধ কেবল ব্যক্তিগত সচেতনতায় সীমাবদ্ধ নয়; এটি একটি বিশাল রাষ্ট্রীয় কর্মযজ্ঞ। একজন ক্যান্সার প্রতিরোধ বিশেষজ্ঞ হিসেবে আমি মনে করি, ক্যান্সার প্রতিরোধ ও কন্ট্রোলের ক্ষেত্রে রাষ্ট্রের অভিভাবকত্ব এবং আধুনিক জনস্বাস্থ্য নীতি এখন সময়ের দাবি।

১. সচেতনতা বৃদ্ধি : কেবল প্রচার নয়, সুনির্দিষ্ট কর্মপন্থা

ক্যান্সার প্রতিরোধের প্রথম ধাপ হলো গণসচেতনতা। তবে এটি কেবল বিশেষ দিবসে সীমাবদ্ধ না রেখে বছরব্যাপী সুনির্দিষ্ট কর্মপন্থার আওতায় আনতে হবে। রাষ্ট্রকে এমন একটি জাতীয় পরিকল্পনা তৈরি করতে হবে, যেখানে সমাজের সর্বস্তরে ক্যান্সারের ঝুঁকি ও প্রতিরোধ সম্পর্কে বিজ্ঞানসম্মত তথ্য পৌঁছানো নিশ্চিত করা হবে। সচেতনতাকে অভ্যাসে পরিণত করার জন্য একটি সমন্বিত ‘কমিউনিকেশন স্ট্র্যাটেজি’ রাষ্ট্রের নীতিনির্ধারণী পর্যায় থেকে আসা প্রয়োজন।

২. স্ক্রিনিং কভারেজ বৃদ্ধি ও ওরাল ক্যান্সার অন্তর্ভুক্তি 

বাংলাদেশে বর্তমানে জরায়ুমুখ এবং স্তন ক্যান্সার স্ক্রিনিংয়ের সুযোগ থাকলেও এর পরিধি বা কভারেজ অত্যন্ত সীমিত। অধিকাংশ নারীই এখনো এই সেবার আওতার বাইরে। রাষ্ট্রকে এই স্ক্রিনিং কার্যক্রমকে প্রান্তিক পর্যায়ের প্রতিটি কমিউনিটি ক্লিনিক পর্যন্ত বিস্তৃত করতে হবে। একই সাথে, আমাদের দেশের প্রেক্ষাপটে ‘ওরাল ক্যান্সার’ বা মুখগহ্বরের ক্যান্সারের হার আশঙ্কাজনকভাবে বেশি। অথচ স্ক্রিনিং কার্যক্রমে এটি এখনো সেভাবে গুরুত্ব পায়নি। তামাক ও জর্দা ব্যবহারের কারণে সৃষ্ট এই ক্যান্সার প্রাথমিক পর্যায়ে শনাক্ত করা খুবই সহজ। তাই রাষ্ট্রীয় স্ক্রিনিং প্রটোকলে জরায়ুমুখ ও স্তন ক্যান্সারের পাশাপাশি মুখগহ্বরের (ওরাল) ক্যান্সারকে বাধ্যতামূলকভাবে অন্তর্ভুক্ত করা এখন সময়ের দাবি।

৩. চিকিৎসার বিকেন্দ্রীকরণ ও দক্ষ জনবল সৃষ্টি

ক্যান্সার চিকিৎসার বড় একটি অন্তরায় হলো এর রাজধানী কেন্দ্রিক চিকিৎসা ব্যবস্থা। ঢাকার বাইরে কিছু বিভাগীয় শহরে ক্যান্সার সেবা থাকলেও চাহিদার হিসাবে খুবই অপ্রতুল। আর তাই, সময়মতো যথাযথ চিকিৎসা না পাওয়ায় অনেক প্রান্তিক রোগীরা চিকিৎসার মাঝপথেই হাল ছেড়ে দেন। রাষ্ট্রকে অগ্রাধিকার ভিত্তিতে বিভাগীয় পর্যায়ে ক্যান্সার চিকিৎসা কেন্দ্রগুলোর পূর্ণাঙ্গ বিকেন্দ্রীকরণ করতে হবে। তবে কেবল অবকাঠামো নির্মাণই যথেষ্ট নয়; প্রয়োজন দক্ষ ও বিশেষজ্ঞ জনবল। ক্যান্সার চিকিৎসায় নিয়োজিত চিকিৎসক, নার্স ও টেকনিশিয়ানদের জন্য উচ্চতর প্রশিক্ষণের নিয়মিত ও গঠনমূলক রাষ্ট্রীয় উদ্যোগ থাকতে হবে। বিশেষজ্ঞ জনগণ আর আধুনিক সেবা যখন দোরগোড়ায় থাকবে, তখনই সাধারণ মানুষের সুফল ভোগ করতে পারবে।

৪. ক্যান্সার কন্ট্রোল পলিসির আধুনিকায়ন 

আমাদের দীর্ঘদিনের স্থবির ও পুরনো ক্যান্সার নিয়ন্ত্রণ নীতিমালাকে আমূল সংস্কারের মাধ্যমে পুনরুজ্জীবিত করার এখনই সময়। আগামীর বৈশ্বিক চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় আমাদের প্রয়োজন একটি সুসংহত ‘৩৬০-ডিগ্রি ক্যান্সার কন্ট্রোল মডেল’। এই আধুনিকায়নের মূল চালিকাশক্তি হবে ‘ডেটা-নির্ভর পরিকল্পনা’ এবং ‘কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা’র (AI) নিপুণ সমন্বয়। একটি কেন্দ্রীয় সমন্বিত কাঠামোর আওতায় বা এক ছাতার নিচে ক্যান্সার স্ক্রিনিং, উন্নত রোগ নির্ণয়, টেলি-মেডিসিন এবং পূর্ণাঙ্গ চিকিৎসা ব্যবস্থাকে এমনভাবে একীভূত করতে হবে, যাতে প্রযুক্তির সেতুবন্ধনে বিশেষজ্ঞ সেবাগুলো সাধারণ মানুষের দোরগোড়ায় অনায়াসেই পৌঁছে যায়। মূলত, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার ব্যবহার এবং তথ্যনির্ভর নীতিনির্ধারণই হবে আমাদের আগামীর আধুনিক ও মানবিক ক্যান্সার নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থার মূল ভিত্তি।

৫. আইন প্রয়োগ ও পরিবেশ সুরক্ষা

ক্যান্সার সৃষ্টিকারী প্রধান দুটি কারণ হলো তামাক এবং অনিরাপদ খাদ্য। তামাক নিয়ন্ত্রণ আইনের কঠোর প্রয়োগ এবং খাদ্যে ভেজাল ও দূষণ রোধে রাষ্ট্রের ‘জিরো টলারেন্স’ নীতি হাজার হাজার জীবন বাঁচাতে পারে। এটি কেবল স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের কাজ নয়, বরং আন্তঃমন্ত্রণালয় সমন্বয়ের মাধ্যমে একটি সুস্থ পরিবেশ নিশ্চিত করা রাষ্ট্রের সাংবিধানিক দায়বদ্ধতা।

৬. আর্থিক সুরক্ষা ও মানবিক রাষ্ট্র

ক্যান্সার চিকিৎসায় ‘আউট অফ পকেট এক্সপেন্ডিচার’ বা উচ্চ ব্যক্তিগত ব্যয় আমাদের দেশের সাধারণ মানুষের জন্য এক মরণফাঁদ, যা প্রতি বছর অসংখ্য পরিবারকে নিঃস্ব করে দিচ্ছে। অর্থের অভাবে কোনো নাগরিকের চিকিৎসা যেন বন্ধ না হয়, তা নিশ্চিত করা রাষ্ট্রের নৈতিক দায়িত্ব। আর এই আর্থিক বিপর্যয় রুখতে একটি টেকসই ও বাস্তবসম্মত ‘জাতীয় ক্যান্সার স্বাস্থ্য বীমা’ ব্যবস্থা গড়ে তোলা এখন সময়ের দাবি।

২০২৬ সালের বিশ্ব ক্যান্সার দিবস আমাদের একটি সুযোগ করে দিয়েছে নতুন করে পথ চলার। ‘United by Unique’ এর মূল কথা হলো বৈচিত্র্যের মধ্যে ঐক্য। আমাদের নাগরিকদের ঝুঁকি ও জীবনযাত্রা যতই ভিন্ন হোক না কেন, রাষ্ট্রের সুরক্ষার প্রতিশ্রুতি হতে হবে অটল এবং অভিন্ন। একটি আধুনিক ও যুগোপযোগী ক্যান্সার কন্ট্রোল পলিসি বাস্তবায়নের মাধ্যমেই আমরা আগামীর একটি সুস্থ ও সবল বাংলাদেশ গড়ার পথে এগিয়ে যেতে পারব। আমাদের সম্মিলিত ঐক্যই হোক ক্যান্সারের বিরুদ্ধে সবচেয়ে শক্তিশালী প্রতিরোধ।

লেখক : ক্যান্সার প্রতিরোধ ও জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ প্রতিষ্ঠাতা, ক্যান্সার অ্যাওয়ারনেস ফাউন্ডেশন অব বাংলাদেশ

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here