কঠিন সময়ের মুখোমুখি ‘নিরুপায়’ ট্রাম্প

0
কঠিন সময়ের মুখোমুখি ‘নিরুপায়’ ট্রাম্প

ইরানের সাথে চলমান যুদ্ধের চতুর্থ সপ্তাহে প্রবেশ করার পথে। আর সেসময়েই মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প এখন তার মেয়াদের সবচেয়ে কঠিন সামরিক ও রাজনৈতিক সিদ্ধান্তের মুখোমুখি দাঁড়িয়েছেন। ২৮ ফেব্রুয়ারি থেকে শুরু হওয়া এই সংঘাতের রেশ ধরে এখন তেহরানের মাটিতে সরাসরি মার্কিন পদাতিক সৈন্য নামানো হবে কি না, তা নিয়ে হোয়াইট হাউসে চলছে চুলচেরা বিশ্লেষণ। 

ওয়াশিংটনের নীতি-নির্ধারক ও শীর্ষ সামরিক কর্মকর্তাদের সাথে প্রায় প্রতিদিনের রুদ্ধদ্বার বৈঠকে ট্রাম্পকে একাধিক বিকল্প প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে, যার মধ্যে স্থল অভিযানের বিষয়টিও জোরালোভাবে অন্তর্ভুক্ত রয়েছে। তবে এই সিদ্ধান্তের ওপর একদিকে যেমন যুদ্ধের ভাগ্য নির্ভর করছে, অন্যদিকে ট্রাম্পের রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ এবং মিত্রদের সমর্থনও এখন খাদের কিনারে।

পেন্টাগনের উচ্চপদস্থ কর্মকর্তাদের সাথে দফায় দফায় বৈঠকের পর গত বৃহস্পতিবার ওভাল অফিসে সাংবাদিকদের মুখোমুখি হয়ে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প কিছুটা রহস্যময় অবস্থান বজায় রেখেছেন। তিনি সরাসরি কোনো সেনা মোতায়েনের কথা স্বীকার না করলেও বিষয়টি পুরোপুরি উড়িয়ে দেননি। ট্রাম্পের দাবি, তিনি এখনই কোথাও সৈন্য পাঠাচ্ছেন না, আর যদি পাঠাতেনও তবে তা সংবাদমাধ্যমকে ঘুণাক্ষরেও জানাতেন না। কিন্তু প্রেসিডেন্টের এই কৌশলী বক্তব্যের আড়ালে প্রশাসনের ভেতরে যে তীব্র উত্তেজনা বিরাজ করছে, তা এখন স্পষ্ট। বিশেষ করে মধ্যপ্রাচ্যে মোতায়েন করা মেরিন ইউনিটগুলোর গতিবিধি এবং রণতরী ইউএসএস আব্রাহাম লিঙ্কনের সক্রিয়তা ভিন্ন সংকেত দিচ্ছে বলে অনেক বিশ্লেষক মনে করছেন।

এদিকে ট্রাম্পের ঘনিষ্ঠ রিপাবলিকান মিত্রদের মধ্যেও এই সম্ভাব্য স্থল অভিযান নিয়ে বড় ধরনের ফাটল দেখা দিয়েছে। ওয়াশিংটনের অনেক প্রভাবশালী আইনপ্রণেতা স্পষ্ট জানিয়ে দিয়েছেন, ইরানে হাজার হাজার মার্কিন সৈন্য পাঠানোর অর্থ হবে এই যুদ্ধের প্রতি তাদের প্রকাশ্য সমর্থনের অবসান। আসন্ন মধ্যবর্তী নির্বাচনকে সামনে রেখে অনেক রিপাবলিকান নেতা আশঙ্কা করছেন, আরেকটি ‘অন্তহীন যুদ্ধ’ ভোটারদের মধ্যে নেতিবাচক প্রভাব ফেলবে। বিশেষ করে জ্বালানি তেলের মূল্যবৃদ্ধি এবং যুদ্ধের বিপুল ব্যয়ভার বহন করার প্রশ্নে ট্রাম্পের নিজের দলেই এখন বিরোধ দেখা দিচ্ছে। এর ফলে প্রশাসনের জন্য আগামী দিনের বড় অঙ্কের সামরিক তহবিল জোগাড় করা কঠিন হতে পারে।

ইরানের পক্ষ থেকে কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ হরমুজ প্রণালী বন্ধ করে দেওয়ার ঘোষণা বৈশ্বিক অর্থনীতিতে যে কম্পন সৃষ্টি করেছে, তা ট্রাম্পের ওপর চাপ কয়েক গুণ বাড়িয়ে দিয়েছে। মার্কিন গোয়েন্দা কর্মকর্তারা স্বীকার করেছেন, এই নৌপথটি পুনরায় উন্মুক্ত করা কেবল বিমান হামলা বা নৌ অবরোধের মাধ্যমে সম্ভব নাও হতে পারে। তেহরানকে আলোচনার টেবিলে বাধ্য করতে বা এই গুরুত্বপূর্ণ জলপথের নিয়ন্ত্রণ ফিরে পেতে স্থল অভিযানের প্রয়োজন হতে পারে বলে প্রশাসনের একটি অংশ মনে করছে। বিশেষ করে ইরানের খারগ দ্বীপ দখল করে দেশটির অর্থনীতির মেরুদণ্ড ভেঙে দেওয়ার যে পরিকল্পনা নিয়ে আলোচনা চলছে, তা বাস্তবায়ন করতে হলে বড় মাপের স্থলসেনা মোতায়েন অনিবার্য হয়ে পড়বে।

অন্যদিকে ইসরায়েলের সাথে মার্কিন রণকৌশলের দূরত্ব ক্রমেই দৃশ্যমান হয়ে উঠছে। যদিও ট্রাম্প এবং নেতানিয়াহু প্রায় প্রতিদিন যোগাযোগ রাখছেন কিন্তু যুদ্ধের চূড়ান্ত লক্ষ্য নিয়ে দুই দেশের মধ্যে মতভেদ রয়েছে। ইসরায়েল চায় ইরানের বর্তমান শাসনের পতন ঘটিয়ে দীর্ঘমেয়াদী সমাধান, যার জন্য সময় ও রক্তক্ষয়ী যুদ্ধের প্রয়োজন। কিন্তু ট্রাম্পের লক্ষ্য অনেক বেশি সংক্ষিপ্ত ও রাজনৈতিকভাবে লাভজনক। তিনি চান দ্রুত সামরিক বিজয় ঘোষণা করে যুদ্ধের ময়দান থেকে সরে আসতে। ইসরায়েলি কর্মকর্তাদের মতে, ট্রাম্পের ‘রাজনৈতিক ঘড়ি’ অনেক দ্রুত চলে এবং তিনি যেকোনো মুহূর্তে ‘আমরা জিতেছি’ বলে অভিযান সমাপ্তি ঘোষণা করতে পারেন। আর এটা ইসরায়েলের জন্য দীর্ঘমেয়াদী নিরাপত্তার ঝুঁকি তৈরি করতে পারে।

ইরানের পারমাণবিক সক্ষমতা পুরোপুরি ধ্বংস করা নিয়েও তৈরি হয়েছে ধোঁয়াশা। মার্কিন প্রতিরক্ষামন্ত্রী পিট হেগসেথ দাবি করেছেন, মার্কিন হামলায় ইরানের কয়েক হাজার সামরিক লক্ষ্যবস্তু ধ্বংস করা হয়েছে। কিন্তু ইউরোপীয় কূটনীতিকদের মতে, ইরানের পারমাণবিক জ্ঞান এবং তাদের বিজ্ঞানীদের দক্ষতা কেবল বোমা মেরে মুছে ফেলা সম্ভব নয়। ভূগর্ভস্থ স্থাপনায় সংরক্ষিত ইউরেনিয়াম উদ্ধার করা বা সেগুলো নিষ্ক্রিয় করা অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ একটি কাজ। যদি সেখানে সরাসরি আঘাত করা হয়, তবে বিশাল অঞ্চল তেজস্ক্রিয় দূষণের শিকার হতে পারে। এই জটিলতা এড়াতে হলে সরাসরি মাটির নিচে তল্লাশি চালানো বা বিশেষ বাহিনী পাঠানোর কোনো বিকল্প দেখছেন না সমরবিদরা।

প্রশাসনের ভেতরে লিন্ডসে গ্রাহামের মতো কট্টরপন্থীরা যুদ্ধের পক্ষে জোরালো সওয়াল করলেও জেফ ভ্যান ড্রু বা টিম বারচেটের মতো রিপাবলিকানরা সাফ জানিয়ে দিয়েছেন, তারা মার্কিন সেনাদের জীবন ঝুঁকিতে ফেলতে রাজি নন। তাদের মতে, ইরানের নৌবাহিনী ও ক্ষেপণাস্ত্র সক্ষমতা ধ্বংস করার পর জয় ঘোষণা করে সরে আসাই হবে বুদ্ধিমানের কাজ। কিন্তু যুদ্ধের এই পর্যায়ে এসে পিছু হটা মানে ইরানের আঞ্চলিক প্রভাব বজায় রাখা, যা ট্রাম্পের সমর্থকদের একাংশ মেনে নেবে না। ফলে এক অদ্ভুত রাজনৈতিক ও সামরিক অচলাবস্থার মধ্যে আটকা পড়েছেন ট্রাম্প, যেখানে প্রতিটি সিদ্ধান্তই তাকে আগামীর ইতিহাসের কাঠগড়ায় দাঁড় করাবে।

এই টানাপোড়েনের মধ্যেই মধ্যপ্রাচ্যের দিকে এগিয়ে যাচ্ছে মার্কিন নৌবাহিনীর আরও বেশ কিছু রণতরী ও অতিরিক্ত মেরিন সেনা। যদিও হোয়াইট হাউস একে সাধারণ প্রস্তুতি হিসেবে বর্ণনা করছে কিন্তু ওমানের মতো আঞ্চলিক মধ্যস্থতাকারীরা সতর্ক করেছেন যে আমেরিকা তার নিজের পররাষ্ট্রনীতির ওপর নিয়ন্ত্রণ হারাচ্ছে। ইরানের দক্ষিণ পার্স গ্যাস ফিল্ডে ইসরায়েলি হামলা এবং তার বিপরীতে কাতারে ইরানি পাল্টাপাল্টি আঘাত পরিস্থিতিকে নিয়ন্ত্রণের বাইরে নিয়ে যাচ্ছে। আগামী শনিবার যুদ্ধের এক মাস পূর্ণ হতে যাচ্ছে, আর সেই তারিখকেই এই অভিযানের একটি সম্ভাব্য টার্নিং পয়েন্ট হিসেবে দেখছে গোটা বিশ্ব। 

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here