বিশ্বজুড়ে হইচই ফেলে দেওয়া ওজন কমানোর ওষুধ ওজেম্পিক এবং উইগোভির দিন বদলে যাচ্ছে। এক সময় যা ছিল কেবল ধনকুবেরদের নাগালের মধ্যে, মার্কিন প্রশাসনের কঠোর অবস্থান এবং নতুন নীতিমালার কারণে তার দাম এখন সাধারণের সাধ্যের মধ্যে চলে এসেছে। তবে এই দাম কমার ফলে ওষুধ নির্মাতা প্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যে মিশ্র প্রতিক্রিয়া দেখা দিয়েছে।
একদিকে ডেনমার্কভিত্তিক কোম্পানি নোভো নরডিস্ক বড় ধরনের আর্থিক ধাক্কার মুখে পড়েছে, অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্রের এলি লিলি বিপুল বিক্রির মাধ্যমে সেই ক্ষতি পুষিয়ে নেওয়ার পথে হাঁটছে।
মাত্র এক বছর আগেও যুক্তরাষ্ট্রে এক মাসের ওজেম্পিক বা উইগোভি কোর্সের জন্য রোগীদের ১ হাজার ডলারেরও (প্রায় ১ লাখ ২০ হাজার টাকা) বেশি খরচ করতে হতো। কিন্তু ২০২৬ সালের শুরু থেকে মার্কিন প্রশাসনের ‘ট্রাম্পআরএক্স’ প্ল্যাটফর্ম এবং সরকারের মধ্যস্থতায় এই দাম নাটকীয়ভাবে কমিয়ে আনা হয়েছে।
নতুন চুক্তি অনুযায়ী, এখন থেকে মেডিকেয়ারের আওতাভুক্ত রোগীরা মাত্র ৫০ ডলারে (প্রায় ৬ হাজার টাকা) এই ইনজেকশনগুলো কিনতে পারবেন। এছাড়া, যারা সরাসরি ক্যাশ বা নগদ অর্থে কিনতে চান, তাদের জন্য দাম নির্ধারণ করা হয়েছে ৩৫০ ডলার। যা আগামী দুই বছরে ২৪৫ ডলারে নেমে আসবে বলে ধারণা করা হচ্ছে। বিশেষ করে বাজারে আসা নতুন ‘ওয়েট লস পিলের দাম রাখা হয়েছে মাত্র ১৪৯ ডলার।
ওজন কমানোর ওষুধের পথিকৃৎ হিসেবে পরিচিত নোভো নরডিস্কের জন্য ২০২৬ সালটি বেশ চ্যালেঞ্জিং। কোম্পানিটি সম্প্রতি সতর্কবার্তা দিয়েছে, তাদের চলতি বছরের বিক্রি ৫ শতাংশ থেকে ১৩ শতাংশ পর্যন্ত কমে যেতে পারে।
বিশ্লেষকদের মতে, দাম কমানোর এই চুক্তির ফলে কোম্পানিটির বাজার মূলধন থেকে মাত্র দুই দিনে প্রায় ৩২ বিলিয়ন ডলারের ( ৩ লাখ ৮০ হাজার কোটি টাকার) বেশি সম্পদ মুছে গেছে। ডেনমার্কের স্টক এক্সচেঞ্জে তাদের শেয়ারের দাম ১৮ শতাংশ পর্যন্ত পড়ে গেছে। নোভো নরডিস্কের সিইও মাইক দোস্তদার গণমাধ্যমকে জানিয়েছেন, আমরা লাখ লাখ সাধারণ মানুষের জন্য ওষুধটি সাশ্রয়ী করছি। দীর্ঘমেয়াদী কল্যাণের জন্য আমাদের এই সাময়িক আর্থিক ক্ষতি বা ‘হেডউইন্ড’ মেনে নিতে হচ্ছে।
নোভো নরডিস্ক লোকসানের হিসাব কষলেও তাদের প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী মার্কিন কোম্পানি এলি লিলি বেশ স্বস্তিতে রয়েছে। তাদের তৈরি ওজন কমানোর ওষুধ ‘জেপবাউন্ড’ এবং ডায়াবেটিসের ওষুধ ‘মাউঞ্জারো’ বিক্রিতে রেকর্ড সৃষ্টি করেছে। এলি লিলির কৌশল হলো দামের চেয়ে বিক্রির পরিমাণের ওপর জোর দেওয়া। দাম কমলেও বিপুল সংখ্যক মানুষ এই ওষুধ ব্যবহার শুরু করায় তাদের মুনাফা উল্টো বাড়ছে। ২০২৬ সালে কোম্পানিটি ৮০ থেকে ৮৩ বিলিয়ন ডলার বিক্রির লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করেছে।
ইনজেকশনের ভীতি দূর করতে উভয় কোম্পানিই এখন পিলের দিকে ঝুঁকছে। নোভো নরডিস্কের উইগোভি পিল ইতিমধ্যেই বাজারে ব্যাপক সাড়া ফেলেছে। লঞ্চ করার মাত্র চার সপ্তাহের মধ্যে ১ লাখ ৭০ হাজারেরও বেশি রোগী এই বড়ি গ্রহণ শুরু করেছেন। অন্যদিকে এলি লিলি তাদের নতুন ওরাল ড্রাগ ‘অরফোরগ্লিপ্রন’-এর জন্য এফডিএর অনুমোদনের অপেক্ষায় আছে। পিলটি এপ্রিলেই বাজারে আসার কথা রয়েছে।
স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা এই দামের পতনকে জনস্বাস্থ্যের জন্য একটি বড় বিজয় হিসেবে দেখছেন। স্থূলতা বা অতিরিক্ত ওজন হৃদরোগ, স্লিপ অ্যাপনিয়া এবং ডায়াবেটিসের অন্যতম প্রধান কারণ। উচ্চমূল্যের কারণে এতোদিন যারা এই আধুনিক চিকিৎসা নিতে পারছিলেন না, এখন তারা খুব সহজেই এটি গ্রহণ করতে পারবেন। ধারণা করা হচ্ছে, যুক্তরাষ্ট্রের প্রায় ১০ শতাংশ মেডিকেয়ার সুবিধাভোগী এই নতুন নীতির ফলে সরাসরি উপকৃত হবেন।
সূত্র: গালফ নিউজ

