এসআইবিএল প্রশাসকের ‘বদনজরে’ ব্যবসায়ীরা

0
এসআইবিএল প্রশাসকের ‘বদনজরে’ ব্যবসায়ীরা

মোটা বিনিয়োগ, বিপুলসংখ্যক মানুষের কর্মসংস্থান আর সরকারকে বড় অঙ্কের রাজস্ব দিয়েও বিপদের সময় ব্যাংককে পাশে পাচ্ছে না দেশের শীর্ষ শিল্প গ্রুপগুলো। এমনকি ত্রিপক্ষীয় মতামতের ভিত্তিতে নেওয়া সিদ্ধান্তও মানা হচ্ছে না। বরং বাংলাদেশ ব্যাংকের সিদ্ধান্তকে বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখিয়ে বড় গ্রুপগুলোকে পথে বসিয়ে দেওয়া হচ্ছে। কর্মহীন করা হচ্ছে লাখো শ্রমিককে।

সরকার হারাচ্ছে বিপুল অঙ্কের রাজস্ব। সর্বোপরি ব্যাংকও কিছু পাচ্ছে না, উল্টো গ্রাহকের আমানত ফেরত না পেয়ে দেউলিয়াত্ব বরণ করছে। এমন নজিরবিহীন ঘটনা ঘটছে বেসরকারি সোশ্যাল ইসলামী ব্যাংক লিমিটেড বা এসআইবিএলে। খেলাপি কমিয়ে ব্যাংকটিকে টেনে তুলতে সেখানে প্রশাসক বসায় কেন্দ্রীয় ব্যাংক।

এখন খোদ ওই প্রশাসকই ভুল চালে ব্যাংকটিকে ডুবিয়ে দিচ্ছেন বলে বিস্তর অভিযোগ। বাংলাদেশ ব্যাংক বিপদে পড়া বড় শিল্প গ্রুপগুলোকে ২ শতাংশ ডাউন পেমেন্টের সুযোগ দিয়ে সহায়তা করতে বলেছিল। অথচ কেন্দ্রীয় ব্যাংকের বসানো প্রশাসক নিজেই এখন অমান্য করছেন ওই সিদ্ধান্ত। অভিযোগ রয়েছে, বিশেষ সুবিধা পেয়ে কাউকে কাউকে ছাড় দিচ্ছেন ঠিকই, কিন্তু বড় বিনিয়োগ ও বেশি কর্মসংস্থানে অবদান রাখা অনেক গ্রুপের সঙ্গে করা হচ্ছে বিমাতাসুলভ আচরণ।

নথিপত্র পর্যালোচনা, বাংলাদেশ ব্যাংক ও বিভিন্ন গ্রুপের কর্মকর্তাদের সঙ্গে কথা বলে এসব তথ্য জানা গেছে।

বিএনপি নেতৃত্বাধীন নতুন সরকার এখন ক্ষমতায়। আগের ক্ষমতাচ্যুত আওয়ামী ও সদ্যোবিদায়ি অন্তর্বর্তী সরকারের ভুলনীতিতে ভুগতে থাকা সংকটাপন্ন অর্থনীতি ও ব্যবসা-বাণিজ্যে এখন গতি ফেরানোই এ সরকারের অগ্রাধিকার। দায়িত্ব নিয়েই প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান বেসরকারি খাতকে চাঙ্গা করা, বিনিয়োগ ও কর্মসংস্থান বাড়ানোর দিকে নজর দিয়েছেন। কিন্তু ভেতরে ভেতরে ঘটছে অন্য ঘটনা।

যেসব বড় গ্রুপ লাখো মানুষের কর্মসংস্থান করে, সরকারকে মোটা রাজস্ব দিয়ে অর্থনীতির ভিত মজবুত করতে সহায়তা করে আসছিল, ওই সব গ্রুপ করোনা মহামারি, ইউক্রেন-রাশিয়া যুদ্ধ এবং পরে ক্ষমতার পালাবদল ও রাজনৈতিক অস্থিরতায় বেশ বেকায়দায় পড়ে যায়। তাদের কেউ কেউ লোকসানে পড়ে অনিচ্ছাকৃত ঋণখেলাপিও হয়ে পড়ে। অথচ তারা প্রাণপণ চেষ্টা করছে ঘুরে দাঁড়াতে। ব্যাংকের খেলাপি শোধেও আন্তরিক। দরকার ব্যাংকের কিছুটা নমনীয় নীতি। তারই ধারাবাহিকতায় বাংলাদেশ ব্যাংক এগিয়ে আসে। অর্থনীতিতে অবদান রাখা অনিচ্ছাকৃত ঋণখেলাপি হওয়া বড় গ্রুপগুলোকে সহায়তা করতে ব্যাংক-গ্রাহক উভয়কেই ডাকা হয় ত্রিপক্ষীয় বৈঠকে। বাংলাদেশ ব্যাংকের ২০২৫ সালের ৭ অক্টোবর জারি করা চিঠিতে গৃহীত সিদ্ধান্ত জানানো হয়। সিদ্ধান্ত ছিল—নানা বৈরী পরিস্থিতির শিকার হয়ে অনিচ্ছাকৃত খেলাপি হয়ে পড়া গ্রুপগুলোকে সহায়তা করতে হবে। বলা হয়, এ রকম বিপদের মুখে থাকা বড় গ্রুপগুলোকে ২ শতাংশ ডাউন পেমেন্টে ঋণ পুনঃতফসিল করার সুযোগ দিতে হবে। এর মধ্যে পুনঃতফসিলের আবেদনের সঙ্গে ১ শতাংশ আর বাকি ১ শতাংশ দিতে হবে পরবর্তী ছয় মাসের মধ্যে। আর এক বছর গ্রেস পিরিয়ডসহ সর্বোচ্চ ১০ বছর মেয়াদি বিশেষ পুনঃতফসিলের সুযোগ দিতে হবে। সিদ্ধান্ত অনুযায়ী ব্যবস্থা নিতে চিঠিটি এসআইবিএলসহ ১২টি ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানকে দেওয়া হয়।
কয়েকটি ব্যাংকের মতো এসআইবিএল ব্যাংকও সংকটময় সময় পার করছে। নির্বিচারে ঋণ দিয়ে এখন অনেকটাই রুগ্ণ। এটিসহ আরো চারটি রুগ্ণ ব্যাংককে মার্জার বা একীভূত করে সম্মিলিত ইসলামী ব্যাংক নামে একটি ব্যাংক গঠনের প্রক্রিয়া চলছে। এই অন্তর্বর্তী সময়ে এসআইবিএল ব্যাংককে পরিচালনার জন্য গত বছরের ৫ নভেম্বর বাংলাদেশ ব্যাংক সেখানে একজন প্রশাসক ও চারজন সহযোগী প্রশাসক নিয়োগ দেয়। বাংলাদেশ ব্যাংকের নির্বাহী পরিচালক মো. সালাহ উদ্দীনের নেতৃত্বে সহযোগী প্রশাসক হলেন বাংলাদেশ ব্যাংকের অতিরিক্ত পরিচালক মো. রাশেদুল ইসলাম, হাম্মাদা আবদুল আতি ও ড. মোহাম্মদ বজলুল করীম। আর অন্য সদস্য হলেন বাংলাদেশ ব্যাংকের যুগ্ম পরিচালক রওশন আক্তার।

তাঁদের হাতেই এখন ব্যাংকটির আর্থিক পরিস্থিতির উন্নতি করে একে সম্মিলিত ইসলামী ব্যাংকের সঙ্গে মার্জারের উপযোগী করার ক্ষমতা। কিন্তু সুযোগ পেয়েই প্রশাসকের নেতৃত্বে এসআইবিএলের বোর্ড কোনো কোনো বড় গ্রাহকের সঙ্গে চরম স্বেচ্ছাচারিতা শুরু করেছে বলে অভিযোগ উঠেছে। অনিচ্ছাকৃত ঋণখেলাপি হওয়া কিছু গ্রুপকে ব্যবসা সচল রাখতে বাংলাদেশ ব্যাংক নমনীয়ভাবে দেখার সিদ্ধান্ত জানালেও এই বোর্ড উল্টো কাজ করছে বলে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা জানিয়েছেন। সহায়তার বদলে বরং শর্তের খড়্গ চাপিয়ে দিচ্ছে। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের সিদ্ধান্ত মেনে ২ শতাংশ ডাউন পেমেন্টে ঋণ পুনঃতফসিলের সুযোগসহ প্রতিষ্ঠান সচলের স্বার্থে বেশ কিছু বিষয়ে নমনীয়তা দেখানোর সিদ্ধান্ত থাকলেও তা তাদের পছন্দমতো কোনো গ্রুপকে দিচ্ছে, আর কাউকে বঞ্চিত করছে। সিদ্ধান্ত মেনে ঋণ পুনঃতফসিলের সুযোগ সবাইকে দেওয়া হলে এসআইবিএলের যে দেউলিয়া হওয়ার ঝুঁকি, সেখানে কিছুটা হলেও স্বস্তি ফিরত বলে মনে করছেন অনেকে। এখন কাউকে দিচ্ছে আর কাউকে বঞ্চিত করার ফলে ব্যাংকের কোনো লাভ হচ্ছে না। বরং ঋণ ফিরে পাওয়ার বদলে আরো না পাওয়ার ঝুঁকি তৈরি হয়েছে। এ রকম বেশ কিছু বড় গ্রুপের ক্ষেত্রে তাদের বিমাতাসুলভ আচরণের তথ্য জানাগেছে। এর মধ্যে ওরিয়ন গ্রুপ, থার্মেক্স গ্রুপ, রূপায়ণ গ্রুপ, জয় গ্রুপসহ আরো বেশ কয়েকটি বড় গ্রুপ রয়েছে, যারা এসআইবিএলের বর্তমান প্রশাসনের কারণে দুর্ভোগের শিকার বলে জানা গেছে।

এই যেমন অনিচ্ছাকৃত নানা সংকটে থাকা গ্রুপগুলোর একটি দেশের অন্যতম শীর্ষ রপ্তানিমুখী শিল্প থার্মেক্স গ্রুপ। নরসিংদীতে প্রতিষ্ঠিত এই কম্পোজিট নিট পোশাক শিল্পগ্রুপটির অনেকগুলো সিস্টার কনসার্নও রয়েছে। এসব কারখানায় বিপুলসংখ্যক কর্মী কাজ করেন। গ্রুপটির সঙ্গে ব্যাংকসহ অনেক স্টেকহোল্ডারও জড়িত। নানা সংকটের কারণে এই গ্রুপটিও এসআইবিএলে ঋণখেলাপি হয়েছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের সিদ্ধান্ত মেনে গ্রুপের পক্ষ থেকে ২ শতাংশ ডাউন পেমেন্টের সুবিধা নিতে আবেদন করা হলেও একে কোনো সুবিধা দেওয়া হয়নি।

একইভাবে বাংলাদেশের আবাসন খাতের আরেক শীর্ষ গ্রুপ রূপায়ণ গ্রুপ। এখানেও বিপুল অঙ্কের বিনিয়োগ রয়েছে। বহু লোকের কর্মসংস্থান হয়েছে। ব্যাংকসহ অসংখ্য স্টেকহোল্ডার এ গ্রুপের সঙ্গে জড়িত। অথচ এটিও আবেদন করে ব্যর্থ হয়েছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের সিদ্ধান্ত মেনে এই গ্রুপটির ব্যাপারেও নমনীয় হননি এসআউবিএলের প্রশাসক মো. সালাহ উদ্দীন।

দেশের আরেক বড় গ্রুপ ওরিয়ন গ্রুপ। এ গ্রুপেরও অর্থনীতিতে নানাভাবে অংশগ্রহণ রয়েছে। এখানে বিপুলসংখ্যক মানুষের কর্মসংস্থান হয়েছে। বহু স্টেকহোল্ডার এ গ্রুপের সঙ্গে ব্যাবসায়িক অংশীদার হিসেবে কাজ করছে। অথচ আবেদন করে এই গ্রুপটিও ব্যর্থ হয়েছে।

এভাবে একের পর এক বড় গ্রুপকে বাংলাদেশ ব্যাংকের সিদ্ধান্ত থাকার পরও ফিরিয়ে দিচ্ছে এসআইবিএল কর্তৃপক্ষ। এতে করে কোনো পক্ষেরই লাভ হচ্ছে না। অথচ বিশেষ সুবিধা বা ‘খুশি’ করার বদলে ২ শতাংশ ডাউন পেমেন্টে কোনো কোনো গ্রুপকে ঋণ পুনঃতফসিলের সুযোগ দেওয়া হয়েছে বলে অভিযোগ করেছেন অনেক উদ্যোক্তা। তাঁরা মনে করেন, এটি অনৈতিক ও অন্যায্য।

বাংলাদেশ ব্যাংক জানায়, এই সুযোগ দেওয়ার মানে হলো—বড় গ্রুপগুলো যেহেতু দেশে বিপুল বিনিয়োগ, লাখো মানুষের কর্মসংস্থান, বিশাল আমদানি-রপ্তানি বাণিজ্য পরিচালনা, সরকারকে মোটা অঙ্কের রাজস্ব দেয় এবং তারা পরিস্থিতির শিকার হয়ে ঋণখেলাপি হয়ে গেছে; তাই তাদের ব্যাপারে নমনীয় থাকতে হবে। এর ফলে এসব গ্রুপ ঘুরে দাঁড়াতে পারবে। এতে বিনিয়োগ সুরক্ষা পাবে। মানুষও চাকরি হারাবে না। সরকারও রাজস্ব পাবে, আর যেসব ব্যাংক ঋণ দিয়েছে, তারাও নিয়মিত কিস্তি পাবে, দেউলিয়া হবে না।

বড় গ্রুপগুলোকে সহায়তা করতে কেন্দ্রীয় একটি কমিটিও করা হয়েছিল। তারা পর্যালোচনা করে এবং দফায় দফায় বৈঠক করে যারা ইচ্ছাকৃত খেলাপি নয়, তাদেরকে সহায়তার পক্ষে মত দিয়েছিল। ওই কমিটির মেয়াদ শেষ হয়ে যাওয়ার পর ব্যাংকগুলোকে তা বাস্তবায়নের কথা বলে কেন্দ্রীয় ব্যাংক।

তবে বাংলাদেশ ব্যাংকের এই সিদ্ধান্ত ও মনোভাবের সম্পূর্ণ উল্টো পথে হাঁটছে এসআইবিএল ব্যাংক। ঋণখেলাপিতে বিপর্যস্ত ব্যাংকটির আর্থিক অবস্থা ভালো করতে সেখানে কেন্দ্রীয় ব্যাংক নিজ থেকে প্রশাসক নিয়োগ দেওয়ার সুফল মিলছে না। বরং প্রশাসকের দায়িত্ব নেওয়ার পর অভিযোগ উঠেছে, যাঁরা তাঁকে ‘বিশেষ সুবিধা’ দিতে পারছেন, তাঁদের ব্যাপারে নমনীয় হচ্ছেন। আর যাঁরা দিচ্ছেন না, তাঁদেরকে বাংলাদেশ ব্যাংকের সিদ্ধান্ত অমান্য করে নানা শর্তের জালে ফেলছেন।

বাংলাদেশ ব্যাংকের ত্রিপক্ষীয় সিদ্ধান্ত মতে, এসব গ্রুপ এসআইবিএলে ২ শতাংশ ডাউন পেমেন্টে ঋণ পুনঃতফসিলের আবেদন করলে উল্টো তাদের পুরো ঋণ শোধ অথবা পুরো ঋণটি অন্য কোনো ব্যাংকে স্থানান্তরের শর্ত দেয়। এর অর্থ হলো—বিপদে থাকা গ্রুপগুলো বাংলাদেশ ব্যাংকের সিদ্ধান্ত মতে ২ শতাংশ ডাউন পেমেন্টের সুবিধার বদলে বরং তাদের আরো বিপদের মুখে ঠেলে দেওয়া হলো। এতে তারা না পারবে ঋণ শোধ করতে, না পারবে ব্যবসা বা কারখানা সচল রাখতে কিংবা রাজস্ব দিতে। এমন সাংঘর্ষিক মনোভাবের ফলে কারোই লাভ হচ্ছে না। গ্রুপের পাশাপাশি ব্যাংকগুলোও কোনো টাকা পাচ্ছে না। এতে গ্রুপ-ব্যাংক উভয়েই আরো রুগ্ণ হওয়ার পথে। মাঝখানে মানুষের চাকরি হারানো আর সরকারের রাজস্ব ক্ষতি ছাড়া আর কিছুই নয়।

বাংলাদেশ ব্যাংকের নির্বাহী পরিচালক ও মুখপাত্র আরিফ হোসেন খান জানান, ‘নীতি-সহায়তা কমিটি এখন আর এলাইভ (কার্যকর) নেই। এখন ব্যাংকগুলোর ওপর দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে। ব্যাংকার-কাস্টমার সম্পর্কের ওপর ভিত্তি করে ব্যাংক চাইলে গ্রাহকদের স্বল্প ডাউন পেমেন্টে পুনঃতফসিল সুবিধা দিতে পারবে। আগে সুযোগ ছিল না, এখন বাংলাদেশ ব্যাংক নীতি-সহায়তার অংশ হিসেবে ঋণ পুনঃতফসিলের সুবিধা দিচ্ছে।’

তিনি আরো বলেন, বাংলাদেশ ব্যাংকের তত্ত্বাবধানে যখন নীতি-সহায়তা কমিটি গঠন করা হয়েছিল, তখন মোট দেড় হাজার আবেদন পড়েছিল। একই সঙ্গে তখন ৪০০টি কেস সেটেল করেছিল নীতি-সহায়তা কমিটি। এরপর সেই দায়িত্ব ওই সব ব্যাংকের ওপর ন্যস্ত করা হয়।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একটি বড় গ্রুপের একজন শীর্ষ নির্বাহী বলেন, প্রশাসক হিসেবে যাঁকে দেওয়া হয়েছে, তিনি বাংলাদেশ ব্যাংকের সিদ্ধান্তকে যাঁরা সুবিধা দিতে পারছেন তাঁদের দিচ্ছেন, অন্যদের পাত্তা দিচ্ছেন না। তিনি মাঠের খবর জানেন না। একটি শিল্প গ্রুপ কিভাবে চলে—এ সম্পর্কে তাঁর ধারণা নেই। অর্থনীতি যে স্থবির, মানুষ কাজ হারাচ্ছে, সরকার বড় অঙ্কের রাজস্ব ঘাটতির মুখে। এই খবর হয়তো তিনি রাখেন না বা তোয়াক্কা করছেন না। নতুন সরকারের প্রধানমন্ত্রী যেভাবে অর্থনীতির চাকা সচল করাকে অগ্রাধিকার দিচ্ছেন, এই বার্তা বা ‘স্পিরিট’ তিনি আমলে নিচ্ছেন না। তিনি অনেকটা স্রোতের বিপরীতে ছুটছেন। এতে না লাভ হচ্ছে ব্যাংকের, না গ্রুপের, না মানুষের, না সরকারের। সব পক্ষ এই ব্যক্তিস্বার্থের কাছে জিম্মি হয়ে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে।

দেশের অন্যতম শীর্ষ একটি গ্রুপের পক্ষ থেকে গত ৫ ফেব্রুয়ারি বাংলাদেশ ব্যাংকে একটি চিঠি দেওয়া হয়। সেখানে বলা হয়, বাংলাদেশ ব্যাংকের সিদ্ধান্ত মেনে তারা ঋণ পুনঃতফসিলের জন্য ২ শতাংশ ডাউন পেমেন্ট জমা দেয়। কিন্তু এটি গ্রহণ না করে এসআইবিএলের পক্ষ থেকে তা প্রত্যাখ্যান করা হয়। উল্টো পুরো টাকা শোধ করা অথবা অন্য ব্যাংকে ঋণটি স্থানান্তর করতে বলা হয়।

শিল্প গ্রুপটির ওই কর্মকর্তা বলেন, “আমরা যদি পুরো টাকা দিতে পারতাম, তাহলে তো বাংলাদেশ ব্যাংকের মধ্যস্থতায় ত্রিপক্ষীয় বৈঠকে সবার সম্মতির দরকার ছিল না; আবার বাংলাদেশ ব্যাংকের তা চিঠি দিয়ে সবাইকে মেনে চলতে বলারও প্রয়োজন ছিল না। টাকা দিতে পারলে তো এত কিছুর দরকার পড়ত না। সক্ষমতা কমে গেছে বলেই তো বাংলাদেশ ব্যাংক ইতিবাচক সাড়া দিয়েছে। অথচ বিষয়টি এখন এমন হয়েছে যে তা ‘কানার হাতে কুড়াল দেওয়ার’ মতো অবস্থা। এতে শিল্প সচল হওয়ার বদলে বরং অচল হওয়ার ঝুঁকি বেশি।”

দেশের অন্যতম শীর্ষ রপ্তানিকারক ও এসআইবিএলের বড় গ্রাহক থার্মেক্স গ্রুপের চেয়ারম্যান আবদুল কাদির মোল্লার সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করেও তাঁকে পাওয়া যায়নি। তবে ওই গ্রুপের এক কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, ‘আমাদের রপ্তানিমুখী শিল্পে বিপুল বিনিয়োগ রয়েছে। প্রচুরসংখ্যক কর্মী কাজ করছেন। এখন বাংলাদেশ ব্যাংক সুযোগ দেওয়ার পরও এসআইবিএল প্রশাসক নিজের পছন্দমতো যাঁদেরকে মনে করছেন, তাঁদেরকে সুযোগ দিচ্ছেন। অথচ আমাদের মতো অনেক গ্রুপ একই রকম সুযোগ পেলে কারখানা সচল রাখার পাশাপাশি কর্মীদেরও চাকরি হারাতে হয় না, ব্যাংকও লাভবান হয়। এভাবে পক্ষপাতদুষ্টতা থাকলে পরিণামে তা দেশেরই ক্ষতি।

এভাবে থার্মেক্স, ওরিয়ন, রূপায়ণ গ্রুপসহ দেশের আরো বেশ কিছু শীর্ষ গ্রুপ ব্যাংকটির প্রশাসকের রোষানলে পড়ে ব্যাবসায়িকভাবে চরম দুর্ভোগ পোহাচ্ছে বলে এসব গ্রুপের কর্মকর্তারা জানিয়েছেন।

এসআইবিএলের সাবেক চেয়ারম্যান মেজর (অব.) ডা. রেজাউল হক বলেন, ‘ব্যাংকটিকে অন্যায্যভাবে মার্জারে ফেলে এখানে প্রশাসক দিয়ে আমাদের ওপর জুলুম করা হয়েছে। আমরা জুলুমের শিকার। আমরা আদালতের মাধ্যমে এই জুলুম থেকে ব্যাংকটিকে রক্ষা করতে পারব বলে আশা করি। এরই মধ্যে আমরা আদালতের রুলনিশি পেয়েছি, শিগগিরই সংবাদ সম্মেলন করে বিস্তারিত জাতিকে অবহিত করা হবে।’

এসআইবিএল প্রশাসকের বক্তব্য : নানা অভিযোগের বিষয়ে এসআইবিএলের প্রশাসক মো. সালাহ উদ্দীন গতকাল বলেন, ‘আমরা বাংলাদেশ ব্যাংকের নির্দেশনা যা আছে, সে অনুযায়ী কাজ করছি। কারো প্রতি পক্ষপাত নেই। আগামী জুন মাস পর্যন্ত সময় রয়েছে। যেগুলো এখনো হয়নি সেগুলো আমরা বাছবিচার করছি। প্রক্রিয়া হচ্ছে। আমরা গ্রুপগুলোর প্রকৃত অবস্থা বিবেচনা করছি। অনেকে অনেক কিছু বলবে। অনেক ক্ষেত্রে ব্যারিয়ার থাকে। তার পরও সার্কুলারে যেভাবে বলা আছে, তা মেনে জুনের মধ্যে আমরা করে দেব আশা করছি।’

সৌজন্যে : কালের কণ্ঠ

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here