ঋণখেলাপি ও উচ্চ সুদ বিনিয়োগ-ব্যবসার বড় বাধা

0
ঋণখেলাপি ও উচ্চ সুদ বিনিয়োগ-ব্যবসার বড় বাধা

ব্যাংকিং খাতে ঋণখেলাপি ও উচ্চ সুদের হার বিনিয়োগ ও ব্যবসার সবচেয়ে বড় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে বলে পর্যবেক্ষণ দিয়েছে সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগ-সিপিডি। খেলাপি ঋণের বোঝা, সুদের হার নিয়ন্ত্রণে ব্যর্থতা ও স্বচ্ছতার অভাব এক সঙ্গে দেশের ব্যবসা পরিবেশকে ঝুঁকির মুখে ফেলছে।

গতকাল শনিবার রাজধানীর ধানমণ্ডিতে সিপিডি কার্যালয়ে ‘নতুন সরকারের অর্থনৈতিক ও সামাজিক খাতে নীতি ও প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত : ১৮০ দিন ও তারপর’ শীর্ষক মিডিয়া ব্রিফিংয়ে এসব পর্যবেক্ষণ তুলে ধরা হয়। সিপিডির প্রতিবেদনে বলা হয়, ব্যাংকিং খাতে দীর্ঘদিন ধরেই খেলাপি ঋণ বড় সমস্যা।

সরকারি ও বেসরকারি খাতের ব্যাংকেই অনাদায়ী ঋণ বাড়ছে, যা ব্যাংকের মূলধন সক্ষমতা দুর্বল করছে। খেলাপি ঋণ বেড়ে যাওয়ায় ব্যাংকগুলো নতুন করে ঋণ দিতে অনীহা দেখাচ্ছে এবং ঝুঁকি কমাতে সুদের হার বাড়াচ্ছে। এর সরাসরি প্রভাব পড়ছে উৎপাদনমুখী খাতে বিনিয়োগের ওপর। সিপিডির মতে, উচ্চ সুদহার ব্যবসার অন্যতম বড় প্রতিবন্ধকতা।

শিল্প ও বাণিজ্য খাতে ঋণের সুদ অনেক ক্ষেত্রে দুই অঙ্কে পৌঁছেছে, যা দীর্ঘমেয়াদি বিনিয়োগের জন্য অনুকূল নয়। উদ্যোক্তাদের বরাতে সিপিডি জানিয়েছে, ব্যাংক ঋণের সুদ ও অন্যান্য চার্জ মিলিয়ে প্রকল্প ব্যয় এতটাই বেড়ে যাচ্ছে যে অনেক বিনিয়োগ পরিকল্পনা উদ্যোক্তারা বাতিল করতে বাধ্য হচ্ছেন। নতুন উদ্যোক্তা ও ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীদের জন্য ব্যাংকঋণ কার্যত অধরা হয়ে উঠেছে।
সিপিডির প্রতিবেদনে বলা হয়, ঋণখেলাপির পেছনে রাজনৈতিক প্রভাব, দুর্বল তদারকি ও আইনি কাঠামোর সীমাবদ্ধতা বড় ভূমিকা রাখছে।

অনেক বড় ঋণগ্রহীতা নিয়মিত কিস্তি পরিশোধ না করেও নতুন ঋণ সুবিধা পাচ্ছেন, যা ব্যাংকিং শৃঙ্খলা ভঙ্গ করছে। এতে সৎ ও নিয়মিত গ্রাহকরা ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন এবং ব্যাংকিং ব্যবস্থার ওপর আস্থা কমছে। খেলাপি ঋণের বিরুদ্ধে কঠোর আইনি ব্যবস্থা না নিলে সুদের হার কমানো সম্ভব হবে না।

কর্মসংস্থানের অন্যতম প্রধান উৎস হলেও এসএমই খাতের উদ্যোক্তারা সহজ শর্তে ঋণ পাচ্ছেন না। অনেক উদ্যোক্তাকে উচ্চ সুদে বেসরকারি আর্থিক প্রতিষ্ঠান বা অনানুষ্ঠানিক উৎস থেকে ঋণ নিতে হচ্ছে, যা তাঁদের ব্যবসার ঝুঁকি বাড়িয়ে দিচ্ছে। এসএমই খাতের জন্য স্বল্পসুদে ও সহজ শর্তে বিশেষ তহবিল গঠনের সুপারিশ করেছে সিপিডি।

প্রতিবেদনে বলা হয়, ব্যাংকিং খাতে সুদের হার সামগ্রিক আর্থিক ব্যবস্থার দুর্বলতার কারণেও বাড়ছে। তারল্য সংকটে আমানতের ওপর সুদ বাড়াতে হচ্ছে ব্যাংকগুলোকে। একদিকে আমানতের সুদ বাড়ছে, অন্যদিকে ঋণের সুদ কমানো সম্ভব হচ্ছে না। ফলে উৎপাদনমুখী খাতে বিনিয়োগ নিরুৎসাহিত হচ্ছে এবং অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ঝুঁকির মুখে পড়ছে। সিপিডি মনে করে, ব্যাংকিং খাত সংস্কার ছাড়া সরকারের অন্য কোনো অর্থনৈতিক উদ্যোগ টেকসই হবে না। কর সংস্কার, ব্যবসা পরিবেশ উন্নয়ন বা বিদেশি বিনিয়োগ আকর্ষণ—সবকিছুই নির্ভর করছে স্থিতিশীল ও বিশ্বাসযোগ্য ব্যাংকিং ব্যবস্থার ওপর। কিন্তু বর্তমানে ব্যাংকিং খাতে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহির ঘাটতি রয়েছে। ঋণ অনুমোদন ও পুনঃতফসিলীকরণ প্রক্রিয়ায় স্বচ্ছতা না থাকায় নীতিগত দুর্বলতা আরো গভীর হচ্ছে। উচ্চ সুদের হার ও খেলাপি ঋণের সংস্কৃতি বিনিয়োগকারীদের জন্য নেতিবাচক বার্তা দিচ্ছে। ফলে সম্ভাব্য বিনিয়োগ অনেক ক্ষেত্রে প্রতিবেশী দেশগুলোর দিকে চলে যাচ্ছে উল্লেখ করে সিপিডি ব্যাংকিং খাত সংস্কারে কয়েকটি দিকের বিষয়ে বিশেষ গুরুত্ব দিয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে খেলাপি ঋণের বিরুদ্ধে কঠোর আইনি ব্যবস্থা নেওয়া, বড় ঋণগ্রহীতাদের বিশেষ সুবিধা বন্ধ করা, ব্যাংক পরিচালনা পর্ষদে পেশাদারি নিশ্চিত করা এবং কেন্দ্রীয় ব্যাংকের তদারকি শক্তিশালী করা। একই সঙ্গে ঋণ পুনঃতফসিল ও অবলোপনের ক্ষেত্রে স্বচ্ছ নীতিমালার সুপারিশ করা হয়েছে।

সিপিডির গবেষণা পরিচালক খন্দকার গোলাম মোয়াজ্জেম বলেন, আর্থিক খাতে যে সংস্কারগুলো হয়েছে, তা অনেকটাই ব্যক্তি উদ্যোগে হয়েছে।  সেই সংস্কারের ধারাবাহিকতা বজায় রাখা দরকার ছিল। যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে বিদায়ি সরকারের অন্তর্বর্তী বাণিজ্য চুক্তিকে বৈষম্যমূলক আখ্যা দিয়ে তা বাতিলের আহবান জানায় সিপিডি। ড. খন্দকার গোলাম মোয়াজ্জেম বলেন, এই চুক্তি দেশের অর্থনৈতিক স্বার্থে দীর্ঘ মেয়াদে ক্ষতিকর হতে পারে এবং নতুন সরকারের উচিত তা পুনর্বিবেচনা করা।

তিনি জানান, চুক্তি অনুযায়ী বাংলাদেশকে মার্কিন সীমান্তনীতি মেনে চলতে হবে, যুক্তরাষ্ট্রের পণ্যের ওপর প্রতিশোধমূলক শুল্ক বা ভ্যাট আরোপ করা যাবে না এবং সেবা খাত মার্কিন প্রতিষ্ঠানের জন্য উন্মুক্ত রাখতে হবে। এমনকি দেশে বাণিজ্যিকভাবে প্রবেশ করতে চাওয়া মার্কিন নাগরিক বা প্রতিষ্ঠানের ওপর নিজস্ব শর্ত আরোপের সুযোগও সীমিত হবে। ডিজিটাল বাণিজ্যেও কঠোর শর্ত রয়েছে, মার্কিন প্রযুক্তি কম্পানির ওপর ডিজিটাল সার্ভিস কর আরোপ বা ইলেকট্রনিক ট্রান্সমিশনে কাস্টমস ডিউটি বসানো যাবে না। মোয়াজ্জেম প্রশ্ন তোলেন, একটি অনির্বাচিত সরকার কিভাবে এমন দীর্ঘমেয়াদি দায় রেখে যেতে পারে? একই সঙ্গে জাপানের সঙ্গে করা ইকোনমিক পার্টনারশিপ অ্যাগ্রিমেন্ট নিয়ে সংস্থাটি জানায়, এটি দেশের জ্বালানি রূপান্তর বিলম্বিত করতে পারে। বিদ্যুৎ খাত প্রসঙ্গে সিপিডি জানায়, অতিরিক্ত উৎপাদন সক্ষমতা ও সক্ষমতা চার্জ অর্থনীতির ওপর বাড়তি চাপ সৃষ্টি করছে।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here