প্রায় দুই সপ্তাহ ধরে বিক্ষোভে উত্তাল হয়ে উঠেছে ইরান। সময় গড়ানোর সঙ্গে সঙ্গে সহিংসতা আরও বাড়ছে এবং প্রাণহানির সংখ্যাও বেড়েই চলেছে। বিভিন্ন মানবাধিকার সংগঠনের তথ্য অনুযায়ী, চলমান বিক্ষোভে এখন পর্যন্ত অন্তত ৫৮ জন নিহত হয়েছেন। আহতদের চাপে দেশটির হাসপাতালগুলোতে তৈরি হয়েছে ভয়াবহ সংকট।
ইরানের চিকিৎসকদের বরাতে বিবিসি জানিয়েছে, বিক্ষোভ দ্বিতীয় সপ্তাহে প্রবেশ করার পর থেকেই হাসপাতালগুলোতে আহতদের ভিড় অস্বাভাবিকভাবে বাড়তে শুরু করেছে। তেহরানের একটি চক্ষু হাসপাতাল বর্তমানে গুরুতর সংকটের মুখে পড়েছে বলে জানিয়েছেন সেখানে কর্মরত এক চিকিৎসক। তিনি বলেন, রোগীর চাপ এত বেশি যে স্বাভাবিক চিকিৎসাসেবা ব্যাহত হচ্ছে।
অন্যদিকে, তেহরানের আরেকটি হাসপাতালের এক চিকিৎসক বিবিসিকে পাঠানো বার্তায় জানিয়েছেন, আহত রোগীদের ভিড় সামলাতে পর্যাপ্ত সার্জন নেই। জরুরি পরিস্থিতি মোকাবিলায় চিকিৎসক ও স্বাস্থ্যকর্মীদের অতিরিক্ত দায়িত্ব নিতে হচ্ছে।
শুক্রবার মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প বলেন, ইরান বড় সমস্যার মধ্যে পড়েছে। একই সঙ্গে তিনি সতর্ক করে বলেন, গুলি চালানো উচিত নয়, কারণ পাল্টা প্রতিক্রিয়া আসতে পারে। তার এই মন্তব্যের পর আন্তর্জাতিক অঙ্গনে পরিস্থিতি নিয়ে উদ্বেগ আরও বেড়েছে।
জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদে পাঠানো এক চিঠিতে ইরান সরকার চলমান বিক্ষোভকে সহিংস নাশকতামূলক কর্মকাণ্ড এবং ব্যাপক ভাঙচুর হিসেবে উল্লেখ করেছে। একই সঙ্গে এসব ঘটনার জন্য যুক্তরাষ্ট্রকে দায়ী করা হয়েছে।
এরই মধ্যে বিশ্বের বিভিন্ন দেশের নেতারা ইরানে শান্তিপূর্ণ প্রতিবাদের অধিকার রক্ষার আহ্বান জানিয়েছেন। রাজধানী তেহরানসহ দেশটির বড় বড় শহরগুলোতে বিক্ষোভ অব্যাহত রয়েছে এবং থামার কোনো লক্ষণ দেখা যাচ্ছে না।
দুটি মানবাধিকার সংগঠন জানিয়েছে, বিক্ষোভ শুরুর পর থেকে অন্তত ৫০ জন বিক্ষোভকারী নিহত হয়েছেন। পাশাপাশি ১৫ জন নিরাপত্তা কর্মীর মৃত্যুর খবরও পাওয়া গেছে। তবে ইরানের অভ্যন্তরে সংবাদ সংগ্রহে বিবিসি ও অন্যান্য আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমের ওপর নিষেধাজ্ঞা থাকায় প্রকৃত চিত্র পাওয়া কঠিন হয়ে পড়েছে।
পরিস্থিতি আরও জটিল হয়ে উঠেছে ইন্টারনেট সেবা বন্ধ হয়ে যাওয়ায়। বৃহস্পতিবার সন্ধ্যা থেকে দেশটিতে ইন্টারনেট কার্যত অচল। ফলে তথ্য সংগ্রহ ও যাচাই করা কঠিন হয়ে পড়েছে বলে জানিয়েছে আন্তর্জাতিক সংবাদ সংস্থাগুলো।
স্টারলিংক স্যাটেলাইট ইন্টারনেটের মাধ্যমে বিবিসির সঙ্গে যোগাযোগ করা তেহরানের এক চিকিৎসক জানিয়েছেন, দেশটির প্রধান চক্ষু বিশেষজ্ঞ কেন্দ্র ফারাবি হাসপাতাল মারাত্মক সংকটে রয়েছে। জরুরি পরিষেবাগুলোও বিপর্যস্ত অবস্থায় আছে। জরুরি নয় এমন ভর্তি ও অস্ত্রোপচার স্থগিত করা হয়েছে এবং অতিরিক্ত কর্মীদের ডেকে আনা হয়েছে।
দক্ষিণ পশ্চিমাঞ্চলীয় শহর শিরাজের একটি হাসপাতালের এক চিকিৎসকের কাছ থেকেও বিবিসি ভিডিও ও অডিও বার্তা পেয়েছে। ওই চিকিৎসক জানান, আহত অনেক রোগীকে হাসপাতালে আনা হচ্ছে, কিন্তু সার্জনের সংখ্যা প্রয়োজনের তুলনায় কম। তার দাবি, আহতদের অনেকের মাথা ও চোখে গুলি লেগেছে।
যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক একটি সংগঠন জানিয়েছে, ২৮ ডিসেম্বর বিক্ষোভ শুরু হওয়ার পর থেকে অন্তত ৫০ জন বিক্ষোভকারী এবং ১৫ জন নিরাপত্তা কর্মী নিহত হয়েছেন। এ ছাড়া দুই হাজার ৩১১ জনের বেশি মানুষকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে।
নরওয়েভিভিত্তিক ইরান হিউম্যান রাইটস জানিয়েছে, নয় শিশুসহ অন্তত ৫১ জন বিক্ষোভকারী নিহত হয়েছেন। বিবিসি পার্সিয়ান নিহতদের ২২ জনের পরিবারের সঙ্গে কথা বলে তাদের পরিচয় নিশ্চিত করেছে।
জাতিসংঘ মহাসচিবের মুখপাত্র স্টিফেন দুজারিক বলেন, ইরানে প্রাণহানির ঘটনায় জাতিসংঘ গভীরভাবে উদ্বিগ্ন। তিনি বলেন, বিশ্বের যেকোনো প্রান্তের মানুষের শান্তিপূর্ণভাবে বিক্ষোভ করার অধিকার রয়েছে এবং সেই অধিকার রক্ষা ও সম্মান করা সংশ্লিষ্ট সরকারের দায়িত্ব।
সোর্স: বিবিসি, এএফপি

