ইরান যুদ্ধে খাঁচায় আটকে গেছেন ট্রাম্প, বের হওয়ার পথও নেই!

0
ইরান যুদ্ধে খাঁচায় আটকে গেছেন ট্রাম্প, বের হওয়ার পথও নেই!

মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের ঘোষিত ‘অপারেশন এপিক ফিউরি’ এখন এক চরম অনিশ্চয়তার মুখে দাঁড়িয়েছে। ছয় সপ্তাহ আগে শুরু হওয়া এই সামরিক অভিযানের মাধ্যমে মধ্যপ্রাচ্যে যে পরিবর্তনের স্বপ্ন ওয়াশিংটন দেখেছিল, বর্তমানে তা এক দীর্ঘস্থায়ী যুদ্ধের চোরাবালিতে রূপ নিচ্ছে। 

ইসলামি প্রজাতন্ত্র ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আলি খামেনিকে হত্যার পর তেহরানের পক্ষ থেকে যে পাল্টা আক্রমণ শুরু হয়েছে, তা কেবল অঞ্চলেই সীমাবদ্ধ নেই বরং পুরো বিশ্ব অর্থনীতিকে নাড়িয়ে দিচ্ছে। ওয়াশিংটনের নীতিনির্ধারকরা এই যুদ্ধের পরবর্তী ধাপ নিয়ে যে হিসাব কষেছিলেন, তা বাস্তবে ভিন্ন রূপ ধারণ করায় এখন খোদ প্রশাসনের ভেতরেই প্রশ্ন উঠতে শুরু করেছে।

হরমুজ প্রণালী বর্তমানে বিশ্বের অন্যতম বিপজ্জনক রণক্ষেত্রে পরিণত হয়েছে, যেখান দিয়ে বিশ্বের মোট জ্বালানি তেলের প্রায় এক-পঞ্চমাংশ পরিবাহিত হয়। যুদ্ধের ফলে বৈশ্বিক তেলের বাজারে যে অস্থিরতা তৈরি হয়েছে, তাতে তেলের দাম গত ছয় সপ্তাহে প্রায় ৩১ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়েছে। 

জ্বালানি বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করেছেন যে, যুদ্ধ থেমে গেলেও তেল অবকাঠামোর যে অপূরণীয় ক্ষতি হয়েছে, তার প্রভাব অন্তত ২০২৬ সালের শেষ নাগাদ পর্যন্ত বজায় থাকবে। তেহরানের ওপর ক্রমাগত চাপ প্রয়োগ করার যে নীতি ওয়াশিংটন গ্রহণ করেছে, তা আদতে কেবল ইরানকে নয় বরং টোকিও, সিউল এবং বার্লিনের মতো মিত্রদের অর্থনীতিকেও চরম সংকটে ফেলে দিয়েছে।

ইসলামাবাদে গত ২১ ঘণ্টার ম্যারাথন আলোচনা কোনো সমঝোতা ছাড়াই শেষ হওয়ায় পরিস্থিতি আরও জটিল হয়ে উঠেছে। ১৯৭৯ সালের ইসলামি বিপ্লবের পর এটিই ছিল ওয়াশিংটন ও তেহরানের মধ্যে সর্বোচ্চ পর্যায়ের সরাসরি বৈঠক। কিন্তু মার্কিন প্রশাসনের পক্ষ থেকে ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি পুরোপুরি বন্ধ করা এবং হরমুজ প্রণালীর নিয়ন্ত্রণ ছেড়ে দেওয়ার মতো যে কঠিন শর্তগুলো দেওয়া হয়েছে, তা মেনে নিতে তেহরান সাফ না করে দিয়েছে। তেহরানের পক্ষ থেকে এখন যুদ্ধের ক্ষতিপূরণ এবং একটি স্থায়ী আঞ্চলিক যুদ্ধবিরতির দাবি তোলা হচ্ছে, যা ট্রাম্প প্রশাসনের কাছে প্রায় অসম্ভব মনে হচ্ছে।

এদিকে ইরানের ওপর ‘সর্বোচ্চ চাপ’ প্রয়োগের নীতি হিতে বিপরীত হতে শুরু করেছে। ঐতিহাসিকভাবে দেখা গেছে যে, কোনো বিদেশি শক্তির আক্রমণ দেশের অভ্যন্তরে থাকা বিভেদ কমিয়ে জাতীয়তাবাদকে চাঙ্গা করে তোলে। ইরানের জনগণের মনে সরকারের বিরুদ্ধে নানা ক্ষোভ থাকলেও, আমেরিকান বোমাবর্ষণ এবং অর্থনৈতিক অবরোধ তাদের এখন বিদেশি শত্রুর বিরুদ্ধে ঐক্যবদ্ধ হতে বাধ্য করছে।

মার্কিন নীতিনির্ধারকরা ভেবেছিলেন যে হামলার ফলে ইরান সরকার দ্রুত ভেঙে পড়বে, কিন্তু বাস্তবতা হলো শাসনব্যবস্থা আরও কঠোর ও বেপরোয়া হয়ে উঠেছে।
ইরানের শক্তিশালী সামরিক প্রক্সি নেটওয়ার্কগুলোও বসে নেই। হিজবুল্লাহ এবং হুথি বিদ্রোহীরা লোহিত সাগরে এবং ইসরায়েলের সীমান্তে নতুন করে সংঘাতের মাত্রা বাড়িয়ে দিয়েছে। মার্কিন প্রশাসনের পক্ষ থেকে ইরানকে চারপাশ থেকে ঘিরে ফেলার যে পরিকল্পনা ছিল, তা এখন যুক্তরাষ্ট্রকেই একটি আঞ্চলিক যুদ্ধের আবর্তে টেনে আনছে। বিশেষ করে তেহরানের পারমাণবিক কর্মসূচির ওপর যে বিধিনিষেধ ছিল, তা এখন খামেনির মৃত্যুর পর কোনো নিয়ম-নীতির তোয়াক্কা করছে না। কট্টরপন্থীরা এখন পারমাণবিক অস্ত্র অর্জনের পথে আরও একধাপ এগিয়ে যাওয়ার সুযোগ খুঁজছে।

ভূ-রাজনীতির এই টানাপোড়েনে বেইজিং এখন সুবিধাজনক অবস্থানে রয়েছে। চীন নিজেকে একজন মধ্যস্থতাকারী হিসেবে তুলে ধরার চেষ্টা করছে, যা মধ্যপ্রাচ্যে আমেরিকার দীর্ঘদিনের আধিপত্যকে সরাসরি চ্যালেঞ্জ জানাচ্ছে। অন্যদিকে ভারতের মতো দেশগুলো যারা মধ্যপ্রাচ্যের তেলের ওপর অতিমাত্রায় নির্ভরশীল, তারা ওয়াশিংটনের এই একতরফা অবরোধের ফলে চরম বিপাকে পড়েছে। ট্রাম্প প্রশাসনের মিত্ররা এখন প্রকাশ্যে না হলেও ভেতরে ভেতরে আমেরিকার এই হঠকারী সিদ্ধান্তের সমালোচনা করছে এবং যুদ্ধের বিকল্প পথ খোঁজার জন্য চাপ দিচ্ছে।

বিশ্লেষকদের মতে, ইরানের মতো একটি দেশ যার জনসংখ্যা ৯ কোটির উপরে এবং যার সীমান্ত ইরাক, আফগানিস্তান ও পাকিস্তানের সাথে যুক্ত, সেখানে জোরপূর্বক শাসন পরিবর্তন করা এক ভয়াবহ মানবিক বিপর্যয় ডেকে আনতে পারে। এর আগে ইরাক এবং আফগানিস্তানে আমেরিকার যে করুণ পরিণতি হয়েছিল, ইরান যুদ্ধের ক্ষেত্রে সেই একই ভুলের পুনরাবৃত্তি লক্ষ্য করা যাচ্ছে। ওয়াশিংটন যুদ্ধ শুরু করার ক্ষমতা রাখলেও, এই যুদ্ধ শেষ করে একটি স্থিতিশীল পরিবেশ ফিরিয়ে আনার কোনো সুস্পষ্ট রূপরেখা তাদের হাতে নেই।

বর্তমান পরিস্থিতিতে একটি সম্মানজনক সমঝোতাই হতে পারে এই সংকট থেকে উত্তরণের একমাত্র পথ। ইরানকে পুরোপুরি পরাজিত করে হাঁটু গেড়ে বসানোর যে স্বপ্ন হোয়াইট হাউস দেখছে, তা অর্জিত হওয়া প্রায় অসম্ভব। এর বদলে উভয় পক্ষের পিছু হটে আসা এবং বৈশ্বিক অর্থনীতির স্বার্থে হরমুজ প্রণালীকে সচল রাখা এখন সবচেয়ে বড় প্রয়োজন। বাস্তববাদী রাজনীতি বা রিয়েলিজমকে গুরুত্ব না দিলে এই যুদ্ধ কেবল ট্রাম্পের ক্ষমতার জন্যই নয়, বরং মার্কিন বৈশ্বিক নেতৃত্বের জন্যও এক বড় পরাজয় হিসেবে চিহ্নিত হয়ে থাকবে।

এশিয়া টাইমসের বিশ্লেষণ

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here