মধ্যপ্রাচ্যের রণক্ষেত্রে নতুন অনিশ্চয়তার মেঘ ঘনীভূত হচ্ছে। যুদ্ধের শুরুর দিকে মনে করা হয়েছিল এর লাগাম পুরোপুরি যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের হাতে রয়েছে কিন্তু বর্তমান পরিস্থিতি ভিন্ন কথা বলছে। বিশেষ করে হরমুজ প্রণালিতে ইরানের অবরোধ বিশ্ব অর্থনীতিকে এক প্রকার স্থবির করে দিলেও তেহরানে ক্ষমতার পটপরিবর্তনের কোনো লক্ষণ দেখা যাচ্ছে না। বিশ্লেষকদের মতে, প্রাথমিক সামরিক শ্রেষ্ঠত্ব সত্ত্বেও যুদ্ধের গতিপথ এখন ক্রমশ অস্পষ্ট হয়ে উঠছে।
ইরানের বিপ্লবী গার্ডের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা মহসেন রেজায়ির সাম্প্রতিক বক্তব্যে এই আত্মবিশ্বাসের প্রতিফলন ঘটেছে। তিনি সরাসরি জানিয়েছেন, যুদ্ধের সমাপ্তি কখন এবং কীভাবে হবে, তা নির্ধারণ করবে ইরান। রেজায়ি কেবল ওয়াশিংটনের বাহিনী প্রত্যাহারের দাবিই জানাননি, বরং হামলার ফলে হওয়া সমস্ত ক্ষয়ক্ষতির জন্য ক্ষতিপূরণও দাবি করেছেন। মাত্র কয়েক সপ্তাহ আগেও তেহরানের কোনো কর্মকর্তার কাছ থেকে এমন কঠোর অবস্থান আশা করা ছিল অকল্পনীয়।
এই যুদ্ধের সূত্রপাত হয়েছিল ইসরায়েলের এক আকস্মিক হামলায় ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলি খামেনির মৃত্যুর মধ্য দিয়ে। পরবর্তী সময়ে মার্কিন ও ইসরায়েলি বিমানবাহিনী ইরানে কয়েক হাজার লক্ষ্যবস্তুতে হামলা চালিয়ে তাদের আকাশপথের নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করে। সেই সময় মনে করা হচ্ছিল, ইরানের সামরিক সক্ষমতা পুরোপুরি ধ্বংস করে দেওয়া সম্ভব হবে। কিন্তু দীর্ঘস্থায়ী লড়াইয়ের ময়দানে সেই শুরুর দাপট এখন প্রশ্নের মুখে পড়েছে।
ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্রের অব্যাহত আগ্রাসনের জবাবে ইরানও দমে থাকেনি। তারা ইসরায়েলের ভূখণ্ড লক্ষ্য করে ব্যাপক ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলা চালিয়েছে। যদিও ইসরায়েলের উন্নত প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা এসব হামলার সিংহভাগ রুখে দিতে সক্ষম হয়েছে, তবুও এই পাল্টাপাল্টি আক্রমণ যুদ্ধের পরিধিকে বিস্তৃত করেছে। এখন পর্যন্ত ইসরায়েলি ভূখণ্ডে অন্তত ১২ জনের মৃত্যু নিশ্চিত করা হয়েছে, যা দেশটির সাধারণ জনজীবনে এক ধরণের ভীতি ছড়িয়ে দিয়েছে।
সবচেয়ে বড় কৌশলগত পরিবর্তন এসেছে হরমুজ প্রণালি বন্ধ হওয়ার মধ্য দিয়ে। বিশ্বের মোট জ্বালানি তেলের এক-পঞ্চমাংশ এই পথ দিয়ে পরিবাহিত হয়। এই জলপথটি ইরানের নিয়ন্ত্রণে চলে যাওয়ায় আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দাম হু হু করে বাড়ছে। এর ফলে মার্কিন প্রেসিডেন্ট কেবল অভ্যন্তরীণ চাপের মুখেই পড়েননি বরং বিশ্ব অর্থনীতির স্থিতিশীলতা রক্ষায় আন্তর্জাতিক মহলের তীব্র সমালোচনারও সম্মুখীন হচ্ছেন।
কিংস কলেজ লন্ডনের নিরাপত্তা বিশেষজ্ঞ পিটার নিউম্যান মনে করেন, হরমুজ প্রণালিতে এই অচলাবস্থা নিরসনে যুক্তরাষ্ট্রের কোনো কার্যকর পূর্বপ্রস্তুতি ছিল না। ডোনাল্ড ট্রাম্প একটি আন্তর্জাতিক জোট গঠনের আহ্বান জানালেও এখন পর্যন্ত কোনো দেশ এই ঝুঁকি নিতে রাজি হয়নি। বিশাল ট্যাংকার বহরকে পাহারা দিয়ে নিয়ে যাওয়া যেমন ব্যয়বহুল, তেমনি ইরানের একটি ছোট ড্রোন বা বিস্ফোরকবাহী বোটের হামলা ঠেকানোও অত্যন্ত কঠিন কাজ।
অন্যদিকে ইসরায়েলি বিশ্লেষক ড্যানি ওরবাখ মনে করেন, ইরান আসলে পিঠ দেয়ালে ঠেকে যাওয়াতে মরিয়া হয়ে যুদ্ধ ছড়িয়ে দিচ্ছে। তার মতে, তেহরানের ক্ষেপণাস্ত্রের মজুত ফুরিয়ে আসায় তারা এখন বৈশ্বিক সরবরাহ ব্যবস্থাকে জিম্মি করে যুদ্ধ থামানোর চেষ্টা করছে। তবে বাস্তবতা হলো, ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্র ইরানে যে শাসনব্যবস্থার পতনের স্বপ্ন দেখেছিল, তার কোনো বাস্তব প্রতিফলন বর্তমানে দেশটির রাজনৈতিক কাঠামোর ভেতরে লক্ষ্য করা যাচ্ছে না।
লেবানন ফ্রন্টেও হিজবুল্লাহর প্রতিরোধ ইসরায়েলের জন্য মাথাব্যথার কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। ব্যাপক বিমান হামলা এবং কয়েক লাখ মানুষের বাস্তুচ্যুতির পরেও হিজবুল্লাহ তাদের আক্রমণ অব্যাহত রেখেছে। সামরিকভাবে ইসরায়েল অনেক বেশি শক্তিশালী হওয়া সত্ত্বেও ইরান ও তার মিত্ররা দীর্ঘমেয়াদি যুদ্ধে টিকে থাকার যে কৌশল গ্রহণ করেছে, তাতে মনে হচ্ছে যুদ্ধের শেষ সিদ্ধান্তটি শেষ পর্যন্ত তেহরানের হাতেই চলে যেতে পারে।
সূত্র: গার্ডিয়ান

