ইরান চালায় কারা, নেপথ্যে ক্ষমতার আসল ছবি যা…

0
ইরান চালায় কারা, নেপথ্যে ক্ষমতার আসল ছবি যা…

ইরানের প্রকৃত ক্ষমতার কেন্দ্রবিন্দু হলেন সর্বোচ্চ নেতা। বর্তমানে এই পদে রয়েছেন ৮৬ বছর বয়সী আয়াতুল্লাহ আলি খামেনি। গত ৩৫ বছরের বেশি সময় ধরে তিনি দেশটির শাসনক্ষমতায় আছেন। ইরানের রাষ্ট্রপ্রধান হিসেবে চূড়ান্ত সব সিদ্ধান্ত তাঁর হাতেই। অভ্যন্তরীণ নীতি থেকে শুরু করে পররাষ্ট্রনীতি পর্যন্ত সব গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্তে তাঁর প্রভাব নিরঙ্কুশ।

ইরানের সামরিক বাহিনী, বিপ্লবী গার্ড এবং অন্যান্য নিরাপত্তা সংস্থা সরাসরি খামেনির নির্দেশনায় পরিচালিত হয়। অতীতে সরকারবিরোধী বিক্ষোভ দমনে কঠোর বলপ্রয়োগের অনুমতিও দিয়েছেন তিনি। সাম্প্রতিক সময়েও সেই কৌশলের পুনরাবৃত্তি দেখা যাচ্ছে।

খামেনির স্বাস্থ্য নিয়ে নানা গুঞ্জন শোনা গেলেও এখন পর্যন্ত তাঁর আনুষ্ঠানিক কোনো উত্তরসূরির নাম ঘোষণা করা হয়নি। ফলে ভবিষ্যৎ নেতৃত্ব নিয়ে ইরানের ভেতরে ও বাইরে অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে।

গার্ডিয়ান কাউন্সিল ইরানের অন্যতম প্রভাবশালী একটি সংস্থা। ১২ সদস্যের এই কাউন্সিলের সদস্য নিয়োগ দেন সর্বোচ্চ নেতা। তাদের প্রধান দায়িত্ব হলো নির্বাচন তদারকি এবং আইন পর্যালোচনা। সংসদ বা প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে কে প্রার্থী হতে পারবেন, সে সিদ্ধান্তও এই কাউন্সিল নেয়।

এই কাউন্সিল নিয়মিতভাবে সংস্কারপন্থী ও সমালোচনামূলক প্রার্থীদের অযোগ্য ঘোষণা করে। ফলে ভোটারদের প্রকৃত পছন্দের সুযোগ সীমিত হয়ে পড়ে। সংসদের পাস করা যেকোনো আইন তারা বাতিল বা পরিবর্তন করতে পারে।

ইরানের প্রেসিডেন্ট সরকারপ্রধান হলেও তাঁর ক্ষমতা সীমিত। বর্তমানে মাসুদ পেজেশকিয়ান দেশটির প্রেসিডেন্ট। ২০২৪ সালের নির্বাচনে তিনি কট্টরপন্থী প্রতিদ্বন্দ্বীকে পরাজিত করে জয়ী হন। সংস্কারপন্থী হিসেবে পরিচিত হলেও খামেনির অনুমোদন ছাড়া বড় কোনো নীতি পরিবর্তন তাঁর পক্ষে সম্ভব নয়।

ইরানে প্রতি চার বছর অন্তর প্রেসিডেন্ট ও সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়। ১৮ বছর বা তার বেশি বয়সী নাগরিকরা ভোট দিতে পারেন। তবে গার্ডিয়ান কাউন্সিলের কঠোর নজরদারির কারণে এই নির্বাচনব্যবস্থা কতটা কার্যকর, তা নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে দীর্ঘদিন ধরেই।

চলমান অর্থনৈতিক সংকটকে কেন্দ্র করে ইরানে টানা ১৩ দিন ধরে বিক্ষোভ চলছে। দেশটির ৩১টি প্রদেশেই এই আন্দোলন ছড়িয়ে পড়েছে। বিক্ষোভ দমনে সরকার কঠোর পদক্ষেপ নিয়েছে। সর্বশেষ খবরে জানা গেছে, ১৮ ঘণ্টার বেশি সময় ধরে ইরানে ইন্টারনেট সংযোগ বন্ধ রয়েছে। আন্তর্জাতিক ইন্টারনেট অবকাঠামো প্রতিষ্ঠান ক্লাউডফ্লেয়ার জানিয়েছে, অধিকাংশ প্রদেশ কার্যত অফলাইনে রয়েছে।

গত ২৮ ডিসেম্বর তেহরানে বিক্ষোভের সূত্রপাত হয় ইরানি মুদ্রার ভয়াবহ দরপতনের পর। পরে তা দ্রুত অন্যান্য শহরে ছড়িয়ে পড়ে। বিবিসি ভেরিফাই স্যাটেলাইট চিত্রের মাধ্যমে চলমান আন্দোলনের বিভিন্ন দিক পর্যবেক্ষণ করছে।

এক ২৯ বছর বয়সী বিক্ষোভকারী বিবিসিকে বলেন, মানুষ এখন আরও সাহসী হয়ে উঠছে। বাজারে নিত্যপণ্য কিনতে গিয়ে দিনের আলোতেই মানুষ প্রকাশ্যে সরকারের বিরুদ্ধে কথা বলছে।

ইন্টারনেট বন্ধ থাকায় দেশের বাইরে থাকা অনেক ইরানি প্রবাসী পরিবারগুলোর সঙ্গে যোগাযোগ করতে পারছেন না। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া ভিডিও ও প্রত্যক্ষদর্শীদের বক্তব্যের ওপর নির্ভর করেই পরিস্থিতি মূল্যায়ন করা হচ্ছে।

আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমের সরাসরি প্রবেশ নিষিদ্ধ থাকায় বিবিসি ও অন্যান্য সংবাদমাধ্যম সোশ্যাল মিডিয়া, উপগ্রহচিত্র এবং প্রত্যক্ষ সাক্ষ্যের মাধ্যমে তথ্য যাচাই করছে।

এর আগে ২০২২ ও ২০২৩ সালে মাহসা আমিনির মৃত্যুকে কেন্দ্র করে ইরানে ব্যাপক বিক্ষোভ হয়েছিল। ২২ বছর বয়সী এই তরুণীকে পোশাকবিধি লঙ্ঘনের অভিযোগে আটক করার পর পুলিশি হেফাজতে তাঁর মৃত্যু হয়। চলমান বিক্ষোভের মধ্যেই মানবাধিকার সংগঠনগুলো অভিযোগ করেছে, আহত বিক্ষোভকারীদের আটক করতে হাসপাতালেও অভিযান চালাচ্ছে ইরানি কর্তৃপক্ষ।

১৩ দিনের এই আন্দোলনে এখন পর্যন্ত অন্তত ৪৫ জন নিহত হয়েছেন বলে জানা গেছে। বিভিন্ন প্রদেশে আটক হয়েছেন দুই হাজারের বেশি মানুষ।

সোর্স: এএফপি, বিবিসি, ক্লাউডফ্লেয়ার

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here