ইরান-আমেরিকা যুদ্ধ ন্যাটোকে শেষ করে দেবে?

0
ইরান-আমেরিকা যুদ্ধ ন্যাটোকে শেষ করে দেবে?

মধ্যপ্রাচ্যে ইরানকে কেন্দ্র করে আমেরিকা ও ইসরায়েলের ক্রমবর্ধমান সামরিক তৎপরতা কেবল একটি আঞ্চলিক যুদ্ধ নয় বরং এটি পশ্চিমা বিশ্বের রাজনৈতিক ও কৌশলগত ঐক্যের জন্য এক কঠিন পরীক্ষার মঞ্চ হয়ে দাঁড়িয়েছে। ওয়াশিংটনের একতরফা সিদ্ধান্ত এবং সামরিক উসকানি দীর্ঘদিনের আটলান্টিক জোটের (ন্যাটো) ভেতরে ফাটল ধরাচ্ছে। বর্তমান প্রেক্ষাপট বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, আমেরিকার বিশ্বব্যাপী আধিপত্য যখন ফিকে হয়ে আসছে, ঠিক তখনই ইরানের ওপর এই হামলা পশ্চিমা ঐক্যের দ্রুত পতনকে ত্বরান্বিত করছে। এই সংকট কেবল একটি যুদ্ধ নয় বরং এটি ওয়াশিংটনের নেতৃত্বের বিশ্বাসযোগ্যতা এবং বিশ্বজুড়ে তাদের প্রভাবের সক্ষমতাকে বড় ধরনের চ্যালেঞ্জের মুখে ঠেলে দিয়েছে।

কয়েক দশক ধরে ন্যাটো জোট একটি সহজ সমীকরণের ওপর ভিত্তি করে টিকে ছিল, যেখানে আমেরিকা নেতৃত্ব দিত এবং ইউরোপ তাকে অনুসরণ করত। ইউরোপীয় দেশগুলো বিশ্বাস করত যে, আমেরিকার নিরাপত্তা নিশ্চিত হওয়া মানেই তাদের নিজেদের নিরাপত্তা নিশ্চিত হওয়া। কিন্তু বর্তমান পরিস্থিতিতে সেই সমীকরণ আর কাজ করছে না। জার্মানি, ফ্রান্স, যুক্তরাজ্য এবং স্পেনের মতো প্রভাবশালী দেশগুলো এখন আমেরিকার এই সামরিক অভিযানে সরাসরি যুক্ত হতে অস্বীকার করছে। ইউরোপীয় নেতারা এখন প্রকাশ্যে বলছেন যে এই যুদ্ধ তাদের নয় এবং ওয়াশিংটন কোনো সুনির্দিষ্ট পরিকল্পনা বা আলোচনা ছাড়াই তাদের ওপর এই যুদ্ধের দায় চাপিয়ে দেওয়ার চেষ্টা করছে।

এই বিরোধ কেবল কৌশলগত নয় বরং এটি জোটের রাজনীতির মূলে আঘাত করছে। আমেরিকা যদি মিত্রদের সাথে কোনো আলোচনা ছাড়াই বৈশ্বিক প্রভাবসম্পন্ন একটি যুদ্ধ শুরু করে এবং পরে তাদের সমর্থন দাবি করে, তবে ন্যাটো আর কোনো সমন্বিত প্রতিরক্ষা জোট থাকে না। এটি তখন আমেরিকার সাম্রাজ্যবাদী স্বার্থ রক্ষার হাতিয়ারে পরিণত হয়। ইউরোপীয় দেশগুলো এখন বুঝতে পারছে যে ওয়াশিংটন তাদের সার্বভৌম অংশীদার হিসেবে নয় বরং নিজস্ব সিদ্ধান্ত বাস্তবায়নের একটি মাধ্যম হিসেবে ব্যবহার করছে। ফলে যখনই কেন্দ্র থেকে নেওয়া সিদ্ধান্তগুলো ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে উঠছে, তখনই ন্যাটোর প্রান্তিক দেশগুলো নিজেদের নিরাপদ দূরত্বে সরিয়ে নিতে শুরু করেছে।

মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের সাম্প্রতিক বক্তব্য এই সংকটকে আরও উসকে দিয়েছে। ন্যাটোর সদস্য দেশগুলো যখন হরমুজ প্রণালীতে নৌবাহিনী পাঠাতে অস্বীকার করল, তখন ট্রাম্প একে একটি চরম বোকামি বলে অভিহিত করেছেন। তিনি সাফ জানিয়ে দিয়েছেন, আমেরিকা প্রয়োজনে একাই চলবে এবং মিত্রদের অবাধ্যতার কথা তারা মনে রাখবে। ওয়াশিংটনের এই আচরণ প্রমাণ করে যে, তারা এখন নিজেদের স্বার্থ রক্ষায় মিত্রদের অপমান করতে বা তাদের স্বার্থ বিসর্জন দিতেও দ্বিধা বোধ করবে না। এর ফলে ইউরোপীয় দেশগুলো এখন এই আশঙ্কায় ভুগছে যে আমেরিকা নিজের জেদ বজায় রাখতে ন্যাটোর অস্তিত্বকেও বিপন্ন করে তুলতে পারে।

এই সংঘাতের অর্থনৈতিক প্রভাবও অত্যন্ত ভয়াবহ। মধ্যপ্রাচ্যে অস্থিতিশীলতার কারণে বিশ্ববাজারে জ্বালানি তেলের দাম হু হু করে বাড়ছে। বিশেষ করে হরমুজ প্রণালী দিয়ে বিশ্বের এক-পঞ্চমাংশ জ্বালানি পরিবহন করা হয়, যা এখন চরম ঝুঁকির মুখে। যদিও ইউরোপ সরাসরি মধ্যপ্রাচ্যের তেলের ওপর পুরোপুরি নির্ভরশীল নয়, কিন্তু বিশ্ববাজারে তেলের দাম বাড়লে তার প্রভাব থেকে তারা মুক্ত থাকতে পারে না। নরওয়ে বা আমেরিকা থেকে তেল কিনলেও ইউরোপকে আন্তর্জাতিক বাজারের বর্ধিত দাম, বিমা খরচ এবং পরিবহন ঝুঁকি মোকাবিলা করতে হচ্ছে। ফলে জ্বালানি সংকটের এই ঢেউ ইউরোপের শিল্প উৎপাদন ও সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রায় বড় ধরনের আঘাত হানছে।

জ্বালানি সংকটের এই প্রভাব সরাসরি কৃষি এবং খাদ্য নিরাপত্তার ওপর গিয়ে পড়ছে। প্রাকৃতিক গ্যাসের দাম বাড়ার সাথে সাথে সার উৎপাদনের খরচ বেড়ে গেছে, কারণ নাইট্রোজেন সার তৈরির প্রধান কাঁচামাল হলো গ্যাস। এশিয়া ও ইউরোপের অনেক সার উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠান ইতিমধ্যে তাদের উৎপাদন কমিয়ে দিয়েছে। এর ফলে রুটি, মাংস এবং দুগ্ধজাত পণ্যের দাম বাড়ছে। ইউরোপের কৃষি ব্যবস্থা অত্যন্ত যান্ত্রিক এবং জ্বালানি-নির্ভর হওয়ায় এই মূল্যবৃদ্ধি পুরো মহাদেশের খাদ্য সরবরাহ ব্যবস্থাকে নড়বড়ে করে দিচ্ছে। তুরস্কের মতো দেশগুলো, যারা খাদ্য প্রক্রিয়াজাতকরণের একটি বড় হাব, তারাও এই সংকটের কারণে ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতির সম্মুখীন হচ্ছে।
মজার বিষয় হলো, ইরানের সাথে এই সংঘাত ইউরোপের সামরিক সক্ষমতাকেও কমিয়ে দিচ্ছে। ইউরোপ এখন ইউক্রেন যুদ্ধে গোলাবারুদ সরবরাহের জন্য নিজেদের শিল্প উৎপাদন বাড়ানোর চেষ্টা করছে। কিন্তু গোলাবারুদ ও বিস্ফোরক তৈরির জন্য প্রচুর জ্বালানি ও রাসায়নিক কাঁচামালের প্রয়োজন হয়। মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধের কারণে জ্বালানির দাম বেড়ে যাওয়ায় ইউরোপের প্রতিরক্ষা শিল্পগুলো সংকটে পড়ছে। একদিকে আমেরিকা চাইছে ইউরোপ ইউক্রেনকে সহায়তা চালিয়ে যাক, অন্যদিকে তারাই আবার এমন এক যুদ্ধ শুরু করেছে যা ইউরোপের শিল্প ভিত্তিকেই ধ্বংস করে দিচ্ছে। এই স্ববিরোধী অবস্থান ইউরোপীয় নেতাদের আমেরিকার প্রতি আরও সন্দিহান করে তুলছে।

ইরানকে কেন্দ্র করে চলমান এই উত্তেজনা একটি নতুন বিশ্বব্যবস্থার জন্ম দিচ্ছে। ওয়াশিংটন যদি নিজের একতরফা আধিপত্য বজায় রাখতে ন্যাটোর ঐক্য বলি দেয়, তবে মিত্র দেশগুলো নিজেদের স্বার্থ রক্ষায় ভিন্ন কোনো পথ খুঁজতে বাধ্য হবে। আটলান্টিক-কেন্দ্রিক একক বিশ্বব্যবস্থা এখন ভেঙে পড়ার পথে এবং একটি বহুমুখী বা মাল্টিপোলার বিশ্বের উদয় হচ্ছে। যেখানে ক্ষমতা কোনো একটি দেশের হাতে কুক্ষিগত থাকবে না, বরং একাধিক শক্তি বিশ্ব রাজনীতিতে প্রভাব বিস্তার করবে।

আরটির বিশ্লেষণ 

 

 

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here