ইরান বর্তমানে কয়েক দশকের মধ্যে সবথেকে কঠিন অভ্যন্তরীণ সংকটের মুখোমুখি দাঁড়িয়ে আছে। গত কয়েক সপ্তাহ ধরে চলা এই গণবিক্ষোভ এখন কেবল অর্থনৈতিক দাবির মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই, বর্তমানে এটি শাসকগোষ্ঠীর পতনের এক দফার আন্দোলনে রূপ নিয়েছে। তেহরানসহ বিভিন্ন প্রদেশে হাজার হাজার মানুষ রাস্তায় নেমে এসেছেন। সরকারও ইন্টারনেট সংযোগ বিচ্ছিন্ন করে এবং ধরপাকড় চালিয়ে এই আন্দোলন দমনের চেষ্টা করছে।
এই পরিস্থিতিতে আন্তর্জাতিক মহলের নজর এখন ওয়াশিংটনের দিকে। বিশেষ করে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের সাম্প্রতিক কড়া হুঁশিয়ারি পুরো সমীকরণ আরও জটিল করে তুলেছে। গত ১৩ জানুয়ারি ট্রাম্প তার সোশ্যাল মিডিয়া প্ল্যাটফর্মে ইরানি বিক্ষোভকারীদের সরাসরি সমর্থন জানিয়ে এক বার্তা দিয়েছেন। তিনি আন্দোলন চালিয়ে যাওয়ার আহ্বান জানিয়ে বলেছেন, সাহায্য আসছে। তিনি এমনকি মেক ইরান গ্রেট এগেইন স্লোগান ব্যবহার করে তেহরানকে চরম সতর্কবার্তা দিয়েছেন।
মার্কিন প্রশাসনের এই আগ্রাসী অবস্থানের কারণে প্রশ্ন উঠেছে, যুক্তরাষ্ট্র আসলে সামরিকভাবে কতটা প্রস্তুত। বর্তমান যুদ্ধংদেহী মনোভাব থাকলেও মধ্যপ্রাচ্যে মার্কিন সামরিক উপস্থিতি গত বছরের তুলনায় কিছুটা কম। বিশেষ করে শক্তিশালী বিমানবাহী রণতরী ইউএসএস জেরাল্ড ফোর্ড বর্তমানে এই অঞ্চল থেকে দূরে ক্যারিবীয় সাগরে অবস্থান করছে।
সামরিক বিশ্লেষকদের মতে, এই রণতরীকে পুনঃরায় মধ্যপ্রাচ্যের জলসীমায় ফিরিয়ে আনতে প্রায় দুই সপ্তাহের বেশি সময় লাগবে। তবে রণতরী না থাকলেও যুক্তরাষ্ট্রের হাতে ইরানে আঘাত করার মতো বিকল্প শক্তির অভাব নেই। কাতার, বাহরাইন, সৌদি আরব ও সংযুক্ত আরব আমিরাতের মতো দেশগুলোতে মার্কিনীদের স্থায়ী সামরিক ঘাঁটি রয়েছে। বিশেষ করে কাতারের আল উদাইদ বিমান ঘাঁটি থেকে যুক্তরাষ্ট্র যেকোনো সময় বড় ধরনের অভিযান পরিচালনা করতে সক্ষম। যদিও সম্প্রতি সেখান থেকে কিছু মার্কিন কর্মীকে সরিয়ে নেওয়ার খবর পাওয়া গেছে। এমন মার্কিন সিদ্ধান্ত ওই অঞ্চলে উত্তেজনার পারদ আরও বাড়িয়ে দিয়েছে।
২০২৫ সালে ইরানের পারমাণবিক কেন্দ্রে বি-২ স্টিলথ বোমারু বিমান দিয়ে চালানো হামলার নজির টেনে ট্রাম্প প্রশাসন বুঝিয়ে দিচ্ছে যে তারা প্রয়োজনে কঠোর হতে দ্বিধা করবে না। তবে এবারের পরিস্থিতি ভিন্ন। যদি যুক্তরাষ্ট্র বিক্ষোভকারীদের সহায়তায় কোনো সামরিক পদক্ষেপ নেয়। তবে তাদের লক্ষ্যবস্তু হবে মূলত ইরানের অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তা বাহিনী, আইআরজিসি কমান্ড সেন্টার এবং বাসিজ ঘাঁটিগুলো। সমরবিদরা বলছেন, জনাকীর্ণ শহরগুলোতে এ ধরনের হামলা চালানো বেশ ঝুঁকিপূর্ণ। কারণ, এতে বেসামরিক হতাহতের সম্ভাবনা থাকে যা শেষ পর্যন্ত উল্টো ফলাফল বয়ে আনতে পারে। তবে সরাসরি আকাশপথের হামলা ছাড়াও যুক্তরাষ্ট্রের হাতে টমাহক ক্রুজ মিসাইল এবং সাবমেরিন থেকে উৎক্ষেপণযোগ্য অস্ত্রের ভাণ্ডার রয়েছে। সেই সঙ্গে ড্রোন প্রযুক্তির ব্যবহার করে নিখুঁত নিশানায় আক্রমণ চালানোর সক্ষমতাও ওয়াশিংটনের রয়েছে।
বর্তমানে যুদ্ধের ময়দান কেবল ক্ষেপণাস্ত্র বা বোমায় সীমাবদ্ধ নেই; সাইবার এবং কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই এখন যুদ্ধের অন্যতম প্রধান হাতিয়ার। যুক্তরাষ্ট্র ইরানের ডিজিটাল নজরদারি ব্যবস্থা এবং ইন্টারনেট ব্ল্যাকাউট মোকাবিলায় স্টারলিংক স্যাটেলাইটের মতো প্রযুক্তি ব্যবহারের ইঙ্গিত দিয়েছে।
এর মাধ্যমে বিক্ষোভকারীদের নিরবচ্ছিন্ন যোগাযোগ নিশ্চিত করা এবং ইরানের আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থাকে সাইবার হামলার মাধ্যমে অকেজো করে দেওয়া সম্ভব। সমর বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, ট্রাম্প প্রশাসন দীর্ঘমেয়াদী কোনো যুদ্ধে জড়ানোর পরিবর্তে সংক্ষিপ্ত কিন্তু অত্যন্ত প্রভাবশালী কোনো অভিযান পরিচালনা করতে পারে, যা ইরানের তেল অবকাঠামো বা সামরিক শক্তিতে বড় ধরনের আঘাত হানবে। তেহরানের ওপর এই মনস্তাত্ত্বিক ও সামরিক চাপ শেষ পর্যন্ত কোন দিকে মোড় নেয়, তা আগামী কয়েক দিনের মধ্যেই পরিষ্কার হয়ে যাবে।
সূত্র: সানডে গার্ডিয়ান

