ইরানে গত কয়েক সপ্তাহ ধরে চলা সরকারবিরোধী বিক্ষোভ ভয়াবহ রক্তক্ষয়ী রূপ দেখেছে। রাজধানী তেহরানসহ দেশটির বিভিন্ন শহরে নিরাপত্তা বাহিনীর সাথে বিক্ষোভকারীদের সংঘর্ষে নিহতের সংখ্যা কয়েক হাজার ছাড়িয়েছে বলে জানিয়েছেন খোদ দেশটির সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলি খামেনি। সোমবার তেহরানে এক ভাষণে তিনি বলেন, ডিসেম্বর থেকে শুরু হওয়া অস্থিরতায় কয়েক হাজার মানুষ প্রাণ হারিয়েছে।
অর্থনৈতিক মন্দা ও আকাশচুম্বী মুদ্রাস্ফীতির প্রতিবাদে গত ২৮ ডিসেম্বর তেহরানের গ্র্যান্ড বাজার থেকে এই বিক্ষোভ শুরু হয়। তবে তা দ্রুতই রাজনৈতিক রূপ নেয় এবং দেশটির প্রায় সবকটি প্রদেশে ছড়িয়ে পড়ে। বিশেষ করে ৮ ও ৯ জানুয়ারির রাত ছিল সবচেয়ে রক্তক্ষয়ী। মানবাধিকার সংস্থাগুলোর দাবি, নিরাপত্তা বাহিনী অত্যন্ত কাছ থেকে বিক্ষোভকারীদের লক্ষ্য করে গুলি ছুড়েছে।
একটি মানবাধিকার সংস্থার তথ্যমতে, নিহতের সংখ্যা ৩,৩০০-এর বেশি নিশ্চিত হওয়া গেছে এবং আরও ৪৩০০ জনের মৃত্যু নিয়ে তদন্ত চলছে। অন্যদিকে, কিছু আন্তর্জাতিক সংবাদ সংস্থা এই সংখ্যা ৫ হাজার থেকে ২০ হাজার হতে পারে বলে আশঙ্কা করছে।
বিক্ষোভ দমন করতে ইরান সরকার ৮ জানুয়ারি থেকে দেশজুড়ে প্রায় সম্পূর্ণ ইন্টারনেট ও মোবাইল যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন করে দেয়। এর ফলে বহির্বিশ্ব থেকে ইরান কার্যত বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ে। গত রবিবার থেকে ইন্টারনেট সংযোগ আংশিক ফিরতে শুরু করলেও ফেসবুক, হোয়াটসঅ্যাপ বা অন্যান্য সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম এখনও ফিল্টার করা হচ্ছে। এই ব্ল্যাকআউটের সুযোগে নিরাপত্তা বাহিনী ব্যাপক ধরপাকড় ও দমন-পীড়ন চালিয়েছে বলে অভিযোগ করেছে অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনাল।
ইরান এই পরিস্থিতির জন্য সরাসরি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলকে দায়ী করেছে। খামেনি মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পকে অপরাধী আখ্যা দিয়ে বলেছেন, বিদেশি মদতেই এই অস্থিরতা ছড়ানো হয়েছে।
অন্যদিকে, প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প ইরানের নেতৃত্বের পরিবর্তনের ইঙ্গিত দিয়ে বলেছেন, “ইরানের জনগণের পাশে আমরা আছি।” পাল্টা জবাবে ইরানের প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ান হুশিয়ারি দিয়ে বলেছেন, “ইরানের সর্বোচ্চ নেতার ওপর কোনো আঘাত আসলে তাকে সরাসরি যুদ্ধ ঘোষণা হিসেবে গণ্য করা হবে।
বর্তমানে ইরানের সড়কগুলোতে নিরাপত্তা বাহিনীর ভারী উপস্থিতি লক্ষ্য করা যাচ্ছে। বিশেষ করে কুর্দি অধ্যুষিত এলাকাগুলোতে পরিস্থিতি অত্যন্ত থমথমে। নির্বাসিত বিরোধী দলগুলো এবং শাহজাদা রেজা পাহলভী সাধারণ মানুষকে ধর্মঘট ও প্রতিবাদ চালিয়ে যাওয়ার আহ্বান জানাচ্ছেন।
তবে ইন্টারনেটের ওপর কড়াকড়ি এবং সামরিক টহল বজায় থাকায় আন্দোলন আপাতত কিছুটা স্তিমিত মনে হলেও, ভেতরে ভেতরে ক্ষোভের আগুন যে দাউদাউ করে জ্বলছে, তা স্পষ্ট। আগামী দিনগুলোতে ইরান কোন দিকে মোড় নেয়, তা নিয়ে এখন পুরো বিশ্ব শঙ্কিত।
সূত্র: আল জাজিরা

