দীর্ঘ কয়েক মাসের আপেক্ষিক শান্তিতে ছেদ ঘটিয়ে মধ্যপ্রাচ্যের আকাশে আবারও যুদ্ধের দামামা। বিনা উসকানিতে ইরানে হামলা চালিয়েছে ইসরায়েল-যুক্তরাষ্ট্র।
এরপর শনিবার সকালে ইসরায়েল জুড়ে বেজে ওঠা সাইরেনের শব্দে আতঙ্কিত হয়ে পড়ে সাধারণ মানুষ। ইরান ও ইসরায়েলের মধ্যে নতুন করে শুরু হওয়া এই সংঘাতের জেরে বর্তমানে পুরো অঞ্চল এক চরম অস্থিরতার মধ্য দিয়ে যাচ্ছে।
ইসরায়েলি প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু এই অভিযানকে ইরানের পারমাণবিক উচ্চাকাঙ্ক্ষা দমনের একটি জরুরি পদক্ষেপ হিসেবে অভিহিত করেছেন। মার্কিন বিমান বাহিনীর সহযোগিতায় পরিচালিত এই বিশেষ অভিযানে ইরানের বেশ কিছু কৌশলগত সামরিক স্থাপনা লক্ষ্য করে হামলা চালানো হয়।
শনিবার সকালে সাবাত পালন করছিলেন ইসরায়েলের ইহুদিরা, ঠিক তখনই বিকট সাইরেন পুরো দেশকে স্তব্ধ করে দেয়। গত অক্টোবর মাসে গাজায় যুদ্ধবিরতি কার্যকর হওয়ার পর থেকে দেশটির মানুষ শান্তিতে ঘুমাতে পারছিল। কিন্তু আকস্মিক এই সতর্কবার্তা কোটি কোটি মানুষকে ঘুম থেকে উঠে দৌড়ে নিরাপদ আশ্রয়ে যেতে বাধ্য করেছে। প্রাথমিকভাবে সেনাবাহিনী এই সাইরেন বাজিয়েছিল জনগণকে আসন্ন ইরানি পাল্টা হামলার জন্য সতর্ক করতে। এর কিছু সময় পরেই খবর আসতে থাকে যে, ইরান থেকে একের পর এক ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র ইসরায়েলের ভূখণ্ডের দিকে ধেয়ে আসছে।
তেহরানের পক্ষ থেকে এই হামলার প্রতিক্রিয়া জানানো হয়েছে অত্যন্ত কঠোরভাবে। ইরানের রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যম জানিয়েছে, তাদের ওপর চালানো ‘বর্বর’ হামলার যোগ্য জবাব দিতেই তারা কয়েক ডজন ক্ষেপণাস্ত্র নিক্ষেপ করেছে।
ইসরায়েলি প্রতিরক্ষা বাহিনীর প্রাথমিক তথ্য অনুযায়ী, শনিবার দুপুর পর্যন্ত অন্তত ৪০টি ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র ছোড়া হয়েছে। যদিও ইসরায়েলের অত্যাধুনিক আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা অধিকাংশ ক্ষেপণাস্ত্রই মাঝ আকাশে ধ্বংস করে দিয়েছে, তবুও কিছু রকেট খোলা জায়গায় আঘাত হেনেছে। বিভিন্ন এলাকায় ক্ষেপণাস্ত্রের ধ্বংসাবশেষ পড়ে সামান্য ক্ষয়ক্ষতির খবর পাওয়া গেছে।
যুদ্ধের এই চরম উত্তেজনার মাঝে ইসরায়েলের সাধারণ জনজীবন পুরোপুরি থমকে গেছে। দেশটির প্রধান বিমানবন্দর বেন গুরিয়ন সমস্ত কার্যক্রম অনির্দিষ্টকালের জন্য স্থগিত ঘোষণা করেছে। এতে হাজার হাজার যাত্রী বিমানবন্দরে আটকা পড়েছেন অথবা তাদের গন্তব্য বদলে যাচ্ছে। একই সাথে সারা দেশে সব ধরণের বড় ধরনের সমাবেশ নিষিদ্ধ করেছে দেশটির হোম ফ্রন্ট কমান্ড।
শনিবারে অনুষ্ঠিতব্য বেশ কিছু উৎসব এবং রাজনৈতিক বিক্ষোভ কর্মসূচিও পরিস্থিতির গুরুত্ব বিবেচনা করে বাতিল করা হয়েছে। মানুষ এখন কেবল রেডিও এবং ইন্টারনেটের খবরের দিকে তাকিয়ে পরবর্তী পরিস্থিতির অপেক্ষা করছে।
এদিকে যুদ্ধের ভয়াবহতা আঁচ করে ইসরায়েলের হাসপাতালগুলো তাদের জরুরি বিভাগগুলোকে ভূগর্ভস্থ বা সুরক্ষিত বাংকারে সরিয়ে নিয়েছে। দেশটির স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় থেকে জানানো হয়েছে, জীবন রক্ষাকারী অপারেশন এবং অতি গুরুত্বপূর্ণ রোগীদের নিরাপদ বাঙ্কারে চিকিৎসা দেওয়া হচ্ছে। তেল আবিব এবং জেরুজালেমের বড় বড় হাসপাতালগুলোতে কর্মীদের সর্বোচ্চ সতর্কতায় রাখা হয়েছে। সাধারণ রোগীদের অনুরোধ করা হয়েছে অতি জরুরি প্রয়োজন ছাড়া হাসপাতালে না আসতে। চিকিৎসকরা জানিয়েছেন, সম্ভাব্য বড় ধরণের হতাহতের ঘটনা মোকাবিলায় তারা সব ধরণের প্রস্তুতি নিয়ে রেখেছেন।
রাজধানী তেল আবিবসহ বিভিন্ন শহরের চিত্র এখন অনেকটাই ভিন্ন। যেখানে সবসময় মানুষের কোলাহল থাকত, সেখানে এখন শ্মশানের নীরবতা। যারা পুরনো অ্যাপার্টমেন্টে থাকেন এবং যাদের নিজস্ব কোনো সুরক্ষিত রুম নেই, তারা এখন মেট্রো স্টেশন বা ভূগর্ভস্থ পার্কিং লটগুলোতে আশ্রয় নিয়েছেন। বিশেষ করে শিশু এবং বয়স্কদের নিয়ে নিরাপদ আশ্রয়ে যাওয়া পরিবারগুলোর চোখেমুখে স্পষ্ট আতঙ্কের ছাপ দেখা গেছে। মাটির নিচের এই অস্থায়ী আশ্রয়স্থলগুলোতে মানুষ একে অপরকে সান্ত্বনা দিচ্ছেন এবং অনেকে মিলে প্রার্থনা করছেন যেন দ্রুত এই বিভীষিকার অবসান ঘটে।
শনিবার রাত পর্যন্ত পাওয়া তথ্য অনুযায়ী, উত্তর ইসরায়েলে একজন প্রৌঢ় ব্যক্তি ক্ষেপণাস্ত্রের আঘাতে সৃষ্ট গর্তে পড়ে সামান্য আহত হয়েছেন। এ ছাড়া বড় ধরনের কোনো প্রাণহানির খবর এখনো পাওয়া যায়নি। তবে উত্তেজনার পারদ যেভাবে চড়ছে, তাতে আগামী কয়েক দিন মধ্যপ্রাচ্যের ভাগ্য কোন দিকে যাবে তা বলা মুশকিল। আন্তর্জাতিক মহল থেকে সংযম প্রদর্শনের আহ্বান জানানো হলেও রণক্ষেত্র থেকে পাওয়া সংবাদগুলো ভিন্ন কোনো ভয়াবহ পরিণতির ইঙ্গিত দিচ্ছে।
সূত্র: টাইমস অব ইসরায়েল

