আফগানিস্তানে যুক্তরাষ্ট্রের ব্যর্থ যুদ্ধের পর যে ভয়ংকর সত্য সামনে এলো

0
আফগানিস্তানে যুক্তরাষ্ট্রের ব্যর্থ যুদ্ধের পর যে ভয়ংকর সত্য সামনে এলো

আফগানিস্তানে দীর্ঘ দুই দশকের সামরিক অভিযান ও পুনর্গঠন প্রচেষ্টাকে ওয়াশিংটন সফল অধ্যায় হিসেবে তুলে ধরতে চাইলেও বর্তমানে সেখানে কেবল ধ্বংসাবশেষ। সেই সাথে আছে একটি অপূর্ণ যুদ্ধের গ্লানি। 

যুক্তরাষ্ট্রের স্পেশাল ইন্সপেক্টর জেনারেল ফর আফগানিস্তান রিকনস্ট্রাকশনের সর্বশেষ মূল্যায়ন প্রতিবেদন অনুযায়ী, দেশটিতে ব্যয় হওয়া প্রায় ১৫০ বিলিয়ন ডলারের সিংহভাগই অপচয়, দুর্নীতি এবং ত্রুটিপূর্ণ পরিকল্পনার কারণে নষ্ট হয়েছে। মার্কিন এই তদারকি সংস্থা গত ১৮ বছর ধরে বারবার সতর্ক করেছিল, আফগানিস্তানে আমেরিকার কৌশল ছিল অসংলগ্ন এবং বাস্তবতাবর্জিত। সেখানকার প্রতিষ্ঠানগুলোতে সক্ষমতার বাইরে গিয়ে বড় অংকের অর্থ বিনিয়োগ করা হয়েছিল। আর বরাদ্দও দীর্ঘমেয়াদে বজায় রাখা সম্ভব হয়নি। মূলত মার্কিন নিরাপত্তা বাহিনীর ওপর আফগান বাহিনীর এই অতিনির্ভরশীলতাই ২০২১ সালে তালেবানের পুনরুত্থান এবং মার্কিন সমর্থিত সরকারের দ্রুত পতনের প্রধান কারণ হয়ে দাঁড়ায়।

ওয়াশিংটনের নীতি বিশ্লেষকদের মতে, আফগানিস্তানে এই শোচনীয় ব্যর্থতার পেছনে কারিগরি ত্রুটির চেয়ে যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্রনীতির কাঠামোগত বৈশিষ্ট্য বেশি দায়ী। মার্কিন নীতিনির্ধারণী মহলে কূটনীতি বা টেকসই প্রতিষ্ঠান তৈরির চেয়ে সামরিক শক্তিতে আধিপত্য বিস্তারের প্রবণতা সব সময়ই প্রবল ছিল। 

যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিরক্ষা খাতের বিশাল অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক স্বার্থ এই যুদ্ধকে দীর্ঘায়িত করতে সাহায্য করেছে। উদাহরণস্বরূপ, বড় বড় প্রতিরক্ষা ঠিকাদার প্রতিষ্ঠানগুলো যুক্তরাষ্ট্রের অধিকাংশ রাজ্যেই তাদের কার্যক্রম পরিচালনা করে। ফলে মার্কিন কংগ্রেসের জন্য প্রতিরক্ষা বাজেট কমানো অসম্ভব। সিগারের প্রতিবেদনে উঠে এসেছে, পুনর্গঠন বাজেটের ৬০ শতাংশই ব্যয় হয়েছে নিরাপত্তার কাজে। যার বড় অংশই ছিল আফগান সামরিক ও পুলিশ বাহিনীকে টিকিয়ে রাখার জন্য। কিন্তু যখনই মার্কিন অর্থায়ন ও সমর্থন প্রত্যাহার করা হলো, তখনই পুরো ব্যবস্থাটি তাসের ঘরের মতো ভেঙে পড়ল।

বর্তমানে আফগানিস্তানের পরিস্থিতি অত্যন্ত সংকটাপন্ন। দেশটির প্রায় ৪ কোটি ২০ লাখ মানুষের অর্ধেকেরও বেশি বেঁচে থাকার জন্য মানবিক সাহায্যের ওপর নির্ভরশীল। ২০২১ সালের পর থেকে আন্তর্জাতিক অর্থায়ন নাটকীয়ভাবে কমে গেছে। যুক্তরাষ্ট্রসহ পশ্চিমা দেশগুলো তালেবান সরকারকে স্বীকৃতি না দিয়ে তাদের মনোযোগ অন্যান্য বৈশ্বিক সংকটের দিকে সরিয়ে নিয়েছে। এর ফলে দেশটিতে স্বাস্থ্যসেবা ব্যবস্থা ধসে পড়েছে। শত শত চিকিৎসা কেন্দ্র বন্ধ হয়ে গেছে। চিকিৎসকরা সতর্ক করছেন, প্রয়োজনীয় পুষ্টি ও ওষুধের অভাবে শিশুরা এমন সব রোগে মারা যাচ্ছে যা সহজেই প্রতিরোধ করা সম্ভব ছিল। অথচ এক সময় আফগানিস্তানকে স্বনির্ভর করার যে প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়েছিল, বর্তমান পরিস্থিতি তার সম্পূর্ণ বিপরীত।

আফগান যুদ্ধের আরেকটি অন্ধকার দিক হলো মার্কিন নীতিনির্ধারকদের মাঠপর্যায়ের বাস্তবতাকে বুঝতে না পারা। অনেক মার্কিন কর্মকর্তা স্বীকার করেছেন, তারা এমন একটি সরকারকে সমর্থন দিচ্ছিলেন যা সম্পূর্ণভাবে বিদেশি অর্থের ওপর টিকে ছিল। স্থানীয় পর্যায়ে যারা পুনর্গঠনের কাজ করতেন, তাদের তালেবান এবং মার্কিন বাহিনী; উভয় পক্ষের চাপের মধ্যে টিকে থাকতে হতো। অনেক ক্ষেত্রে স্থানীয় প্রতিনিধিরা জীবন বাঁচাতে তালেবানকে কর দিতে বাধ্য হতেন। মার্কিন বাহিনীর কাছে অনেক সময় এই কাণ্ড বিশ্বাসঘাতকতা হিসেবে গণ্য হতো। ফলে সাধারণ আফগানরা কোনো পক্ষ থেকেই প্রকৃত সুরক্ষা পায়নি এবং যুদ্ধের বলি হতে হয়েছে তাদেরই।

সবচেয়ে উদ্বেগের বিষয় হলো, সিগারের মতো স্বাধীন তদারকি সংস্থাগুলোর ভেতরেও এখন রাজনৈতিক হস্তক্ষেপ ও সেন্সরশিপ বাড়ছে। ২০২৫ সালের শুরুতে সংস্থাটির শীর্ষ নেতৃত্বে পরিবর্তনের পর অনেক গুরুত্বপূর্ণ ও স্পর্শকাতর তথ্য প্রতিবেদন থেকে বাদ দেওয়া হয়েছে বলে অভিযোগ উঠেছে। 

রাজনৈতিক প্রতিহিংসার ভয়ে মার্কিন প্রশাসন এখন নিজেদের ব্যর্থতার সত্যগুলো জনগণের সামনে আনতে কুণ্ঠাবোধ করছে। আফগানিস্তানের এই যুদ্ধ এবং পরবর্তী পরিস্থিতি প্রমাণ করেছে, বিদেশি হস্তক্ষেপের মাধ্যমে কোনো জাতির ভাগ্য পরিবর্তন করা কেবল কঠিনই নয় বরং তা যদি ত্রুটিপূর্ণ কৌশলের ওপর ভিত্তি করে হয় তবে তার ফলাফল হয় অত্যন্ত ভয়াবহ। ২০ বছরের রক্তক্ষয়ী সংঘাত ও বিলিয়ন বিলিয়ন ডলার ব্যয়ের পর আফগানিস্তান আজ এক চরম অনিশ্চয়তার মুখে দাঁড়িয়ে আছে। বিশ্বশক্তির আধিপত্যবাদী নীতির এক করুণ উদাহরণ আফগানিস্তান।

সূত্র: টিআরটি

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here