দরজায় কড়া নাড়ছে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন। আনুষ্ঠানিকভাবে প্রচারণায় নামতে যাচ্ছেন প্রার্থীরা। এমন পরিস্থিতিতেও আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির দৃশ্যমান উন্নতি নেই। প্রতিদিনই খুনখারাবি, দিনদুপুরে ছিনতাই, চুরি, ডাকাতি থেকে শুরু করে রাজনৈতিক সহিংসতার ঘটনা ঘটেই চলেছে।
আইনশৃঙ্খলার উন্নতিতে সরকার ও নির্বাচন কমিশনের কঠোর বার্তাও কাজে আসছে না। কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারছে না অপারেশন ডেভিল হান্ট ফেজ-২। উদ্ধার হয়নি লুটের ১ হাজার ৩৩৩টি অস্ত্র। উল্টো আন্ডারওয়ার্ল্ডের তৎপরতা বাড়তে থাকা, অবৈধ অস্ত্রের ঝনঝনানি, সীমান্ত দিয়ে অস্ত্র প্রবেশের খবর, টার্গেট কিলিং, চাঁদাবাজি, গুলি, ডিজিটাল গুজবের মতো ঘটনাগুলো উদ্বেগ বাড়াচ্ছে রাজনৈতিক অঙ্গন ও জনমনে। পরিস্থিতির উন্নতি না হলে নির্বাচনে সুষ্ঠু ভোট গ্রহণ নিয়ে সংশয় দেখা দেবে বলে জানিয়েছেন অপরাধ বিশেষজ্ঞরা।
অপরাধ বিশেষজ্ঞ মওলানা ভাসানী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্রিমিনোলজি অ্যান্ড পুলিশ সায়েন্স বিভাগের অধ্যাপক ড. ওমর ফারুক বলেন, চারদিকে রাজনৈতিক, সামাজিক ও অর্থনৈতিক অস্থিতিশীলতা দেখা দিয়েছে। নির্বাচনকে কেন্দ্র করে দেশের অভ্যন্তরে ও আন্তর্জাতিক পর্যায়ের ষড়যন্ত্রের হুমকি রয়েছে। এমন পরিস্থিতি সামাল দিতে নীতিনির্ধারণী পর্যায় থেকে কতটা সঠিক দিকনির্দেশনা দিতে পারবে, সেটি নিয়েও সংশয় রয়েছে। স্বাধীনতার পর দেশ কখনো এ ধরনের পরিস্থিতিতে পড়েনি। বর্তমানে যারা রাষ্ট্র পরিচালনা করছেন, তাদের অনেকেই একদম নতুন। এ ছাড়া পুলিশের মনোযোগ নির্বাচনের দিকে। অন্য অপরাধে তাদের খুব একটা দায়িত্ব রয়েছে বলে মনে করছে না।
তবে পুলিশ বলছে, আইনশৃঙ্খলা ভেঙে পড়ার মতো কিছু হয়নি। অতিরিক্ত ফোর্স মাঠে দৃশ্যমান হলে সব ধরনের অপরাধ কমে আসবে। পুলিশ সদর দপ্তরের অতিরিক্ত আইজিপি (ক্রাইম অ্যান্ড অপারেশন্স) খোন্দকার রফিকুল ইসলাম বলেন, এক বছরের বেশি সময় ধরে ধাপে ধাপে পুলিশের ভেঙে পড়া কাঠামো ও জনগণের মধ্যে তৈরি হওয়া অবিশ্বাস মেরামতের কাজ করা হয়েছে। এখন সুষ্ঠু নির্বাচন উপহার দেওয়া আমাদের কাছে বড় চ্যালেঞ্জ। খুনখারাবির মতো কিছু ঘটনা ঘটছে- এর মানে এই নয় যে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি ভেঙে পড়েছে। বরং আগের তুলনায় পরিস্থিতির উত্তরণ ঘটেছে। যেসব ঘটনা ঘটছে সেগুলোর সঙ্গে জড়িতদের আইনের আওতায় আনা হচ্ছে। সুতরাং আতঙ্কিত হওয়ার কিছু নেই। তিনি আরও বলেন, নির্বাচন উপলক্ষে পুলিশ সদস্যদের বিশেষ ট্রেনিং দিয়ে প্রস্তুত করা হয়েছে। আশা করি মাঠে অধিক ফোর্স মোতায়েন থাকলে নির্বাচনি সহিংসতার সঙ্গে অন্যান্য অপরাধও নিয়ন্ত্রণে থাকবে।
সংশ্লিষ্ট একাধিক সূত্র জানিয়েছে, কী কী কারণে পরিস্থিতির অবনতি হচ্ছে, তা নিয়ে চুলচেরা বিশ্লেষণ করছে পুলিশ সদর দপ্তর। বিভিন্ন ইউনিট, মেট্রোপলিটন, রেঞ্জ ও জেলা পুলিশের সঙ্গে দফায় দফায় বৈঠক করা হচ্ছে। নির্বাচনি নিরাপত্তার আড়ালে অন্য অপরাধ যাতে বাড়তে না পারে সেদিকেও নেওয়া হচ্ছে বিশেষ নজরদারি। মাঠপর্যায়ের ফোর্সদের উজ্জীবিত করতে পুলিশের মহাপরিদর্শক (আইজিপি) নিয়মিত ভিডিও কনফারেন্সের মাধ্যমে দিকনির্দেশনা দিচ্ছেন। এসপিদের নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে জনসম্পৃক্ততা বাড়াতে। অফিশিয়াল কাজ কমিয়ে অধিক পরিমাণ ফোর্স মাঠে মোতায়েন রাখতে নির্দেশ দিয়েছে পুলিশ সদর দপ্তর। অপরাধ-প্রবণ এলাকায় দায়িত্ব পালনে অবহেলার প্রমাণ পাওয়া গেলে সংশ্লিষ্ট পুলিশ সদস্য বা ইউনিটের বিরুদ্ধে তাৎক্ষণিক ও কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হবে বলেও বার্তা পাঠানো হয়েছে।
রাজনৈতিক বিরোধ, আধিপত্যের লড়াই, পূর্বশত্রুতা, পারিবারিক দ্বন্দ্ব, দখল, মাদক ব্যবসা, চাঁদাবাজি, চুরি, দিনদুপুরে ছিনতাইসহ নানা কারণে হত্যাকাণ্ডের শিকার হচ্ছে মানুষ। ১১ ডিসেম্বর তফসিল ঘোষণা হওয়ার পরের দিনই ইনকিলাব মঞ্চের মুখপাত্র শরিফ ওসমান হাদিকে গুলি করা হয়। ১৮ ডিসেম্বর তিনি মারা যান। এরপর থেকে রাজধানীসহ সারা দেশে একের পর এক টার্গেট কিলিং ও গুলির ঘটনা লেগেই আছে। গত শনিবার গভীর রাতে রাজধানীর গুলশানের কালাচাঁদপুর এলাকার একটি বাসা থেকে সাদিয়া রহমান মিম (২৭) নামে এক নারীর গলা কাটা লাশ উদ্ধার করেছে পুলিশ। ১২ জানুয়ারি রাতে পশ্চিম রাজাবাজারে গ্রিল কেটে ঘরে ঢুকে জামায়াতে ইসলামীর নেতা আনোয়ার উল্লাহকে (৬৫) হত্যা করা হয়। ২৭ নম্বর ওয়ার্ড জামায়াতের সহসভাপতি ছিলেন তিনি। ৭ জানুয়ারি তেজগাঁওয়ের তেজতুরী বাজার এলাকায় স্বেচ্ছাসেবক দলের নেতা মুছাব্বিরকে গুলি করে হত্যা করা হয়।
১০ জানুয়ারি দক্ষিণ বনশ্রীতে ফাতেমা আক্তার নিলি নামের দশম শ্রেণির এক শিক্ষার্থীকে ধারালো অস্ত্র দিয়ে গলা কেটে হত্যা করা হয়। একইদিন ভোরে ডিএমপির ভাটারা থানার ভিতর থেকে পুলিশের ব্যবহৃত মোটরসাইকেল চুরি হয়। ১৬ জানুয়ারি উত্তরায় নিরাপত্তাকর্মীকে মারধর করে তার কাছ থেকে শটগান ছিনতাই করা হয়। ৭ জানুয়ারি ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কের মাতুয়াইলে স্বর্ণ ব্যবসায়ীর ৮০ লাখ টাকা ছিনতাই হয়।
১৩ জানুয়ারি উত্তর বাড্ডায় আবাসন কোম্পানির কার্যালয় লক্ষ্য করে গুলি করা হয়। চাঁদাবাজির উদ্দেশে আন্ডারওয়ার্ল্ড সন্ত্রাসীর সহযোগীরা গুলি করে বলে জানায় পুলিশ। ৪ জানুয়ারি মোহাম্মদপুরের চন্দ্রিমা বাজারের ‘নিউ রানা জুয়েলার্স’ নামে দোকান থেকে ৭০ ভরি স্বর্ণ এবং ৬০০ ভরি রুপা চুরি হয়। ১৭ নভেম্বর মিরপুরে দোকানে ঢুকে পল্লবী থানা যুবদলের সদস্যসচিব গোলাম কিবরিয়াকে (৪৭) গুলি করে হত্যা করা হয়। ১০ নভেম্বর পুরান ঢাকার ন্যাশনাল মেডিকেল ইনস্টিটিউট হাসপাতালের সামনে শীর্ষ সন্ত্রাসী তারিক সাইফ মামুনকে (৫৫) ফিল্মি স্টাইলে গুলি করে হত্যা করা হয়।

