সুন্দর ভবিষ্যৎ ও উন্নত জীবনের আশায় দেশ ছেড়ে প্রবাসে পাড়ি জমাচ্ছেন স্বপ্নবাজ তরুণরা। অনেকেই মনে করেন ইউরোপের কোনো দেশে পৌঁছে গেলেই বদলে যাবে ভাগ্যের চাকা। তাইতো পছন্দের শীর্ষে থাকা ইউরোপের পথেই পাড়ি জমাচ্ছেন তরুণরা। তবে বৈধ পথে ইউরোপ যাত্রা অনেকটা সোনার হরিণ পাওয়ার মতোই। নানা জটিলতা ও বৈধভাবে কোনো উপায় না পেয়ে বাধ্য হয়েই অবৈধ পথ বেছে নিচ্ছেন অনেক তরুণ। আর দালালের খপ্পড়ে পড়ে এ পথে পাড়ি দিয়ে কেউ কেউ গন্তব্যে পৌঁছাতে পারলেও অনেকেরই হচ্ছে সর্বনাশ।
অবৈধভাবে সমুদ্রপথে বা বিভিন্ন দেশের ঝুঁকিপূর্ণ সীমানা পাড়ি দিয়ে ইউরোপে প্রবেশের সময় প্রায়ই জীবন হারাচ্ছেন স্বপ্নবাজ তরুণরা। অনেকেই নিখোঁজও হচ্ছেন। তাদেরই দু’জন মাসুদ রানা (২২) ও পাবেল আমদে (২৫)। অবৈধপথে ইউরোপে পাড়ি দিতে গিয়ে ২ বছর ধরে নিখোঁজ রয়েছেন তারা। একই গ্রামের মাসুদ ও পাবেল ইরান-তুরস্ক হয়ে ইউরোপের দেশ গ্রিসে যাওয়ার পথে নিখোঁজ হন।
নিখোঁজরা হলেন হবিগঞ্জ জেলার নবীগঞ্জ উপজেলার গজনাইপুর ইউনিয়নের সাতাইহাল গ্রামের চুনু মিয়ার ছেলে পাবেল আহমেদ ও একই গ্রামের দলাই মিয়ার ছেলে মাসুদ রানা।
নিখোঁঁজ মাসুদের স্বজনরা জানান, পরিবারে স্বচ্ছলতা ফেরাতে তারা কয়েকজন অভিবাসন প্রত্যাশী ইউরোপের দেশ গ্রিসে যাওয়ার উদ্দেশ্যে ২০২২ সালের ডিসেম্বর মাসে দুবাই থেকে জাহাজে ইরান পৌঁছান। ইরানে কয়েকদিন অবস্থানের পর ২০২৩ সালের ২৩ জানুয়ারি পাহাড়ি পথ বেয়ে ইরান থেকে তুরস্কে প্রবেশের চেষ্টা করেন। এক সাথে ১০ জন বাংলাদেশিসহ বিভিন্ন দেশি মোট ২৪ জন নাগরিক ছিলেন তাদের দলে। উঁচু-নিচু পাহাড়, মরুভূমি আর বরফে ঢাকা দুর্গম পথ পাড়ি দিয়ে তুরস্ক সীমান্ত অতিক্রম তরার সময় তারা নিখোঁজ হন। এরপর থেকে মাসুদের কোনো হদিস পাওয়া যায়নি।
অপর নিখোঁজ পাবেলের স্বজনরা জানান, পাবেলসহ ৩৫ জন যুবক ইরান থেকে তুরস্কের পথে যাত্রা শুরু করে। তুরস্ক সীমান্ত অতিক্রম করার সময় দালাল চক্রের সদস্যরা রাতের অন্ধকারে পাহাড়-পর্বত মরুভূমি আর বরফে ঢাকা দুর্গম রাস্তা পাড়ি দিয়ে তুরস্কে প্রবেশকালে সীমান্তরক্ষী বাহিনীর ক্যাম্পের পাশ দিয়ে যাওয়ার সময় তাদের উপস্থিতি টের পেয়ে সীমান্তরক্ষী বাহিনীর সদস্যরা অভিযান চালায়। এ সময় ৮ জন যুবক একদিকে লুকিয়ে পড়ে এবং অন্যদিকে ২৭ জন যুবকের সঙ্গে পাবেল দৌঁড়ে পালানোর চেষ্টা করে। এরপর থেকে পাবেল নিখোঁজ হয়। পাবেলের কোনো সন্ধান পাওয়া যায়নি।
নিখোঁজ পাবেলের মামা সাইফুর রহমান তালুকদার জানান, ‘পাবেল দেশের বাইরে যাওয়ার কিছুদিন আগে তার ছোট ভাই শাহ ফাহিম ও তার মা নাজমা তালুকদার মারা যান। নিজের পরিবারকে প্রতিষ্ঠিত করতে ইউরোপ যাওয়ার চিন্তা করে পাবেল। ৪ ভাই বোনের মধ্যে পাবেল সবার বড়।’
তিনি কাঁন্নাজড়িত কণ্ঠে বলেন, ‘পাবেলের মা মারা যাওয়ার পর আমাদের কাছেই সে বড় হয়েছে, মা হারা পাবেলকে অনেক কষ্ট করে লালন-পালন করেছি। ইরান অবস্থানকালে ও তুরস্ক যাওয়ার আগে আমার সঙ্গে ভাগিনার কথা হয়েছে। সে দোয়া চেয়ে বলেছিল, মামা আমি পৌঁছে ফোন দিব, কিন্তু আর তাকে ফোনে পাইনি। তার সঙ্গে থাকা সঙ্গীদের তথ্য অনুযায়ী, পুলিশ তাদের দেখে অভিযান চালালে যে যার মতো দৌঁড়ে পালানোর চেষ্টা করে। এরপর থেকে পাবেলের আর কোনো সন্ধান পাওয়া যায়নি।’
নিখোঁজের ২ বছর অতিবাহিত হলেও এখনো কোনো সন্ধান পাওয়া যায়নি পাবেল ও মাসুদের। আজও তাদের অপেক্ষায় আছেন স্বজনরা।
মৃত্যু ঝুঁকির পথ বেয়ে ইরান-তুরস্ক সীমান্ত পাড়ি দেয়া আল-আমিন আহমেদ নামে অভিবাসী জানান, ‘ইরান হতে তুরস্ক সীমান্ত অতিক্রম করা অনেকটা মরণ ফাঁদের মতো। সীমান্তপথ পাড়ি দেওয়া অনেকটা ঝুঁকিপূর্ণ, অনেক উঁচু-নিচু পাহাড় অতিক্রম করতে হয়, পাশাপাশি মরুভূমি আর বরফে ঢাকা দুর্গম পথ পাড়ি দিতে হয়। রাতের অন্ধকারে কোনো ধরনের আলো ছাড়াই দালাল চক্রের সদস্যদের পিছনে-পিছনে যেতে হয়। কখনো দীর্ঘপথ মরুভূমি, আবার কোনো কোনো সময় উঁচু-নিচু পাহাড় কিংবা বরফে ঢাকা ঝুঁকিপূর্ণ পথ। মৃত্যুর ঝুঁকি নিয়ে সীমান্ত অতিক্রম করতে হয়। আর সীমান্তে আটক হলে অমানবিক নির্যাতনের শিকার হতে হয়।
অভিবাসন সংশ্লিষ্টরা বলছেন, ‘বর্তমানে বৈধ পথে ইউরোপের বিভিন্ন দেশে যাওয়ার সুযোগ তৈরি হয়েছে তাই জীবনের ঝুঁকি নিয়ে এসব বিপদজ্জনক পথে বিদেশে পাড়ি না জমানোর অনুরোধ।