ঋণ খেলাপ সমস্যা মোকাবিলায় কঠোর পদক্ষেপ গ্রহণের প্রস্তাব দিয়েছেন রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকগুলোর শীর্ষ কর্মকর্তারা। এর মধ্যে রয়েছে ঋণখেলাপিদের তালিকা কেন্দ্রীয় ব্যাংকের ওয়েবসাইটে প্রকাশ, ব্যক্তিগত সম্পত্তি (বাড়িঘর) কেনায় নিষেধাজ্ঞা এবং ঋণকার্যক্রম সম্পূর্ণ অনলাইনব্যবস্থায় নিয়ে আসা। সচিবালয়ে সোমবার আয়োজিত কর্মশালায় এসব প্রস্তাব তুলে ধরা হয়। আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগ আয়োজিত ‘খেলাপি ঋণ পুনরুদ্ধারের কৌশল’ শীর্ষক এ কর্মশালায় প্রধান অতিথি ছিলেন আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগের সচিব নাজমা মোবারেক। এতে রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা এবং কেন্দ্রীয় ব্যাংকের প্রতিনিধিরা অংশ নেন।
কর্মশালায় বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হয় ঋণকার্যক্রমের স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা বাড়াতে প্রযুক্তির ব্যবহার বৃদ্ধির ওপর। কর্মশালায় উপস্থাপিত প্রস্তাবে বলা হয়, ব্যবসায়ীদের ক্ষেত্রে নতুন বাড়ি বা গাড়ি কেনার আগে ক্রেডিট ইনফরমেশন ব্যুরো (সিআইবি) থেকে তাঁদের ঋণ পরিস্থিতি যাচাই বাধ্যতামূলক করতে হবে। এতে ঋণখেলাপিরা নতুন বিনিয়োগ বা সম্পত্তি কেনায় বাধার মুখে পড়বেন। এ ছাড়া ব্যাংকগুলোর ব্যবস্থাপনা পরিচালকদের ঋণ অনুমোদন ও আদায়ের অবস্থা প্রতিদিন পর্যবেক্ষণ এবং পুরো ঋণপ্রক্রিয়া ধাপে ধাপে অনলাইন প্ল্যাটফর্মে নিয়ে আসার ওপর জোর দেওয়া হয়। সংশ্লিষ্টরা মনে করেন, অনলাইন নজরদারি চালু হলে অনিয়ম ও জালিয়াতি কমবে এবং খেলাপি ঋণ নিয়ন্ত্রণে আসবে।
কর্মশালায় ঋণখেলাপিদের সামাজিক ও প্রশাসনিকভাবে চাপের মধ্যে আনতে তাঁদের তালিকা প্রকাশ করারও প্রস্তাব করা হয়। এতে তাঁদের ওপর ঋণ পরিশোধের চাপ বাড়বে বলে মনে করেন ব্যাংকাররা। একই সঙ্গে খেলাপিদের ভিআইপি বা সিআইপি মর্যাদা না দেওয়া এবং বিভিন্ন রাষ্ট্রীয় সুবিধা সীমিত করার সুপারিশ করা হয়।
মূল প্রবন্ধে আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগের অতিরিক্ত সচিব সৈয়দ কুতুব খেলাপি ঋণ সৃষ্টির বিভিন্ন কারণ তুলে ধরেন। এর মধ্যে রয়েছে অযোগ্য উদ্যোক্তাকে ঋণ প্রদান, প্রয়োজনের অতিরিক্ত ঋণ বিতরণ, প্রভাব বা চাপের কারণে ঋণ অনুমোদন, বন্ধকি সম্পত্তির অতিমূল্যায়ন, জাল কাগজপত্র গ্রহণ এবং ঋণের অপব্যবহার। এ ছাড়া ইচ্ছাকৃতভাবে ঋণখেলাপি হওয়ার প্রবণতা এবং ঋণ পরিশোধে অনীহাকেও বড় কারণ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়। খেলাপি ঋণ রোধে তিনি নির্ধারিত খাতের বাইরে ঋণ প্রদান না করা, উপযুক্ত গ্রাহক নির্বাচন, ঝুঁকি যথাযথভাবে মূল্যায়ন এবং পর্যাপ্ত ও সঠিক জামানত নিশ্চিত করার সুপারিশ করেন। পাশাপাশি অনুমোদিত সম্পত্তি মূল্যায়নকারী প্রতিষ্ঠানের তালিকা কেন্দ্রীয় ব্যাংকের ওয়েবসাইটে প্রকাশের প্রস্তাবও করেন।
কর্মশালায় জানানো হয়, বর্তমানে ব্যাংক খাতে খেলাপি ঋণের পরিমাণ উদ্বেগজনক হারে বেড়েছে। মোট ঋণের প্রায় ৩১ শতাংশ এখন খেলাপি। গত বছরের ডিসেম্বর পর্যন্ত ১৮ লাখ ২১ হাজার কোটি টাকার মোট ঋণের প্রায় ৫ লাখ ৫৭ হাজার কোটি টাকা খেলাপি হয়ে পড়েছে। এ ছাড়া গ্রামীণ এলাকায় অনেক ক্ষেত্রে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের নির্ধারিত অগ্রিম-আমানত অনুপাত (এডিআর) মানা হচ্ছে না বলে অভিযোগ ওঠে। কিছু শাখায় এ অনুপাত ৮৩ শতাংশের সীমা ছাড়িয়ে ৪০০ শতাংশে পর্যন্ত পৌঁছেছে বলে জানানো হয়। এ অবস্থায় ব্যাংকভিত্তিক নয়, বরং শাখাভিত্তিকভাবে এডিআর বাস্তবায়নের প্রস্তাব দেওয়া হয়। ব্যাংকাররা মনে করেন, দীর্ঘমেয়াদি প্রকল্প ঋণ কমিয়ে এসব অর্থ পুঁজিবাজার থেকে সংগ্রহ করা হলে ব্যাংক খাতে খেলাপি ঋণের চাপ কমতে পারে। একই সঙ্গে প্রকল্প ঋণ বিতরণের ক্ষেত্রে বন্ধকি সম্পত্তির সঠিক মূল্যায়ন নিশ্চিত করা জরুরি বলে তাঁরা উল্লেখ করেন।
সংশ্লিষ্ট সূত্র জানান, ঋণখেলাপিদের তালিকা প্রকাশ ও সম্পত্তি কেনায় নিষেধাজ্ঞার মতো কঠোর পদক্ষেপ বাস্তবায়নে সরকারের উচ্চপর্যায়ের রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত প্রয়োজন হবে। তবে এসব উদ্যোগ কার্যকরভাবে বাস্তবায়ন করা গেলে ব্যাংক খাতে শৃঙ্খলা ফিরবে এবং খেলাপি ঋণ নিয়ন্ত্রণে গুরুত্বপূর্ণ অগ্রগতি আসতে পারে বলে আশা করা হচ্ছে।

