অচল চট্টগ্রাম বন্দর, বিরোধ তুঙ্গে

0
অচল চট্টগ্রাম বন্দর, বিরোধ তুঙ্গে

চট্টগ্রাম বন্দরে গতকাল রবিবার থেকে আবারও শ্রমিক-কর্মচারীদের ধর্মঘট শুরু হয়েছে। তাতে আবারও অচলাবস্থায় রয়েছে দেশের এই প্রধান সমুদ্রবন্দর। নিউমুরিং কনটেইনার টার্মিনাল (এনসিটি) পরিচালনার দায়িত্ব দুবাইভিত্তিক প্রতিষ্ঠান ‘ডিপি ওয়ার্ল্ড’কে দেওয়ার প্রক্রিয়াকে কেন্দ্র করে বন্দর কর্তৃপক্ষ ও আন্দোলনরত শ্রমিক-কর্মচারীদের মধ্যে বিরোধ এখন তুঙ্গে। একদিকে বন্দর চেয়ারম্যান এই প্রক্রিয়াকে আধুনিকায়নের অংশ দাবি করে প্রশ্ন তুলেছেন—নেগোসিয়েশন শেষ হওয়ার আগেই কেন এই বিশৃঙ্খলা।

অন্যদিকে শ্রমিক সংগঠনগুলোর নেতারা অভিযোগ করেছেন, তাঁদের শীর্ষ নেতাদের ‘নিখোঁজ’ বা ডিবি পরিচয়ে তুলে নেওয়া হয়েছে। এই দুই পক্ষের অনড় অবস্থানের মধ্যেই গতকাল সকাল থেকে বন্দরে সব ধরনের অপারেশনাল কার্যক্রম প্রায় স্তব্ধ হয়ে পড়ে। দুপুরে বন্দর ভবন চত্বরে জরুরি সংবাদ সম্মেলনে সাংবাদিকদের মুখোমুখি হন চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষের চেয়ারম্যান রিয়ার অ্যাডমিরাল এস এম মনিরুজ্জামান। তিনি শুরুতেই এনসিটি টার্মিনাল নিয়ে চলমান আলোচনাকে একটি ‘প্রক্রিয়া’ হিসেবে অভিহিত করেন।

বন্দর চেয়ারম্যান বলেন, ‘চুক্তি এখনো হয়নি। একটি প্রি-ম্যাচিউর প্রসেস নিয়ে এভাবে আগে থেকে ভণ্ডুল করার চেষ্টা আমার কাছে মনে হয় দেশের স্বার্থবিরোধী এক অপপ্রচেষ্টা।’ তিনি প্রশ্ন তোলেন, যখন সরকারের বিভিন্ন পর্যায়ে আলোচনা চলছে, যখন একটি জিটুজি (সরকার টু সরকার) প্রক্রিয়ার মাধ্যমে আইনি কাঠামোর ভেতরে থেকে নেগোসিয়েশন চলছে, তখন কেন এই তাড়াহুড়া করে ধর্মঘট ডাকা হলো?

চেয়ারম্যান বলেন, ‘ল্যান্ডলর্ড পোর্ট মডেল’ একটি গ্লোবাল স্ট্যান্ডার্ড। ভারতের উদাহরণ টেনে তিনি বলেন, সেখানে ৭০ শতাংশ বন্দর ফরেন অপারেটররা পরিচালনা করছে।

ডিপি ওয়ার্ল্ড সেখানে পাঁচটি বন্দর চালাচ্ছে। তিনি দাবি করেন, এনসিটির বর্তমান যন্ত্রপাতির সক্ষমতা ৭০ শতাংশে নেমে এসেছে, যা বন্দরের কর্মদক্ষতা কমিয়ে দিচ্ছে। আধুনিকায়ন না করলে আন্তর্জাতিক প্রতিযোগিতায় বন্দর পিছিয়ে পড়বে।
আন্দোলনরত চট্টগ্রাম বন্দর রক্ষা সংগ্রাম পরিষদের নেতারা অভিযোগ করেন, সরকার ও বন্দর কর্তৃপক্ষ আলোচনার টেবিলে না এসে শক্তির মাধ্যমে আন্দোলন দমানোর চেষ্টা করছে। পরিষদের সমন্বয়ক ইব্রাহিম খোকন দাবি করেন, গত শনিবার রাত থেকে রবিবার সকালের মধ্যে তাঁদের চারজন প্রভাবশালী নেতাকে ডিবি পরিচয়ে তুলে নেওয়া হয়েছে।

নিখোঁজ বা আটক হওয়া এই নেতারা হলেন—আবুল কালাম, শামসুল মিয়া টুকু, রিপন ও আসাদুল। ইব্রাহিম খোকন বলেন, ‘চেয়ারম্যান সাহেব বলছেন নেগোসিয়েশন চলছে, অথচ আমাদের নেতাদের রাতের অন্ধকারে তুলে নেওয়া হচ্ছে। আমাদের ১৫ জন নেতার সম্পদের তদন্ত করতে দুদকে চিঠি দেওয়া হয়েছে, আমাদের বদলি করা হয়েছে। আলোচনা বাদ দিয়ে শক্তি প্রয়োগ করলে এই বন্দর আর সচল হবে না।’ তবে চট্টগ্রাম মহানগর পুলিশ (সিএমপি) বা গোয়েন্দা বিভাগ থেকে চার শ্রমিক নেতা আটকের আনুষ্ঠানিক স্বীকারোক্তি পাওয়া যায়নি। 

মহানগর গোয়েন্দা পুলিশ উত্তর জোনের উপকমিশনার কাজী আবদুর রহীম সাংবাদিকদের জানিয়েছেন, তাঁদের কোনো টিম কাউকে আটক করেনি। এই লুকোচুরিতে শ্রমিকদের মধ্যে আতঙ্ক ও ক্ষোভ আরো বেড়েছে। গতকাল সকাল থেকে ধর্মঘটের প্রভাবে বন্দরের সব জেটি ও টার্মিনালে কাজ বন্ধ থাকে। বহির্নোঙরে ৮০টি বড় জাহাজ বা মাদার ভেসেল আটকা পড়ে। যেখান থেকে খালাস হয়ে লাইটার জাহাজে পণ্য আসার কথা ছিল, তা সম্পূর্ণ বন্ধ ছিল। বন্দরের তথ্য মতে, ৪১ হাজারেরও বেশি টিইইউএস (২০ ফুট লম্বা কনটেইনারের একক) কনটেইনার ইয়ার্ডগুলোয় জমে আছে। নতুন করে কনটেইনার নামানোর বা ডেলিভারি দেওয়ার সুযোগ নেই। 

বেসরকারি কনটেইনার ডিপো অ্যাসোসিয়েশন (বিকডা) জানিয়েছে, ডিপোগুলো থেকে কোনো রপ্তানি পণ্য বন্দরে যেতে পারছে না। ১৩ হাজার ৪৮৩টি কনটেইনার ডিপোগুলোতে আটকা পড়ে আছে। গত ৫ ফেব্রুয়ারি নৌপরিবহন উপদেষ্টা ব্রিগেডিয়ার (অব.) এম সাখাওয়াত হোসেন চট্টগ্রামে গেলে তাঁর আশ্বাসে দুই দিন আন্দোলন স্থগিত থাকে। তবে শ্রমিক নেতাদের বিরুদ্ধে দুদকের তদন্ত ও বদলির আদেশে পরিস্থিতি পুনরায় অশান্ত হয়ে ওঠে। গতকাল রাত ৯টায় চট্টগ্রাম বন্দরে ধর্মঘট অব্যাহত রাখার প্রত্যয় ব্যক্ত করেছে বন্দর রক্ষা সংগ্রাম পরিষদ। সংগঠনটির সমন্বয়ক মো. হুমায়ুন কবীর ও ইব্রাহিম খোকনের সই করা সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে এ প্রত্যয় ব্যক্ত করা হয়।

আবাসন সুবিধা হারালেন ১৫ কর্মী : বদলির আদেশের পর কর্মস্থলে যোগ না দেওয়ায় আন্দোলনকারী ১৫ কর্মচারীর বাসার বরাদ্দ বাতিল করা হয়েছে। গতকাল বন্দরের পরিচালক (প্রশাসন) স্বাক্ষরিত আদেশে এ শাস্তিমূলক ব্যবস্থার কথা জানানো হয়। ​

এই মেয়াদে এনসিটির ইজারা চুক্তি হচ্ছে না—আশিক চৌধুরী : বাংলাদেশ বিনিয়োগ উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের (বিডা) নির্বাহী চেয়ারম্যান আশিক চৌধুরী জানিয়েছেন, অন্তর্বর্তী সরকারের মেয়াদে এনসিটি ডিপি ওয়ার্ল্ডের কাছে ইজারা দেওয়ার চুক্তি সই হওয়ার সম্ভাবনা নেই। গতকাল রাজধানীর বেইলি রোডে ফরেন সার্ভিস একাডেমি মিলনায়তনে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে তিনি এ কথা বলেন। তিনি বলেন, ডিপি ওয়ার্ল্ডের সঙ্গে চলমান দর-কষাকষির প্রক্রিয়া এখনো শেষ হয়নি। অন্তর্বর্তী সরকারের হাতে সময় খুবই সীমিত। সংবাদ সম্মেলনে প্রধান উপদেষ্টার প্রেস সচিব শফিকুল আলম উপস্থিত ছিলেন।

৬০০ কোটি টাকা কমিশন পাবেন আশিক : গত ৫ ফেব্রুয়ারি চট্টগ্রাম বন্দর রক্ষা সংগ্রাম পরিষদের সমন্বয়ক ও জাতীয়তাবাদী শ্রমিক দলের নেতা মো. হুমায়ুন কবির প্রধান উপদেষ্টার উদ্দেশে বলেছিলেন, ‘একজন অথর্ব, বিকলাঙ্গ মানুষকে আপনি বিডার চেয়ারম্যান (বাংলাদেশ বিনিয়োগ উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের নির্বাহী চেয়ারম্যান আশিক চৌধুরীকে ইঙ্গিত করে) বানিয়ে রেখেছেন। আপনি যাকে দিয়েছেন সে একটা কমিশনখোর। সে ৬০০ কোটি টাকা কমিশন খাওয়ার জন্য চট্টগ্রাম বন্দরকে, বন্দরের এনসিটিকে বিদেশিদের হাতে তুলে দিতে চায়। আমরা তার স্বপ্নকে দুঃস্বপ্নে পরিণত করব ইনশাআল্লাহ।’

এনসিটি নিয়ে হাইকোর্টের রায়ের বিরুদ্ধে লিভ টু আপিল : জানা গেছে, ডিপি ওয়ার্ল্ডের সঙ্গে চট্টগ্রাম বন্দরের নিউমুরিং কনটেইনার টার্মিনাল (এনসিটি) পরিচালনার চুক্তিপ্রক্রিয়ার বৈধতা নিয়ে রিট খারিজের বিরুদ্ধে আপিলের অনুমতি চেয়ে আবেদন (লিভ টু আপিল) করা হয়েছে। গত বৃহস্পতিবার আপিল বিভাগের সংশ্লিষ্ট শাখায় আবেদনটি করেন রিট আবেদনকারী বাংলাদেশ যুব অর্থনীতিবিদ ফোরামের সভাপতি মির্জা ওয়ালিদ হোসাইন। তাঁর আইনজীবী মো. আনোয়ার হোসেন বলেন, ‘আজ (সোমবার) চেম্বার আদালতে আবেদনের শুনানি হওয়ার কথা রয়েছে।’

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here