আখতার রাফি : সাভার ও আশুলিয়াতে বিভিন্ন স্থানে ভেজাল ও নকল শিশু খাদ্যের কারখানার সন্ধান পাওয়া গেছে। শিশু খাদ্যসহ নানা ধরনের খাদ্য উৎপাদন মান নিয়ন্ত্রণে উদ্বেগ বাড়ছে
রাজধানী ঢাকার অদূরে শিল্পাঞ্চল সাভার বর্তমানে দেশের অন্যতম বৃহৎ খাদ্য উৎপাদন ও প্রক্রিয়াজাতকরণ কেন্দ্র হিসেবে পরিচিত হয়ে উঠেছে। শিশু খাদ্য থেকে শুরু করে বিস্কুট, চিপস, চানাচুর, মসলা, জুস, পানীয়, বেকারি পণ্য ও বিভিন্ন ধরনের প্যাকেটজাত খাবার—প্রায় সব ধরনের খাদ্যপণ্যই এখন সাভারকেন্দ্রিক বিভিন্ন কারখানায় তৈরি হচ্ছে। তবে এত বিপুল পরিমাণ খাদ্য উৎপাদনের বিপরীতে মান নিয়ন্ত্রণ ও নিরাপত্তা ব্যবস্থা নিয়ে বাড়ছে উদ্বেগ।
সাভারের হেমায়েতপুর, আশুলিয়া, বিরুলিয়া, ধামসোনা ও আমিনবাজার সংলগ্ন এলাকায় গড়ে উঠেছে শতাধিক ছোট-বড় খাদ্য উৎপাদন কারখানা। এর মধ্যে কিছু কারখানা সরকারি অনুমোদন ও নিয়ম মেনে পরিচালিত হলেও বহু প্রতিষ্ঠান রয়েছে যেগুলো যথাযথ লাইসেন্স ও মান নিয়ন্ত্রণ ছাড়াই কার্যক্রম চালাচ্ছে বলে অভিযোগ রয়েছে। বিশেষ করে শিশু খাদ্য উৎপাদনের ক্ষেত্রে এমন অনিয়ম জনস্বাস্থ্যের জন্য মারাত্মক ঝুঁকি তৈরি করছে।
স্থানীয়দের অভিযোগ, অনেক কারখানায় অস্বাস্থ্যকর পরিবেশে খাদ্য তৈরি করা হচ্ছে। খোলা জায়গায় কাঁচামাল রাখা, অপরিষ্কার পানি ব্যবহার এবং শ্রমিকদের স্বাস্থ্যবিধি না মানার চিত্রও দেখা যায়। শিশু খাদ্যের মতো স্পর্শকাতর পণ্যে এসব অনিয়ম অত্যন্ত বিপজ্জনক বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা।
পুষ্টিবিদদের মতে, শিশু খাদ্যে ব্যবহৃত উপাদানের মান ও পরিমিতি সঠিক না হলে শিশুদের শারীরিক ও মানসিক বিকাশ বাধাগ্রস্ত হতে পারে। নিম্নমানের কাঁচামাল, অতিরিক্ত চিনি, কৃত্রিম রং ও ফ্লেভার ব্যবহার শিশুদের দীর্ঘমেয়াদি স্বাস্থ্যঝুঁকি বাড়ায়। অথচ এসব পণ্য অভিভাবকদের কাছে নিরাপদ ও পুষ্টিকর হিসেবে বাজারজাত করা হচ্ছে।
বাজার সংশ্লিষ্টরা জানান, সাভারে উৎপাদিত এসব খাদ্যপণ্য শুধু স্থানীয় বাজারেই নয়, রাজধানীসহ দেশের বিভিন্ন জেলা ও প্রত্যন্ত এলাকায় সরবরাহ করা হচ্ছে। ফলে এখানকার অনিয়মের প্রভাব জাতীয় পর্যায়ে পড়ছে। একাধিক ব্যবসায়ী নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, কম খরচে বেশি লাভের আশায় কিছু অসাধু প্রতিষ্ঠান মান নিয়ন্ত্রণকে উপেক্ষা করছে।
ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তর ও খাদ্য নিরাপত্তা কর্তৃপক্ষ মাঝে মধ্যে অভিযান চালালেও তা পর্যাপ্ত নয় বলে অভিযোগ রয়েছে। অভিযানে কিছু কারখানা সিলগালা বা জরিমানা করা হলেও অল্প সময়ের মধ্যে আবার কার্যক্রম শুরু হয়। এতে নিয়ন্ত্রণকারী সংস্থার তদারকি নিয়ে প্রশ্ন তুলছেন সচেতন মহল।
সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ বলছে, খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে তারা নিয়মিত মনিটরিং করছে এবং লাইসেন্সবিহীন কারখানার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে। তবে শিল্পাঞ্চলের ব্যাপকতা ও কারখানার সংখ্যা বেশি হওয়ায় পুরো এলাকায় একসঙ্গে নজরদারি করা চ্যালেঞ্জের বিষয়।
সচেতন নাগরিক ও বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, শিশু খাদ্যসহ সব ধরনের খাদ্য উৎপাদনে কঠোর মান নিয়ন্ত্রণ ও স্বচ্ছতা নিশ্চিত করা জরুরি। নিয়মিত ল্যাব পরীক্ষা, কারখানার তালিকা প্রকাশ এবং দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি নিশ্চিত করা গেলে ভোক্তাদের আস্থা ফিরবে। তা না হলে সাভারকেন্দ্রিক খাদ্য উৎপাদন ব্যবস্থা একসময় জনস্বাস্থ্যের জন্য বড় ঝুঁকিতে পরিণত হতে পারে।

