আন্তর্জাতিক ফুটবল নিয়ন্ত্রণকারী প্রতিষ্ঠানের (ফিফা) সভাপতি জিয়ান্নি ইনফান্তিনো ৭৬তম ফিফা কংগ্রেসে এক শিশুতোষ খেলায় মেতেছিলেন। তিনি ফিলিস্তিন ফুটবল অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি জিবরিল রাজউব এবং ইসরায়েলি ফুটবল অ্যাসোসিয়েশনের সহ-সভাপতি বাসিম শেখ সুলেমানকে করমর্দন করতে উৎসাহিত করেন। রাজউব যখন তা প্রত্যাখ্যান করেন, তখন ইনফান্তিনো বলেন, ‘আমরা একসাথে কাজ করব, সভাপতি রাজউব, সহ-সভাপতি সুলেমান। চলুন শিশুদের মনে আশা জাগাতে আমরা হাতে হাত মেলাই। এগুলো অত্যন্ত জটিল বিষয়।’
গত কয়েক দশকে ফিফা বহুবার আন্তর্জাতিক আইনের লঙ্ঘন দেখেও চোখ বন্ধ করে ছিল। ২০১৪ সালের বিশ্বকাপের স্টেডিয়াম তৈরির জন্য ব্রাজিলের বস্তি বা ‘ফাভেলা’ ধ্বংস করার কথা আমাদের মনে পড়ে। এরও আগের ইতিহাসে, ল্যাটিন আমেরিকার ডানপন্থী একনায়কতন্ত্রের সময় ফিফার নীরবতা হাজার হাজার মানুষের গুম হওয়ার ঘটনাকে ধামাচাপা দিতে এবং বিচারহীনতার সংস্কৃতি টিকিয়ে রাখতে সহায়তা করেছিল। ফুটবল এবং স্বৈরশাসনের এক ভয়াবহ চিত্র ফুটে উঠেছিল ১৯৭৮ সালের আর্জেন্টিনা বিশ্বকাপে, যেখানে খেলার স্টেডিয়ামগুলোর ঠিক পাশেই ছিল একনায়কতান্ত্রিক সরকারের বিভীষিকাময় নির্যাতন ও নিধন কেন্দ্রগুলো।
ফিলিস্তিনের ক্ষেত্রেও ফিফার ভূমিকা কোনো অংশে উন্নত নয়। গাজায় ইসরায়েলি গণহত্যার পরও দেশটিকে স্থগিত করতে অস্বীকৃতি জানিয়ে ফিফা তথাকথিত ‘নিরপেক্ষতা’ বজায় রাখছে। গণহত্যা বিষয়টি যতটা জটিল, ঠিক ততটাই স্পষ্ট-এটি হলো আন্তর্জাতিক যোগসাজশের এক জাল, যেখানে কূটনৈতিক ও অর্থনৈতিক খাতের সহায়তায় ইসরায়েলকে গাজা থেকে ফিলিস্তিনিদের জাতিগতভাবে নির্মূল করতে সাহায্য করা হচ্ছে। জটিলতাটুকু কেবল এই জটিল যোগসাজশকে উন্মোচন করার মধ্যে, যেখানে ফিফা একটি শক্তিশালী প্রোপাগান্ডা বা প্রচারযন্ত্রের ভূমিকা পালন করছে। অন্যদিকে, গণহত্যার ‘খুন’ করার অংশটি অত্যন্ত স্পষ্ট ও সোজাসাপ্টা, যার সাক্ষ্য খোদ ইসরায়েলি কর্মকর্তা ও সৈন্যরা নিজেরাই দিয়ে চলেছেন।
যেহেতু গণহত্যার খুনের বিষয়টি দিবালোকের মতো স্পষ্ট, সেখানে ইনফান্তিনো উপনিবেশবাদকে ‘জটিল বিষয়’ বলে এড়িয়ে গেলেও, রাজউব কেন পরে সংবাদমাধ্যমের কাছে ইনফান্তিনোর ‘সদিচ্ছা’ ছিল বলে মন্তব্য করে নিজের অবস্থানকে হালকা করলেন? রাজউবের বক্তব্যের বাকি অংশ ছিল এই লোকদেখানো করমর্দনের ভণ্ডামির বিরুদ্ধে-তিনি বলেছিলেন, ‘নেতানিয়াহু ও তার সরকারকে সমর্থনকারী’ কোনো কর্মকর্তার সাথে তিনি হাত মেলাবেন না। যদি এই সত্যটুকুই মূল হয়, তবে কেন শুরুতে এমন ক্ষমা প্রার্থনাসুলভ ভূমিকার অবতারণা?
বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমের দাবি, ইনফান্তিনো এই সুযোগে ফিফা সভাপতিত্বে নিজের প্রার্থিতা ঘোষণার বিষয়টিকে পুঁজি করতে চেয়েছিলেন। কিন্তু তার এই কারসাজি ভেস্তে গেছে। ‘জটিল বিষয়’? সম্ভবত সেটা তার অহমিকা। ফিলিস্তিনের গাজায় ইসরায়েলি গণহত্যাকে মঞ্চে নিয়ে আসা, তাকে একটি প্রতীকী করমর্দনের মাধ্যমে হালকা করার চেষ্টা করা এবং গাজার নিষ্পাপ শিশুদের পক্ষ থেকে আশার বাণী শোনানো-উপনিবেশিত জনগণের সামনে ‘আশার অস্পষ্টতা’ তুলে ধরার ইতিহাসে এটি আরও একটি নিচু স্তরের উদাহরণ হয়ে থাকবে।
চলতি বছরের ফেব্রুয়ারিতে, অধিকৃত পশ্চিম তীরের অবৈধ বসতিগুলোর ইসরায়েলি ফুটবল ক্লাবগুলোকে খেলার সুযোগ দেওয়ার মাধ্যমে যুদ্ধাপরাধে সহায়তা করার অভিযোগে আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালতে (আইসিসি) ইনফান্তিনো এবং উয়েফা প্রধান আলেকজান্ডার সেফেরিনের বিরুদ্ধে অভিযোগ আনা হয়। অভিযোগকারীদের মতে, ফিফা ও উয়েফা প্রধানরা ইসরায়েলি এবং মার্কিন কর্তৃপক্ষের সাথে যোগসাজশ করে এই ক্লাবগুলোকে অন্তর্ভুক্ত রেখেছেন।
এই পর্যায়ের যোগসাজশ যেখানে বিদ্যমান, সেখানে রাজউবের উচিত ছিল না ইনফান্তিনোর প্রতি উদারতা দেখিয়ে নিজের বার্তাকে ক্ষুণ্ণ করা। ইনফান্তিনোর ক্যারিয়ার রক্ষার দায়িত্ব শোষিত বা উপনিবেশিত জনগণের নয়। ফিলিস্তিনিরা দেখেছে কীভাবে তাদের প্রতিরোধ টিকে থাকার লড়াইয়ের ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র টুকরোতে পরিণত হয়েছে। আর এই টিকে থাকার লড়াইয়ের মাধ্যমেই তারা বারবার প্রবল স্থিতিস্থাপকতায় নতুন করে প্রতিরোধ গড়ে তুলছে।
ফুটবল আজ আর ‘সুন্দর খেলা’ নয়। এটি এখন দুর্নীতি, স্বৈরশাসনের সাথে মৈত্রী এবং গণহত্যার সাথে সহযোগিতার গন্ধে কলুষিত। জটিল বিষয়? কূটনীতি হয়তো ইনফান্তিনোর এই অপকৌশলকে আড়াল করার একটা প্রলেপ দিতে পারে, কিন্তু রাজউবের কাছে ছিল গাজার সেই রক্তাক্ত সাক্ষ্য।
ফুটবল আজ খুনের এক সহযোগী, আর রাজউবকে অনুরোধ করা হয়েছিল সেই গোপন চুক্তিতে হাত মেলাতে।

